মাহে রমজান: ইসলামের পীঠস্থানে রমজানের আবহ কেমন থাকত

Muslims holding hands together in prayer
Muslim of islam praying hands concept

মুসলিম বিশ্বের সবখানেই রমজানে কমবেশি পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। তবে ইসলামের সুতিকাগার, রাসুল সা.-এর স্মৃতিবিজড়িত পূণ্যভূমি মক্কা-মদিনায় রমজানের আবহটা অন্যরকম।নবীর সময়ে পবিত্র রমজান মাসে মক্কা-মদিনার অলিতে-গলিতে যে জান্নাতী সুবাস বইত, অপার্থিব যে আবহ ছুঁয়ে যেত প্রতিটি মুমিনের অন্তর; সেই সুবাস ও আবহ আজও মক্কা-মদিনায় অনুভব করা যায়। মুসলিম বিশ্বের যেকোনো দেশ থেকে মক্কা-মদিনার রমজান উদযাপনের চিত্রটা ভিন্নরকম। এ মাসের জন্য তারা দীর্ঘ প্রতীক্ষায় থাকেন। রমজানের বাঁকা চাঁদ উদয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুতেই যেন ফুটে ওঠে পরিবর্তনের স্পষ্ট ছাপ। রাষ্ট্রীয়ভাবেও এ মাসটি উদযাপনের জন্য থাকে নানা আয়োজন। রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় সবার আন্তরিকতা চোখে পড়ার মতো।মসজিদুল হারাম, পবিত্র বায়তুল্লাহর রমজানের চিত্রটা কতই না মোহনীয় ও উপভোগ্য!

রমজান উপলক্ষে লাখ লাখ মুমিন বান্দা ভিড় জমায় আল্লাহর ঘরে। আল্লাহকে পাওয়ার ব্যাকুলতায় কাতর প্রতিটি মুমিন সর্বসত্তা বিলীন করে দেন। রমজানে পবিত্র ওমরা পালনের উদ্দেশে ছুটে যাওয়া বান্দারা তাদের একটি মুহূর্তও অনর্থক কাটতে দেন না। পুরো রমজান মসজিদে হারামে ইতেকাফের জন্য বিশ্বের আনাচে-কানাচে থেকে অগণিত মুমিন বান্দা এখানে আসেন। কেউ তাওয়াফ করছেন, কেউ কোরআন তেলাওয়াতে নিমগ্ন, কেউ লুটিয়ে পড়ছেন স্রষ্টার কুদরতি পায়ে। নামাজের ওয়াক্ত হওয়ার আগেই মসজিদে হারাম কানায় কানায় ভরে যায়। নামাজের জন্য অপেক্ষারত মুসল্লিদের সেই মোহনীয় দৃশ্যটি দেখে যেন ফেরেশতারাও ঈর্ষা করে!

কিন্তু আমরা জানি এ বছরটা অন্যরকম। সমাজে এখন আধ্যাত্মিক অনুরাগ ও ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশ বেশি করে প্রতীয়মান। চরম উন্নত সভ্যতার অক্ষমতা আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে একজন সৃষ্টিকর্তার সার্বভৌম ক্ষমতার কাছে তারা কতটা নির্ভরশীল। আমাদের ফিরিয়ে দিয়েছে ইবাদত পূর্ণ সময়কালে। যেখানে পরম করুণাময়ের আশ্রয়তলে থাকার আকাঙ্খা ছিল অধিক। ব্যস্ততার পাহাড়ে সত্বা হারিয়ে যায়নি। দেড় হাজার বছর আগে যেমন কাটতো মক্কা-মদিনার রমজান। রাসুল সা. ও সাহাবায়ে কেরাম যেভাবে উদযাপন করতেন পবিত্র এই মাস।

রমজানের প্রস্তুতির জন্য শাবান থেকেই নফল রোজা শুরু করতেন প্রিয়নবী (সা.)। হজরত আয়শা (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুল (সা.)-কে শাবান মাস ছাড়া আর কোন মাসেই এত বেশি নফল রোজা রাখতে দেখিনি। বুখারি। রজবের চাঁদ দেখে তিনি বার বার রমজান পর্যন্ত পৌঁছার দোয়া করতেন। বিভিন্ন হাদিস থেকে জানা যায়, রাসুল (সা.) চাঁদ দেখে রোজা শুরু করতেন। হাদিসের বর্ণনা থেকে পাওয়া যায়, কেউ এসে তাকে চাঁদের সংবাদ দিলে তিনি তা ঘোষণা করার অনুমতি দিতেন। তিনি (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখ এবং চাঁদ দেখেই রোজা ছাড়। বুখারি।

