মাহে রমজান: কেন রোজা ভাঙবে না আমাদের

Latih anak berpuasa © Arapix | Dreamstime.com

মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পানাহার থেকে বিরত থাকা ও বেশি সময় ধরে প্রার্থনার ভেতর দিয়ে মুসলমানরা রমজান মাসে নতুন করে আত্মশুদ্ধি অর্জনের চেষ্টা করেন। আপাতদৃষ্টিতে রোজা সহজ সরল একটি ধর্মীয় আচরণের বিষয়। তবে এটি নিয়ে বেশ কিছু ভুল ধারণা বিদ্যমান, যেগুলো নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

কোরআন-হাদিসের আলোকে রোজা ভঙ্গ হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে-

১. রোজা ভঙ্গের কারণ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা

যদি না জেনে রোজা ভঙ্গকারী রোজা ভেঙে যায় এমন কোনো কাজে লিপ্ত হয়, তাহলে রোজা ভঙ্গ হবে না। কারণ আল্লাহতায়ালা সূরা বাকারায় বলেন- ‘হে আমাদের রব! আপনি আমাদের পাকড়াও করবেন না, যদি আমরা ভুলে যাই কিংবা কোনো ভুল করে বসি।’ -সূরা বাকারা : ২৮৬

অন্য আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর তোমরা ভুলে যা কর, তাতে কোনো অপরাধ নেই। অবশ্য ইচ্ছাপূর্বক তোমাদের হৃদয় যা করছে তার ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, অতিশয় দয়ালু।’ -সূরা আহজাব : ৫

না জানার কারণে রোজা না ভাঙার বিষয়টি ব্যাপক, হতে পারে সে শরিয়তের হুকুম সম্পর্কে অজ্ঞ। যেমন, সে ধারণা করে যে এ জিনিসটায় রোজা ভাঙ্গবে না, ফলে তা করে বসে। অথবা কাজ করা অবস্থায় বা সময়ে সেটি তার অজানা ছিল। যেমন, সে ধারণা করে যে, ফজর বা সুবহে সাদিক এখনো হয়নি, ফলে সে পানাহার চালিয়ে যায় অথচ ফজরের সময় হয়ে গেছে। কিংবা সূর্য অস্তমিত হয়ে গেছে মনে করে খেয়ে ফেলল অথচ সূর্য তখনও অস্ত যায়নি। এসব কারণে রোজা ভঙ্গ হবে না। কারণ সহিহ বোখারিতে হজরত আসমা বিনতে আবি বকর (রা.)-এর হাদিসে এসেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা নবী করিম (সা.)-এর যুগে ইফতার করেছিলাম এক মেঘলা দিনে তারপর সূর্য দেখা গিয়েছিল।’ এখানে তিনি উল্লেখ করেননি যে, নবী (সা.) তাদের রোজাটি কাজা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন; কারণ তাদের সময় অজানা ছিল।

২. রোজার কথা স্মরণ না থাকা

যদি রোজা পালনকারী নিজ রোজার কথা ভুলে রোজা ভেঙে যায় এমন কোনো কাজ করে ফেলেন তাহলে তার রোজা শুদ্ধ হবে, তাকে আর সেটা কাজা করতে হবে না।  তাছাড়া হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে রোজা পালনকারী ভুলে পানাহার করলো, সে যেন তার রোজা পূর্ণ করে; কেননা আল্লাহই তাকে পানাহার করিয়েছেন।’ নবী (সা.) কর্তৃক রোজা পরিপূর্ণ করার নির্দেশ প্রদান সে রোজা সহিহ হওয়ার স্পষ্ট দলিল। কিন্তু যখনই স্মরণ হবে কিংবা কেউ স্মরণ করিয়ে দেবে তখনই: সেটা থেকে বিরত থাকবে এবং মুখে কিছু থাকলে তাও নিক্ষেপ করবে; কারণ এখন তার ওযর দূরীভূত হয়েছে।

৩. স্বতঃস্ফূর্তভাবে রোজা ভঙ্গ করা

রোজা ভঙ্গকারী নিজের পছন্দ ও ইচ্ছা অনুযায়ী যদি রোজা ভেঙে যায় এমন কিছু করে তবেই কেবল তার রোজা নষ্ট হবে। অন্যথায় যদি রোজা পালনকারীকে জোর-জবরদস্তি করে রোজা ভঙ্গ করানো হয় তবে তার রোজা বিশুদ্ধ হবে, তার আর সেটা কাজা করতে হবে না। কারণ, আল্লাহতায়লা কুফুরির হুকুমকে সে ব্যক্তি থেকে উঠিয়ে নিয়েছেন যাকে কুফুরি করতে জোর করে বাধ্য করা হয়েছে, যখন তার অন্তর ঈমানের ওপর অটল থাকে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কেউ তার ঈমান আনার পর আল্লাহর সঙ্গে কুফরি করলে এবং কুফরির জন্য হৃদয় উন্মুক্ত রাখলে তার ওপর আপতিত হবে আল্লাহর গজব এবং তার জন্য রয়েছে মহাশাস্তি; তবে তার জন্য নয়, যাকে কুফরির জন্য বাধ্য করা হয় কিন্তু তার চিত্ত ঈমানে অবিচলিত।’ -সূরা আন নাহল : ১০৬

অনুরূপভাবে রাসূল সা. বলেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি এবং বাধ্য হয়ে করা বিষয় ক্ষমা করেছেন।’ অসুস্থ, অন্তঃসত্ত্বা, দুর্বল, ভ্রমণকারীর জন্য রোজা আবশ্যিক নয়। ইসলামে শুধু প্রাপ্তবয়স্ক (সাধারণত ১৫ বছর) এবং সুস্থ ব্যক্তির রোজা ফরজ বা আবশ্যিক করা হয়েছে। মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন (এমসিবি) আন্তর্জাতিক গ্লুকোমা সমিতির সঙ্গে যৌথ একটি বিবৃতি দিয়ে বলেছে- রোজা রেখেও কিছু ওষুধ ব্যবহার করা যাবে। যেমন চোখের ড্রপ। এমসিবি বলেছে, চোখের ড্রপ, কানের ড্রপ বা ইনজেকশনে রোজা ভাঙবে না। তবে যেসব ওষুধ মুখে দিয়ে খেতে হয়, সেগুলো নিষিদ্ধ। সেহরির আগে এবং ইফতারির পর তা খেতে হবে।

অনিচ্ছাকৃত বমি হলে (এমনকি মুখ ভরে হলেও) রোজা ভাঙবে না। তেমনি বমি মুখে এসে নিজে নিজেই ভেতরে চলে গেলেও রোজা ভাঙবে না। বলা হয়েছে, অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো ব্যক্তির বমি হলে তার রোজা কাজা করতে হবে না। -জামে তিরমিজি: ১/১৫৩, হাদিস : ৭২০

শরীর বা মাথায় তেল ব্যবহার করলে রোজা ভাঙবে না। হজরত কাতাদা (রা.) বলেন, ‘রোজাদারের তেল ব্যবহার করা উচিত, যাতে রোজার কারণে সৃষ্ট ফ্যাকাশে বর্ণ দূর হয়ে যায়। -মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক: ৪/৩১৩