সন্তানকে স্তন্যপান করানোর সময় মায়েরা দুধ কেন খাবেন?

স্বাস্থ্য ১৩ মার্চ ২০২১ Contributor
জানা-অজানা
স্তন্যপান করানোর সময় দুধ
© Eptian Savero Fitrahnsa | Dreamstime.com

সন্তানকে স্তন্যপান করানোর সময় দুধ কেন খাবেন? ডেলিভারির পর ব্রেস্টফিডিংয়ের সময় ডাক্তারের মুখে গরুর দুধ খাওয়ার পরামর্শ শুনে অবাক হয়েছিলেন রুমিনুর বেগম। পরে তিনি জানতে পারেন, যে-সমস্ত মায়েরা সন্তানকে স্তন্যপান করাকালীন সময়ে নিয়ম করে গরুর দুধ খেয়ে থাকেন, তাঁদের সন্তানদের ক্ষেত্রে ফুড অ্যালার্জির সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়। সম্প্রতি সুইডেনের চামার্স ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি (Chalmers University of Technology)-র একদল গবেষকদের সমীক্ষায় উঠে এল এমনই তথ্য। বৈজ্ঞানিক পত্রিকা ‘নিউট্রিয়েন্টস’-এ এই সমীক্ষার বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে।

প্রায় ৫০০ জনেরও বেশি সুইডিশ মহিলার খাদ্যাভ্যাস এবং তাঁদের একবছর বয়সী সন্তানদের কোনওরকম খাবারে অ্যালার্জি রয়েছে কি না, তা নিয়ে সমীক্ষা চালানোর পরই বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে আসেন যে, স্তন্যপান করানোর সময় মায়েদের গরুর দুধ খাওয়ার অভ্যেস শিশুর অ্যালার্জির সম্ভাবনা হ্রাস করে।

চামার্স ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজির ফুড সায়েন্স বিভাগের গবেষক ছাত্র এবং এই সমীক্ষার অন্যতম লেখক মিয়া স্ট্র্যাভিকের কথায়, “একবছর বয়স্ক স্বাস্থ্যবান বাচ্চাদের ক্ষেত্রে যে-সমস্ত মায়েরা স্তন্যপানের সময় নিয়ম করে গরুর দুধ খেয়েছেন, তাঁদের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে অ্যালার্জির সম্ভাবনা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। তবে গরুর দুধ খাওয়ার সঙ্গে অ্যালার্জি না হওয়ার যোগসূত্রটি স্পষ্ট হলেও আমরা এখনই দাবি করছি না যে, গরুর দুধ খেলেই আপনার সন্তান সমস্তরকম ফুড অ্যালার্জি থেকে মুক্তি পাবেন!”

খাবারে অ্যালার্জি কেন হয়?

এই প্রশ্ন চিরন্তন। জিনগত সমস্যা ছাড়াও নানা কারণে কোনও-কোনও খাবার থেকে কারওর-কারওর ক্ষেত্রে অ্যালার্জির প্রবণতা দেখতে পাওয়া যায়। কারওর চিংড়িমাছে অ্যালার্জি, কেউ বা আবার বেগুন খেলেই জিভ চুলকোতে থাকেন! মিয়া স্ট্র্যাভিকের মতে, “বাবা-মায়েদের খাদ্যাভ্যাস সন্তানের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। ঠিক যেমন, রোগা হবেন ভেবে ট্রেন্ডে গা ভাসিয়ে এখন অনেক কমবয়সী মহিলাই দুধ এড়িয়ে চলেন!”

