SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

মালদ্বীপ: দুর্বল গণতন্ত্র থেকে স্বৈরাচারের ইতিহাস

বিশ্ব ১৭ ফেব্রু. ২০২১
মালদ্বীপে
Photo by Asad Photo Maldives from Pexels

দ্বাদশ শতক থেকে মালদ্বীপ একটি মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত, কিন্তু ২০০৪ সালে সুনামির পরে এখানে সৌদি আরবের অতি-কঠোর ওয়াহাবি বা সালাফিরা শক্তিশালী হয়ে উঠেছিলেন। সুনামির পরে সৌদির ওয়াহাবিরা এখানে এসে প্রচার করতে শুরু করেন যে, আল্লাহের ক্রোধেই এই দুর্যোগ।  এবং দ্রুত তাঁদের এই মত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট নাশিদের পূর্বসূরী গায়ুম ৮০-এর দশকে হিজাব ও পর্দা নিষিদ্ধ করলেও এই সময়ে মালদ্বীপবাসীরা ক্রমশ চরমপন্থার দিকে ঝুঁকতে থাকেন।

মালদ্বীপে প্রযোজ্য শরিয়ত আইন

বিভিন্ন দেশের যে লক্ষ লক্ষ পর্যটক মালদ্বীপের সৌন্দর্য দেখতে আসেন, তাঁদের অধিকাংশই জানেন না যে, মালদ্বীপের সমস্ত নাগরিকের উপরে শরিয়ত আইন প্রযোজ্য এবং মালে শহরে বসবাসকারী যে কোনও ধর্মাবলম্বী মানুষ এই আইনের অধীনেই পড়েন। তুলনামূলক ভাবে উদারমনোভাবাপন্ন নাশিদের শাসনকালে, ২০০৮ সালে ধর্ম প্রচারকদের লাইসেন্স প্রদান করার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হয়ে উঠেছিল মিনিস্ট্রি অফ ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স, এর ফলে ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে সীমারেখা অনেকটাই শিথিল হয়ে গিয়েছিল।

কিছু বই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল নির্বাচনে নাশিদের বিরোধী প্রার্থী ও তাঁর ভাইয়ের লেখা একটি বই, এগুলির উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করার কারণ ছিল- ইসলাম বিরোধী লেখা। এর পাশাপাশি নাশিদের সরকার বিভিন্ন খ্রিস্টান ওয়েবসাইটগুলি ব্লক করে দিতে শুরু করে, কারণ আশঙ্কা ছিল যে এগুলি ইসলামের প্রতি বিশ্বাসে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। ইমামরাও শুধুমাত্র রাষ্ট্র দ্বারা অনুমোদিত ফতোয়া ঘোষণা করতে পারতেন। অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তখনও প্রাণদণ্ড লাগু ছিল।

২০১৩ সালে মহম্মদ নাশিদকে নির্বাচনে হারিয়ে ক্ষমতায় আসেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট আবদুল্লা ইয়ামিন। তিনিও কোনও ধর্মীয় চরমপন্থার বিরোধিতা করেননি। শুধুমাত্র তাঁর ক্ষমতার উপরে বিধিনিষেধ আরোপ করে এমন ধরনের নিয়ম-নীতিরই নিতি একমাত্র বিরোধিতা করেছিলেন। রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রতি তাঁর সহানুভূতির অভাবের ফলে ২০১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মালদ্বীপে সাংবিধানিক সঙ্কট দেখা দেয়, যার ফলস্বরূপ দেশে জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করতে হয়। সেই বছরই পুনরায় নির্বাচন হয়, এবং মালদ্বীপবাসীরা ইয়ামিনের পরিবর্তে নির্বাচিত করেন মালদিভিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী ইব্রাহিম মহাম্মদ সোলিহকে।

ইয়ামিনের শাসনকালে সাংবিধানিক সঙ্কট তৈরির কারণ

ইয়ামিনের শাসনকাল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, দুর্বল গণতন্ত্র কীভাবে স্বৈরাচারে পরিণত হতে পারে। তিনি বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সংস্কার স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত পদক্ষেপ করেছিলেন। তার পাশাপাশি নির্বাচন পদ্ধতি, বিচার ব্যবস্থা, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সাথে চাতুরির মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা বাড়িয়ে নিয়েছিলেন। সমস্যার সূত্রপাত হয়, যখন ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিচারবিভাগীয় শাখা তাঁর বিরোধীদের পক্ষে রায় প্রদান করে। ইয়ামিনের শাসনকাল ভালো ভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, ঠিক কীভাবে স্বৈরাচারীদের পতন হয়।

১. দেশের বাস্তব ঘটনা পরম্পরা সম্পর্কে দেশবাসীকে ভ্রান্ত করা

২০১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সরকারকে নির্দেশ দেন ৯ জন রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দিতে হবে এবং ১২ জন পার্লামেন্টের সদস্যকে পুনর্বহাল করতে হবে। এর পরিণামে, ইয়ামিন পার্লামেন্টে তাঁর সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতেন। এই সম্ভাবনা এড়াতে ইয়ামিন দাবি করেন, আদালতের যে ওয়েবসাইটে এই রায় ঘোষণা করা হয়েছিল, সেটি হ্যাক করা হয়েছে। এরপরে আদালতের তরফে ঘোষণা করা হয় যে, ওয়েবসাইট হ্যাক করা হয়নি এবং এই রায় সঠিক। কিন্তু ইয়ামিন সেই রায় মানতে অস্বীকার করেন।

২. শক্তির প্রয়োগ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা

এই সঙ্কটের মুখে পুলিশ বাহিনী দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। সরকার-বিরোধী স্লোগান দিতে দিতে তখন রাস্তায় নেমে এসেছে ক্ষুব্ধ দেশবাসী। পুলিশে তখনও যাঁরা ইয়ামিনের পক্ষে ছিলেন, তাঁরা ব্যাটন ও মরিচ স্প্রে ব্যবহার করে বিক্ষোভ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। ইয়ামিন পরবর্তী ৩ দিনের মধ্যে কোনও কারণ না দেখিয়েই পরপর ২ জন পুলিশ চিফকে বহিষ্কার করেন। এরপরে ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি ১৫ দিনের জন্য জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করেন, যা দেশে ও বিদেশে যথেষ্ট সমালোচিত হয়। সেনাবাহিনীকে কাজে লাগিয়ে ইসামিন মালে শহরে পার্লামেন্ট ভবন খুলতে বাধা দেন, পার্লামেন্টের সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের ঘরবন্দি করে ফেলা হয়। হিংসাকে হাতিয়ার বানিয়ে তিনি নিজের গদি বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন।

৩. ক্ষমতায় থাকায় শেষ প্রচেষ্টা

এখানেই থেমে না থেকে ইয়ামিন সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নাশিদকে গ্রেপ্তার করার জন্য, যিনি তখন যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে ছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারির পরেও তিনি জরুরি অবস্থার মেয়াদ বৃদ্ধি করেন এবং পরবর্তী ৩০ দিনের জন্য জাতীয় সুরক্ষা বিঘ্নিত হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে নির্বাচন পিছিয়ে দেন।

যদিও এতে শেষরক্ষা হয়নি। শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি পরাজিত হন। এই ঘটনার দুই বছর সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁকে অর্থ তছরুপে অপরাধে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।