পবিত্র রমজান মাস উপনীত হলেই মদিনার পরিবেশ-পরিস্থিতি বদলে যেত। রমজান এলেই রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের এবং সাহাবিরা একে অপরকে রমজানের আগমনী বার্তা দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতেন। স্মরণ করিয়ে দিতেন এই মাসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য। এতে স্বাভাবিক কার্যক্রম থেমে যেত। প্রত্যেকেই মনোনিবেশ করতেন নিজ নিজ আমলের উন্নতির দিকে। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, মাহে রমজান এলেই রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে বলতেন, তোমাদের কাছে রমজান উপনীত হয়েছে, মহিমান্বিত ও বরকতময় মাস। যে মাসে তোমাদের ওপর আল্লাহ সিয়ামকে ফরজ করেছেন। এ মাসে আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের ফটকগুলো বন্ধ করা হয়, বিতাড়িত শয়তানগুলোকে বন্দি করা হয়। এ মাসে এমন এক রাত আছে, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম, যে এই মাসের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো সে যেন সব হারাল। (নাসাঈ : ৪/১২৯)

আগের মুসলিম মনীষীদের অবস্থাও ছিল এমন। রমজান এলেই সবাই পাঠদান স্থগিত করে ইবাদতে বেশি আত্মনিয়োগ করতেন। রমজান এলেই ইমাম জুহুরি (রহ.) অন্য সব কাজ বাদ দিয়ে বলতেন, এ হচ্ছে কোরআন তিলাওয়াত ও অন্যকে আপ্যায়নের মাস। (তামহিদ : ৬/১১১)। ইবনুল হাকাম বলেন, রমজান এলে ইমাম মালেক (রহ.) হাদিসের পাঠাগার ও ইলমের মজলিসগুলো স্থগিত করে দিতেন। (লাতাইফুল মাআরিফ : ১/১৮৩)

খাদ্যাভ্যাসে সংযম ও মিতব্যয়িতা লক্ষ্যণীয় ছিল নবীযুগের রমজানে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিরা খেজুর দিয়ে সাহরি করতে পছন্দ করতেন, আর খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার করতেন। (আবু দাউদ, হাদিস : ২৩৪৫, তিরমিজি, হাদিস : ৬৯৬)। এরকম অনাড়ম্বর আয়োজনে সাহরি ও ইফতার আমাদের সাহাবিদের আদর্শ অনুকরণের ইচ্ছা সৃষ্টি করতে যথেষ্ট। রাসুল (সা.) এর সাহারিও ছিল খুব সাধারণ। তিনি (সা.) দেরি করে একেবারে শেষ সময়ে সেহরি খেতেন। সেহরিতে তিনি দুধ ও খেজুর পছন্দ করতেন। সেহরিতে সময় নিয়ে কঠোরতা করা তিনি পছন্দ করতেন না। অন্যান্য সময়ের চেয়ে রমজানে রাসুল (সা.) এর ইবাদতের পরিমাণ বেড়ে যেত।

বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী তিনি (সা.) দু’হাতে আল্লাহর রাস্তায় দান করতেন। রমজানে রাসুল (সা.) জিবরাইল (আ.) -কে কোরআন শুনাতেন। আবার জিবরাইল (আ.) হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে কোরআন শুনাতেন। রমজানের রাতে তিনি (সা.) খুব কম সময় বিশ্রাম নিয়ে বাকি সময় নফল নামাজে কাটিয়ে দিতেন। শেষ দশ দিন ইতিকাফ করা রাসুল (সা.) এর নিয়মিত সুন্নাত ছিল। ইতিকাফে কদরের রাত তালাশ করাই মূল উদ্দেশ্য। রাসুল (সা.) শাওয়ালের চাঁদ দেখে রোজা ছাড়তেন। একাধিক হাদিস থেকে জানা যায়, শাওয়ালের পহেলা রাত খুবই বরকতময়। এ রাতে রাসুল এবং সাহাবীরা ইবাদত-বন্দেগী করে কাটিয়ে দিতেন। আমাদেরও উচিত রাসুলের আদর্শে ইবাদতময় জীবন গড়ে তোলা।