মাহে রমজান: তারাবীহর নামাজের গুরুত্ব কোথায়?

Group of muslims standing at prayer in beautiful decorated mosque
Group of muslims standing at prayer in beautiful decorated mosque

তারাবীহ অত্যন্ত ফজীলতপূর্ণ নামাজ, যার দ্বারা বান্দার জীবনের গুনাহ ক্ষমা করা হয়। মহানবী (সা:) রমজান মাসে তারাবীহ নামাজ  আদায় করার জন্য সাহাবা-এ-কেরামকে বিশেষভাবে উৎসাহ প্রদান করতেন। ‘রমজান মাসে এশার নামাজের পর যে (২০ রাকাত) সুন্নাত নামায পড়া হয়, তা হল তারাবীহর নামায।’ এই নামাজের নিয়ম হল প্রতি দুই রাকাত পর সালাম ফিরানো এবং প্রতি চার রাকাত পর বসে বিশ্রাম গ্রহণ করা । এই নামাজ কে ‘কিয়ামে রমজান’ও বলা হয় । যখন থেকে সাহাবায়ে কেরাম এ নামায সম্মিলিতভাবে জামাতে আদায় করতে আরম্ভ করেন তখন থেকেই তাঁরা চার রাকাতের পর বিশ্রাম নিতেন। তাই এ নামাযের নাম করা হয় তারাবীহ (ফাতহুল বারী, কিতাবু সালাতিত তারাবীহ ৪/২৯৪, তুহফাতুল আলমায়ী ২য় খন্ড, ২৮৯ পৃ:,কামুসুল ফিকহ ২য় খন্ড , ৪৪৮পৃ:, আলবাহরুর রায়েক: ২য় খন্ড, ১১৬ পৃষ্ঠা)।

আল্লাহর ওপর ইমান আনার পরই ইসলামের প্রথম ও দ্বিতীয় আমল হলো যথাক্রমে নামাজ ও রোজা। কোরআনের সঙ্গে রোজা ও নামাজের সম্পর্ক সুগভীর। রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রতি রোজা ফরজ করেছেন আর আমি তোমাদের জন্য তারাবীহর নামাজ সুন্নত করেছি; অতএব যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানে দিনে রোজা পালন করবে ও রাতে তারাবীহর নামাজ আদায় করবে, সে গুনাহ থেকে এমন পবিত্র হবে; যেমন নবজাতক মাতৃগর্ভ থেকে (নিষ্পাপ অবস্থায়) ভূমিষ্ঠ হয়। (নাসায়ি, প্রথম খণ্ড, ২৩৯ পৃষ্ঠা)।

রমজান মাসের সুন্নতগুলোর অন্যতম হলো কোরআন তিলাওয়াত ও তারাবীহর নামাজ পড়া। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের উদ্দেশ্যে রমজান মাসে তারাবীহর নামাজ পড়বে, তার অতীতের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি, প্রথম খণ্ড, ৩০ পৃষ্ঠা, হাদিস: ৩৬; ই. ফা.)। তারাবীহ শব্দটি বহুবচন। এর একবচন হলো তারবিহা; যার আভিধানিক অর্থ হলো বিশ্রাম, স্বস্তি, শান্তি ও প্রশান্তি। রমজান মাসে এশার নামাজের পর যে সুন্নতে মুয়াক্কাদা ২০ রাকাত নামাজ আদায় করা হয়, তাকে তারাবীহর নামাজ বলে। (আল কামুসুল ফিকহ)।

রাসূল (সা) এর জীবনের শেষ বছর তিনি এক রাতে তারাবীহ আদায় করলেন। সেই রাতে তার সাথে থাকা আরও কিছু মানুষ তার সাথে তারাবীহ পড়লেন। পরেরদিন এই কথা সব জায়গায় ছড়িয়ে গেল এবং রাতে আরও অনেক মানুষ তারাবীহ পড়তে এলেন। তৃতীয় রাতে এর চাইতেও বেশি সংখ্যক মানুষ তারাবীহ আদায় করলেন। চতুর্থ রাতে পুরো মসজিদ পূর্ণ হয়ে গেলো এবং সবাই আল্লাহর রাসূলের (সা) অপেক্ষা করতে লাগলেন।

