SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

মালদ্বীপ: যেন এক বিপন্ন জান্নাত

পর্যটন ০৯ ফেব্রু. ২০২১
ফিচার
মালদ্বীপ
© Jakub Gojda | Dreamstime.com

বিশ্বের অন্য যে কোনও দেশের বিমানবন্দরের সাথে মালদ্বীপ-এর মালে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পার্থক্য চোখে পড়ার মতো। এখানে নিরাপত্তা রক্ষীদের মধ্যে রয়েছেন বহু বোরখা পরা মহিলা, তাঁরা স্বল্পবসনা ইউরোপীয় পর্যটকদের চেকিং করেন। মুসলমান পুরুষরা দাঁড়ি রাখেন এবং পর্যটকদের কলরবের মধ্যেই তাঁরা নিয়ম করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। একই ধরনের বাহনে চড়ে মালদ্বীপের বাসিন্দা এবং পর্যটকরা যাত্রা করেন ভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে। পর্যটকরা ছোট প্লেন কিংবা স্পিডবোটে চেপে মালদ্বীপে ছুটি কাটাতে এসে চলে যান অসাধারণ সুন্দর বিভিন্ন দ্বীপে, যেখানে সেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিংবা শরিয়া আইন সম্পর্কে তাঁদের ভাবতে হয় না।

মোহময়ী মালদ্বীপ 

এই শহরের বন্দরে এলে প্রথম নজরেই জায়গাটা ভালো লেগে যায়। যদিও আশপাশে নজরে পড়ে সদ্য এই দেশে পা রাখা পর্যটকদের সামানপত্র নামানোর হুড়োহুড়ি, ট্যাক্সির সাথে দরাদরি, কিন্তু তার মধ্যে নিজেকে নিরাপদ মনে হয়। তীরের রঙিন বাড়ির রঙ সমুদ্রের হাওয়ায় নষ্ট হয়ে গিয়েছে, তবে সরু সরু রাস্তাঘাট খুবই পরিষ্কার। সেখান থেকে বেরিয়ে কোন দিকে যাবেন বুঝতে না পারলে কেউ এগিয়ে আসবে না সাহায্য করার জন্য, আবার কোনও ঠগবাজ সেই অবস্থার সুযোগও নেবে না। এই নিরাপত্তা গোটা মালদ্বীপেই রয়েছে। এই দেশে মহিলারাও নির্ভয়ে মোটরবাইকে চেপে যাতায়াত করেন।

মালদ্বীপের এই আধুনিক, সুরক্ষিত রূপ দেখে বোঝার উপায় থাকে না যে, এক দশক আগে এখানে কী ধরনের রাজনৈতিক সঙ্কট তৈরি হয়েছিল।

মালদ্বীপ-এর শাসনভার পরিবর্তন 

২০০৮ সালের আগে পর্যন্ত, সমগ্র এশিয়ার মধ্যে ৪০ হাজার নাগরিকের বাসস্থান এই দ্বীপপুঞ্জ রাষ্ট্রেই সবচেয়ে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থেকেছেন একজন শাসক, মাউমুন অবদুল গায়ুম। ২০০৮ সালে ভোটাররা তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে। তারপরে আয়োজিত হয় এই দেশের প্রথম মাল্টি পার্টি নির্বাচন। ভোট দিয়ে মালদ্বীপবাসীরা ক্ষমতায় আনেন মুহাম্মদ নাশিদকে। তিনি ছিলেন একজন প্রাক্তন রাজনৈতিক বন্দি এবং মালদ্বীপের ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এমডিপি)-এর তরফে মানবাধিকারের সম্প্রচারক। তাঁর আমলে দেশের সংবিধান আরও উদার হয়, নাশিদ বাক স্বাধীনতা ও সমাবেশের অধিকারের সমর্থক ছিলেন।

