SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

মামলুক সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স

ইতিহাস ১৫ ফেব্রু. ২০২১
জানা-অজানা
রুকনুদ্দিন বাইবার্স

জন্ম ও বিকাশ

রুকনুদ্দিন বাইবার্স ছিলেন একজন তুর্কি কিপচাক(বর্তমান কাজাকিস্তান) বংশোদ্ভূত মিশরীয় মামলুক সুলতান। ছোটকালে দাস ব্যাবসায়ীদের কাছ থেকে আইয়ুবি সুলতান সালিহের এক সেনা কমান্ডার ‘আলাউদ্দিন বান্দুকদার’ তাকে ৮০০ দিরহামের বিনিময়ে কিনে নেন। তাঁর নামের সাথে মিল রেখেই পরবর্তীতে বাইবার্সের নামের শেষে ‘বান্দুকদারি’ উপাধি যুক্ত হয়। এরপর বাইবার্স-কে সব রকমের দ্বীনি শিক্ষা ও সামরিক ট্রেনিং দিয়ে সুলতানের রক্ষীবাহিনীতে প্রেরণ করা হয়। দীর্ঘকায়, কৃষ্ণবর্ণ ও নীল চোখের অধিকারী বাইবার্স ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও কর্মচঞ্চল। তাঁর গমগমে কন্ঠস্বরে ছিল কর্তৃত্বের সুর। এক কথায় নেতৃত্বের সব গুণাবলীই তাঁর মধ্যে ছিল।

রণাঙ্গনের বীর সেনানী রুকনুদ্দিন বাইবার্স

১২৪৯ খ্রিষ্টাব্দে ফ্রান্সের রাজা লুইস মিশরে নবম ক্রুসেডের সূচনা করে। ১২৫০ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে সংগঠিত আল-মানসুরার যুদ্ধে ক্রুসেডাররা পরাজিত হয় এবং ক্রুসেডের নেতৃত্ব দানকারী সম্রাট নবম লুই-কে বাইবার্সের বাহিনী বন্দী করে। এটি ছিলো বাইবার্সের বিরাট সাফল্য। কেননা ক্রুসেডের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ক্রুসেডে নেতৃত্ব দানকারী কোনো সম্রাটকে স্বপারিষদে বন্দী করতে পেরেছিলেন। পরবর্তীতে বাইবার্সের বীরত্ব ও সাহসীকতায় ক্রুসেডারদের বিষবৃক্ষের মূলোৎপাটন হয় মিশর আর সিরিয়া থেকে।

এরপর মোঙ্গলদের হাতে সিরিয়ার পতনের পর সুলতান কুতুজের আহ্বানে কমান্ডার রুকনুদ্দিন বাইবার্স মিশরে ফিরে আসেন। ঐ সময়ে মোঙ্গল বাহিনী মিশর আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সুলতান কুতুজও প্রস্তুতি গ্রহণ করেন মোঙ্গল বাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য। তিনি তার বাহিনীর দ্বায়িত্ব দেন তরুন মামলুক বীর কমান্ডার বাইবার্স-কে। অপরদিকে মোঙ্গল বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল হালাকু খানের বিশ্বস্ত ও দক্ষ সেনাপতি কিতবুকা। ফিলিস্তিনের গাজার অদূরে আইন-জালুতের প্রান্তরে মুখোমুখি হয় দুই বাহিনী।

বাইবার্সের অসামান্য রণকৌশলে মোঙ্গল বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় ঘটে। বাইবারসের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী দীর্ঘ ৩০০ কিলোমিটার পথ তাড়িয়ে গুটি কয়েকজন বাদে সকল হানাদার মোঙ্গল সৈন্যকে হত্যা করে; যা বিশ্ব ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। এ যুদ্ধেই প্রথম মুসলিম বাহিনী বাইবার্সের প্রবর্তিত ‘হাত-তোপ’ ব্যবহার করে, যাকে ‘মিদফা’ বলা হত। আইন-জালুতের যুদ্ধের মাধ্যমে “মোঙ্গলদের পরাজয় অসম্ভব”- এই প্রবাদ বাক্য মিথ্যায় পর্যবসিত হয়। শুধু তাই নয়, এ যুদ্ধের পরেই মোঙ্গলদের জয়ের যাত্রা পুরোপুরি থমকে দাঁড়ায়।

সুলতান কুতুজের মৃত্যুর পর রুকনুদ্দিন বাইবার্স তাঁর ক্ষমতা গ্রহন করেন।

রুকনুদ্দিন বাইবার্স-এর হাতে মোঙ্গল ও ক্রুসেডার দমন

আইন-জালুতের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে হালাকু খান তার বাহিনী নিয়ে ধেয়ে আসে মিশর-সিরিয়ার দিকে। ফোরাত নদী অতিক্রম করে হালাকু খানের অজেয় বাহিনী আছড়ে পড়ে মামলুক সীমান্তে। কিন্তু এবারও তাদের দম্ভ চূর্ণ করেন দুর্ধর্ষ বীর সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স। হালাকু বাহিনী এখান থেকেই বুঝতে পারে যে, এতদিন কচুকাটা করে আসা কোটি কোটি আয়েশী মুসলিম আর এই মামলুক মুসলিমরা এক নয়।

সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স প্রচণ্ড আক্রমণে তাদের পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ আস্বাদন করান। বাধ্য হয়ে তারা শান্তিচুক্তি করতে আসে। কিন্তু চতুর সুলতান বাইবার্স তাদের গাদ্দারির দীর্ঘ ইতিহাস সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত ছিলেন। তাই তিনি তাদের শান্তি প্রস্তাবে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করেননি। প্রতিটি রণক্ষেত্রে তিনি তাদের পরাজিত করতে থাকেন। ১২৭৩ খ্রিষ্টাব্দে বীরা নামক স্থানে তাদেরকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। একপর্যায়ে তারা এশিয়া মাইনরের রোম্যান সালজুক সালতানাতের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে ১২৭৭ খ্রিষ্টাব্দে মামলুকদের বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এলবিস্তান নামক স্থানে সংগঠিত এই যুদ্ধে সুলতান বাইবার্স এর বাহিনীর কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজয়বরণ করে মোঙ্গল বাহিনী ও তাদের মিত্র সালজুক বাহিনী।

এবার তিনি নজর দেন সিরিয়ায় ঘাঁটি তৈরি করা ক্রুসেডারদের প্রতি। সালাহুদ্দিন আইয়ুবীর সময়ের মতো তিনিও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখেন। আইন জালুতের যুদ্ধের সময় ক্রুসেডাররা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মোঙ্গল বাহিনীকে সাহায্য সহযোগী করে। তাই সুলতান বাইবার্স ক্রুসেডারদের শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত নেন। এবং একে একে ক্রুসেডারদের চরমভাবে পরাজয়বরণ করান।

ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে অসংখ্য যুদ্ধই মূলত বাইবার্সকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে গেছে। ইসলামকে রক্ষার জন্য মোঙ্গল ও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তিনি ইসলামের ‘দ্বিতীয় সালাহঊদ্দিন’ উপাধি লাভ করেন।

বাগদাদের খিলাফত পূনঃপ্রতিষ্ঠাকরণ

আইন-জালুতের যুদ্ধের আগে হালাকু বাহিনীর হাতে পতন হয় বাগদাদ, সমরখন্দ, আলেপ্পো, বুখারা প্রভৃতি অঞ্চল। বাগদাদের পতনের সাথে সাথে আব্বাসীয় খিলাফতেরও পতন ঘটে। ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে বাগদাদে হালাকু খান কর্তৃক আববাসীয় বংশের শেষ খলিফা আল-মুসতাসিম বিল্লাহ নিহত হলে মুসলিম জাহান খলিফাশূন্য পয়ে পড়ে। মামলুক সুলতান বাইবার্স এই খেলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে মুসলিম বিশ্বের বিরাট উপকার সাধন করেন। তিনি সিরিয়া থেকে আব্বাসি বংশের এক ব্যক্তি আবুল কাসেম আহমাদ বিন মুহাম্মাদ জাহেরকে স্বসম্মানে ডেকে এনে তার কাছে খেলাফতের বাইয়াত করেন। মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টিতে খেলাফতের এই পুনঃপ্রতিষ্ঠার গুরুত্ব ছিল অনস্বীকার্য।

অন্যান্য অবদান

রনাঙ্গনের বীর সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স শিল্প ও সংস্কৃতিতেও অসামান্য ভুমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছেন। প্রথমেই তিনি ঐতিহ্যবাহী আল-আজহার মসজিদের সংস্কার করেন এবং সেখানে নব-উদ্যমে লেখাপড়া ও খুংবা চালু করেন। চার মাজহাব থেকে প্রতিনিধি হিসেবে চারজন কাযীকে নিযুক্ত করেন বিচারকার্য পরিচালনা করার জন্য। ১২৬২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি জেরুজালেম পরিদর্শন করেন এবং সেখানেও পবিত্র স্থানসমুহের প্রয়োজনীয় উন্নয়ন সাধন করেন। দামেস্কে তার সমাধিক্ষেত্রেই বর্তমানের জাহিরিয়া পাঠাগার তৈরী হয়েছে।

মৃত্যু

১৭ বছরের দীর্ঘ শাসন শেষে ১২৭৭ খ্রিষ্টব্দের ২মে এ মহান বীর ও শাসক মহান আল্লাহর ডাকে সারা দিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। তাকে দামেস্কের জাহিরিয়া পাঠাগারের পাশে দাফন করা হয়।