সেই রাতে আল্লাহর রাসূল (সা) বাড়িতে একাকীই এই সালাত আদায় করলেন। ফজরের পরে তিনি বললেন, “আমি ভয় পাচ্ছিলাম প্রতিদিন এভাবে সালাত আদায়ের দরুণ এটি না তোমাদের ওপর ফরজ হয়ে যায়! এই ভাবনা ব্যতীত আর কিছুই আমাকে গত রাতে মসজিদে আসার ক্ষেত্রে বিরত রাখতে পারেনি।” ( মুসলিম )
আবু বকর (রা) এর খিলাফত থেকে উমার (রা) এর সময় পর্যন্ত সাহাবীরা বাড়িতে কিংবা অল্প কিছু মানুষ একত্রিত হয়ে এই সালাত আদায় করতেন। এর পরে, উমার (রা) ইমামের পেছনে দলবদ্ধভাবে এই সালাত আদায়ের প্রচলন করেন। তারা আট রাকাত সালাত আদায় করতেন। সবশেষে, মানুষের জন্য সহজ করার উদ্দেশ্যে তা বিশ রাকাত পড়া হতো।

তারাবীহ নামায নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এ নামায পুরুষ মসজিদে জামাতের সঙ্গে আর মহিলা ঘরে আদায় করা বেশি সওয়াবের কাজ। এ নামাযে কোরআন শরীফ খতম করা অধিক সওয়াবের কাজ। তবে সূরা তারাবীহর মাধ্যমে আদায় করলেও নামায হয়ে যাবে। ফুকাহায়ে কেরাম বলেন: পুরুষের মসজিদে জামাতের সাথে তারাবীহর নামায পড়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদা কেফায়া। কোন মহল্লায় যদি কেউ-ই জামাতের সাথে না পড়ে তাহলে সকলেই গুনাগার হবে। আর যদি কিছু লোক মসজিদে জামাতের সাথে আদায় করে আর কেউ কেউ ঘরে একা একা আদায় করে তাহলে সকল গুনাগার হবে না । তবে একথা অবশ্যই স্বরণ রাখতে হবে যে, যারা একা একা পড়ল তারা জামাতে পড়ার সওয়াব থেকে বঞ্চিত হল। (কামুসুল ফিকহ: ২য় খন্ড, ৪৫০পৃষ্ঠা)

হজরত আবুজার গিফারী (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলে করিম (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইমামের সঙ্গে তারাবীহর নামাজ পড়ল, ইমাম প্রস্থান করা পর্যন্ত (জামাতে নামাজ সমাপ্ত করে গেল) তার কিয়ামে লাইল (রাত জাগরণের সওয়াব পূর্ণরূপে) লিখিত হবে।’ (তিরমিজি, তৃতীয় খণ্ড, ১৬১-১৬৯ পৃষ্ঠা, হাদিস: ৮০৬)। শাঈখ উসাইমিন (রহ.) বলেন, ‘সুন্নত হলো ইমামের অনুসরণ করবে; যদি ইমাম (তারাবীহ) পরিপূর্ণ করার আগে (মুক্তাদি) চলে যায়, তাহলে সে (মুক্তাদি) কিয়ামে লাইল বা রাত্রি জাগরণের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়।’ (মাজমুউল ফাতাওয়া, চতুর্দশ খণ্ড, ২০০-২০১ পৃষ্ঠা)। শাঈখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন: মক্কা ও মদিনা শরিফে সাহাবায়ে কেরামের সময় থেকে আজ পর্যন্ত সব সময় ২০ রাকাত তারাবীহ খতমে কোরআনসহ জামাতের সঙ্গে পড়া হয়। কেউ যদি জামাতে ২০ রাকাত তারাবীহর পূর্ণ না করে চলে যায়, তার খতমও পূর্ণ হয় না।