পরবর্তী কয়েক বছর ভালোই কেটেছিল। সেই সময় ট্যুরিজমের উপরে তখন দেশের জিডিপি-র ৪০ শতাংশ নির্ভর করত। নাশিদের মতো একজন জনপ্রিয় নেতা তখন আন্তর্জাতিক মহলেও যথেষ্ট সমাদর অর্জন করেছিলেন। তিনি নিজের সংস্কারমূলক ভাবনাচিন্তা ও প্রচুর প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছিলেন। মনে করা হচ্ছিল, মালদ্বীপের মতো শান্তিপূর্ণ দেশে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই সময় যে সমস্ত মুসলিম দেশ রাজতন্ত্রের শাসন থেকে বেরিয়ে এসে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য সংগ্রাম করছিল, তাদের কাছে মালদ্বীপ উদাহরণে পরিণত হয়েছিল। ২০১০ সালে যখন আরব বসন্ত নামক আন্দোলন শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল এবং ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছিল, মালদ্বীপবাসী এবং গোটা বিশ্ব, তখন প্রকৃত সংস্কারের নজির হিসেবে নাশিদকেই তুলে ধরেছিল।

কিন্তু, মালদ্বীপবাসীরাই ছিলেন প্রথম মুসলিম যাঁরা কোনও স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের বিরুদ্ধে নয়, বরং দুই বছরেরও কম সময় আগে নিজেদের নির্বাচন করা প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছিলেন।

বিলম্বিত গণতন্ত্র

আরব বসন্ত চরিত্রগত দিক থেকে গণতান্ত্রিক অধিকারের চেয়ে অর্থনৈতিক অবস্থার প্রতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গণতন্ত্রে রূপান্তরিত হওয়ার পরে প্রতিটি দেশই গভীর অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল। এই কারণে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরেও, অসন্তোষ কমেনি। নাশিদের অর্থনৈতিক নীতির কারণে মালদ্বীপে ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতির সমস্যা দেখা দিয়েছিল, যার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। ২০০৪ সালে ভারত মহাসাগরে ভূমিকম্পের জেরে মালদ্বীপে প্রায় ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়েছিল, এবং তখনও সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। ২০০৭-২০০৮ সালে যখন নাশিদ ক্ষমতায় আসেন, তখনও এই দেশ খাবারের দামের সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

কিন্তু সেই সময়েও রাজনীতিবিদরা দুর্নীতির ছায়া থেকে বেরোতে পারেননি। সমগ্র দ্বীপপুঞ্জের দামি দামি রিয়েল এস্টেট দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করে এই রাজনীতিবিদরা নিজেদের ধনসম্পত্তি বাড়িয়ে তোলেন। রাষ্ট্র দ্বারা পরিচালিত ট্যুরিজম কর্পোরেশনে ৭৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার তছরুপ করার অভিযোগে এক জন প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট-সহ মোট তিন জন বর্ষীয়ান আধিকারিককে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। যে কর্মচারীর অভিযোগে তাঁদের শাস্তি হয়েছিল, সেই ব্যক্তিকেও তথ্য চুরি এবং বেআইনি ভাবে তথ্য ফাঁস করার অভিযোগে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। এমনই নানা অর্থনৈতিক কারণের পাশাপাশি, সনাতনপন্থীরা অভিযোগ করেন যে নাশিদের প্রশাসন ইসলামের অনুশাসন মেনে চলছে না। সুন্নি মুসলিম অধ্যুষিত মালদ্বীপে এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ২০১১ সালে ডিসেম্বর মাসে একটি স্বাধীন স্থানীয় গণমাধ্যম ইসলামকে রক্ষার করার ডাক দেয়, যাকে কাজে লাগাতে শুরু করে আইসিসের মতো সংস্থা।

২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শেষ পর্যন্ত নাশিদ পদত্যাগ করেন। নাশিদের দাবি, ধর্মীয় অভ্যুত্থানের জেরে মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে তাঁকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল, অপরপক্ষে বিরোধীরা দাবি করেন যে, দেশের পরিবর্তনের জোয়ার দেখে নাশিদ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছিলেন।