মালি সাম্রাজ্যের উপরে ইসলামের প্রভাব

Mud and adobe mosque in Mali, Djenne
Great Mosque of Djenne, Mali. © Hector Martinez Troyano | Dreamstime.com

বহু বাধা পেরিয়ে পশ্চিম আফ্রিকার মালি এবং সোংহায় সাম্রাজ্যে উড়েছিল ইসলামের ধ্বজা

মালির সাম্রাজ্যের উত্থান

মালিতে ইসলামের প্রভাবের সূত্রপাত পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে, যখন এই এলাকার শাসক ইসলামে রূপান্তরিত হয়েছিলেন বলে আল-বাকরি তাঁর লেখনীতে উল্লেখ করেছিলেন। দীর্ঘদিন অনাবৃষ্টি চলার ফলে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা  নামাজ ও ওযু-র মাধ্যমে শেষ হয়েছিল। ঘানা সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ থেকে মালির সাম্রাজ্যের উত্থান হয়েছিল। মালিতে ইসলামী ইতিহাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ নাম রয়েছে: সুন্দিয়াটা (১২৩০-১২৫৫) এবং মানসা মুসা (১৩১২-১৩৩৭)। সুন্দিয়াটা মালি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হলেও তিনি একজন দুর্বল মুসলিম ছিলেন, এবং আলেমরা তাঁর ধর্মীয় আচরণ পছন্দ করতেন না। অন্যদিকে মানসা মুসা ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবং তাঁকেই মালি সাম্রাজ্যের প্রকৃত স্থপতি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ১২৫৫ সালে সুন্দিয়াটার মৃত্যুর আগেই, ঘানার উপরে আগে থেকে নির্ভরশীল আরও কিছু স্থান তাঁর অধীনতা স্বীকার করেছিল। তাঁর মৃত্যুর পরে ক্ষমতায় আসেন মানসা উলি (১২৫৫-১২৭০), যিনি মক্কা থেকে ঘুরে এসেছিলেন।

ক্ষমতায় যখন মানসা মুসা

মানসা (সম্রাট) মুসা ১৩১২ সালে ক্ষমতাসীন হন এবং তাঁর খ্যাতি সুদান, উত্তর আফ্রিকা পেরিয়ে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। মানসা মুসা ১৩৩৭ সাল পর্যন্ত শাসন করেছিলেন এবং ১৩২৪-২৫ সালে তিনি মক্কায় [হজ]যাত্রা করেছিলেন। তিনি যখন হজ থেকে ফিরেছিলেন, তখন তাঁর সাথে বহু মুসলিম আলেম এবং স্থপতিদের নিয়ে এসেছিলেন। সেই স্থপতিরা এখানে প্রথম বার পোড়া ইট দিয়ে পাঁচটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। এভাবে মানসা মুসার রাজত্বকালে ইসলামকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল। বহু পণ্ডিত একমত যে, তাঁর ইসলামের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কারণে মানসা মুসা তাঁর শাসনপদ্ধতিতে বহু নতুন ধারণা প্রবর্তন করেছিলেন।

বিখ্যাত পর্যটক ও বিদ্বান ইবনে বতুতা মানসা সুলাইমানের রাজত্বকালে (১৩৪১-১৩৬০)মালি-তে এসেছিলেন এবং মালির সরকার ও তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চমৎকার বিবরণ লিখে গিয়েছেন – যা আসলে মানসা মুসার নীতিমালা থেকেই উত্তরাধিকার সূত্রে চলে এসেছে। মানসা মুসার হজযাত্রার ফলে মালির সম্পদ ও সমৃদ্ধির কথা ইসলামী দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল এবং তা আরও বেশি সংখ্যক মুসলিম ব্যবসায়ী ও আলেমদের আকৃষ্ট করেছিল। এই মুসলিম আলেম ও ব্যবসায়ীরা মালির সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বিকাশে প্রচুর অবদান রেখেছিলেন। তাঁর রাজত্বকালেই তিউনিস ও মিশরের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং এভাবেই মালি বিশ্বের মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়েছিল।

সোংহায় সাম্রাজ্যের উপরে ইসলামের প্রভাব

একাদশ শতাব্দীর কিছুকাল আগে শাসক জা বা দিয়া রাজবংশ ইসলাম গ্রহণ করলে এই ধর্ম সোংহায় সাম্রাজ্যে বিস্তার লাভ করতে শুরু করে। গাও-য়ের সাথে বাণিজ্য বাড়ার ফলে এটি একটি সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত হয়েছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে এটি মালি সাম্রাজ্যের আধিপত্যের অধীনে চলে আসে তবে চতুর্দশ শতকের শেষের দিকে এই অঞ্চল স্বাধীনতা লাভ করে এবং তারপরে এই রাজবংশের নামকরণ করা হয় সুন্নি। এই সময় সোংহায় প্রদেশের সীমানা প্রসারিত হয়েছিল এবং পঞ্চদশ শতকে, সুন্নি আলীর নেতৃত্বে (যিনি ১৪৬৪-১৪৯২ পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন) পশ্চিম সুদানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলি সোংহায় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। টিম্বাকটু এবং জেনির মতো ইসলামিক শহরগুলি ১৪৭১-১৪৭৬ এর মধ্যে তাঁর অধীনে চলে আসে।

সুন্নি আলী শুধুমাত্র নামে মুসলমান ছিলেন এবং তিনি ইসলামকে নিজের সুবিধার্থে ব্যবহার করেছিলেন। এমনকী তিনি মুসলিম আলেমদের উপর অত্যাচার চালাতেন এবং স্থানীয় কাল্ট ও জাদুর অনুশীলন করতেন বলে জানা যায়। বিখ্যাত আলেম আল-মাগিলি তাঁকে পৌত্তলিক বলে সমালোচনা করলে তাঁকেও তিনি সাজা দিয়েছিলেন। তবে কাল্ট এবং জাদুতে বিশ্বাস সোংহায় বরাবরই প্রচলিত ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীতে পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলন শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন অংশে এই ধরনের অনুশীলন বিদ্যমান ছিল। বলা হয় যে, সুন্নী আলী নামাজ পড়া ও উপবাস করার মাধ্যমে পৌত্তলিকতা ও ইসলামের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও আলেমরা এই ভাবনাকে নিছক বিদ্রূপ বলেই মনে করেন।

তৎকালীন ইসলামী শিক্ষা ও সভ্যতার অন্যতম কেন্দ্র টিম্বাকটু

ধর্ম নিয়ে সুন্নি আলীর এই ব্যর্থ সমন্বয় সাধনের চেষ্টার সমালোচনা করেছিলেন টিম্বাকটুর মুসলিম অভিজাত এবং আলেমরা। টিম্বাকটু ছিল তৎকালীন ইসলামী শিক্ষা ও সভ্যতার অন্যতম কেন্দ্র। আফ্রিকার প্রখ্যাত আলেম, অগিতের বিখ্যাত পরিবার প্রধান বিচারপতির পদ পেয়েছিল এবং তাঁরা নির্ভীক ভাবে শাসকদের সমালোচনা করার জন্য বিখ্যাত ছিল। সুন্নি আলীর শাসনকালে আলেমদের উপরে বহু অত্যাচারের কাহিনী জানা যায়। তাঁর মৃত্যুর পরে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে: ইসলাম ও মুসলিম আলেমরা বিজয়ী হন। একজন সামরিক কমান্ডার মুহাম্মদ তোরে (তোউরি) সুন্নি আলীর উত্তরসূরি সুন্নি বারৌ-কে জনসাধারণের সামনে উপস্থিত হতে এবং ইসলামের প্রতি তাঁর আনুগত্যের কথা প্রকাশ্য স্বীকার করত বলেছিলেন। বারৌ তা করতে অস্বীকার করলে মুহাম্মদ তোরে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করেন এবং নিজের নামে একটি নতুন রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন- যার নাম আস্কিয়া রাজবংশ। 

ক্ষমতা নিজের হাতে নেওয়ার পরে তিনি ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিপুল সংখ্যক মুসলমানকে বিচারক হিসাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। তিনি আলেমদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন এবং তাঁদের উপহার হিসাবে অনেক জমি দিয়েছিলেন। তাঁর সাথে বিখ্যাত আলেম মুহাম্মদ আল-মাগিলির ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই বিশিষ্ট মুসলিম আলেমরা টিম্বাকটুর প্রতি আকৃষ্ট হন, যার ফলে ষোড়শ শতাব্দীতে এই সাম্রাজ্য প্রসিদ্ধ শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।পশ্চিম আফ্রিকায় প্রথম মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই টিম্বাকটুতেই। 

মালির মানসা মুসা-র মতো, আস্কিয়া মুহাম্মদ তোরে হজ করতে গিয়ে আরব দেশগুলির আলেম এবং শাসকদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে তুলেছিলেন। মক্কার রাজা তাঁকে শ্রদ্ধা-সহ আপ্যায়ণ করেছিলেন। রাজা তাঁকে তরোয়াল প্রদান করেছিলেন এবং পশ্চিম সুদানের খলিফার উপাধি দিয়েছিলেন। ১৪৯৭ সালে মক্কা থেকে ফিরে আসার পরে তিনি আল-হজ উপাধির ব্যবহার শুরু করেন।