তাঁর কথায়, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে দুগ্ধজাত প্রোটিন থেকে অ্যালার্জির সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে তাঁরা নিশ্চিন্তে দুধ ও অন্যান্য দুগ্ধজাত খাবার খেতে পারেন। তবে অনেকেই দুগ্ধজাত দ্রব্য বা দুধ সহ্য করতে পারেন না। এটি কিন্তু অ্যালার্জি নয়। এইসমস্ত ক্ষেত্রে দেখা যায়, শরীরের পাচনতন্ত্র দুগ্ধ শর্করাকে ভাঙতে পারে না, ফলে সমস্যা দেখা যায়। এঁদের ল্যাকটোজ যুক্ত খাবার না খাওয়াই উচিত।

‘হাইজিন হাইপোথিসিস”: স্তন্যপান করানোর সময় দুধ কেন খাবেন

মিয়া স্ট্র্যাভিকের সুপারভাইসর, অধ্যাপক অ্যান-সোফি স্যান্ডবার্গের মতে, মায়েরা যদি তাঁদের খাদ্যতালিকায় দুধ রাখেন, তাহলে তা শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে।

“সন্তান যাতে সমস্তরকম খাবারে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারে, সেজন্য সন্তানের বৃদ্ধির সময় এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠা অত্যন্ত জরুরি।” ‘হাইজিন হাইপোথিসিস’ বা স্বাস্থ্যবিধি অনুমান অনুসারে, ছোট থেকেই যদি শিশুরা বিভিন্ন অনুজীব বা মাইক্রোঅর্গানিজমের সংস্পর্শে আসতে থাকে, তাহলে তা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, জানালেন তিনি। “তবে, যেহেতু আমরা এখন আরও বেশি সচেতন হয়েছি, ফলে আশপাশের পরিবেশে অনুজীবের পরিমাণও কমেছে। তাই এখন মায়েদের খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমেই সন্তানের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা গড়ে ওঠে।”

তবে, সন্তানের যাতে অ্যালার্জি না হয়, সেজন্য স্তন্যপান করানোর সময় দুধ কেন খাবেন, এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য মিয়া স্ট্র্যাভিকের এই সমীক্ষাই প্রথম নয়। যদিও এর আগের সমস্ত সমীক্ষা প্রশ্নোত্তরের ভিত্তিতে করা হয়েছিল—এবং সেখানে খাদ্যাভ্যাস এবং অ্যালার্জির উপস্থিতিই প্রাধান্য পেয়েছিল। তার তুলনায় এই সমীক্ষায় তথ্য ও তার বিশ্লেষণে প্রাপ্ত ফলাফল অনেক বেশি প্রামাণ্য।

“এই সমীক্ষায় আমরা বায়োমার্কারের সাহায্যে মহিলারা প্রতিদিন কী পরিমাণ দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্য খাচ্ছেন, তা তাঁদের রক্ত ও ব্রেস্টমিল্কের পরীক্ষা করে জানার চেষ্টা করেছি। গরুর পেটে যে-দু’টি ফ্যাটি অ্যাসিড উৎপন্ন হয়, সেগুলিই হল বায়োমার্কার, এগুলিই দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্যে থাকে, জানাচ্ছেন মিয়া স্ট্র্যাভিক। “এছাড়া, শিশুদের অ্যালার্জি রয়েছে কিনা, তা একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দিয়ে পরীক্ষা করানো হয়েছে।”

এই সমীক্ষাটি উত্তর সুইডেনের লুল্যো শহরের কাছে সান্ডারবাই হাসপাতালে ২০১৫-২০১৮ সালের মধ্যে যে-সমস্ত মায়েরা সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, সেই ৬৫৫টি পরিবারকে নিয়ে করা এক বৃহত্তর গবেষণার এক অংশ। চামার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান-সোফি স্যান্ডবার্গ, ইউনিভার্সিটি অফ গোথেনবার্গের অধ্যাপক অ্যাগনেস ওয়ল্ড এবং উমৌ ইউনিভার্সিটি এবং সান্ডারবাই হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত চিফ ফিজিশিয়ান এবং পেডিয়াট্রিক অ্যালার্জিস্ট অ্যানা স্যান্ডিন একত্রে এই প্রজেক্টটির সূচনা করেন। উত্তর সুইডেনের পরিবারগুলির অ্যালার্জি সংক্রান্ত বিষয়ে এটিই প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা।

খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে অ্যালার্জির স্পষ্ট সংযোগ রয়েছে

এই সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী প্রায় ৫০০ জনেরও বেশি মা তিনবার তাঁদের খাদ্যাভ্যাসের বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন—প্রথমবার গর্ভাবস্থার ৩৪তম সপ্তাহে, দ্বিতীয়বার সন্তান জন্মের একমাস পরে এবং পরিশেষে সন্তান জন্মের চারমাস পরে। জন্মের একবছর পরে শিশুদের পরীক্ষা করা হয় এবং তাদের খাবারে কোনওরকম অ্যালার্জি রয়েছে কিনা, বা চর্মরোগ, হাঁপানি ইত্যাদি রয়েছে কিনা, তা চিহ্নিত করা হয়। এছাড়া জন্মগত নানা রোগ, অবস্থার পর্যালোচনা করেই গবেষকরা সন্তানদের ক্ষেত্রে ফুড অ্যালার্জির সঙ্গে স্তন্যপানের সময় মায়েদের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য খাওয়ার সংযোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হন।

“আমরা যেভাবেই ফলাফলগুলি বিচার করছিলাম না কেন, একই সিদ্ধান্তে বারবার পৌঁছচ্ছিলাম,” এমনটাই বক্তব্য চামার্সের আর এক গবেষক এবং সহ-লেখক ও মিয়া স্ট্র্যাভিকের অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারভাইসর মলিন বর্মণের। যদিও “দুধ কীভাবে অ্যালার্জির সম্ভাবনা হ্রাস করছে, তা যদিও এখনও স্পষ্ট করে জানা যায়নি!” সমীক্ষাটি থেকে প্রাপ্ত বাকি অনুমানগুলি নীচে ব্যাখ্যা করা হল।

মিয়া স্ট্র্যাভিকের মতে, সমীক্ষায় আরও দেখা গিয়েছে যে, ব্রেস্টফিডিং করাচ্ছেন, এমন মা, যারা তাঁদের চতুর্থ মাসে প্রচুর পরিমাণে ফল এবং বেরি খেয়েছেন, তাঁদের সন্তানদের চর্মরোগের প্রবণতা অপেক্ষাকৃত বেশি। যদিও এক্ষেত্রে আরও বিশদ গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। এই বয়সের শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে বর্তমানে গবেষণা চলছে।

স্তন্যপান করানোর সময় দুধ ও সন্তানের অ্যালার্জি

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে অ্যালার্জি খুব সাধারণ একটি সমস্যা। সুইডেন সহ অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশে এই অ্যালার্জির প্রবণতা বর্তমানে আরও বেশি করে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৫০৮ জন শিশুর মধ্যে—

  •  একবছর বয়স্ক ৭.৭% (৩৯ জন) শিশুর ক্ষেত্রে গরুর দুধ বা ডিমে (বা দুটোতেই) অ্যালার্জি দেখা গিয়েছে
  •  ৬.৫% (৩৩ জন) শিশুর চর্মরোগ ধরা পড়েছে, সমপরিমাণ শিশুর হাঁপানি ধরা পড়েছে
  •  একবছর বয়স্ক ২৩% শিশুর কোনও না কোনও কারণে অ্যালার্জি (খাবার ছাড়াও) দেখা গিয়েছে

দুধের সঙ্গে অ্যালার্জির কী সম্পর্ক?

তবে, মায়েদের খাদ্যতালিকায় গরুর দুধ থাকলে তা কীভাবে সন্তানদের ক্ষেত্রে অ্যালার্জির সম্ভাবনা হ্রাস করে, তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। গবেষক মলিন বর্মণের মতে, এটিকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।

“স্তন্যপান করানোর সময় দুধ কেন খাবেন, সেক্ষেত্রে বলা যায়, সম্ভবত গরুর দুধে এমন কিছু উপাদান থাকে, যা শিশুদের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতাকে সক্রিয় করে তোলে এবং সহনশীলতা গড়ে তোলে। এই উপাদান গরুর দুধে থাকা ফ্যাট বা প্রোটিনে থাকতে পারে। তবে এটাও ঠিক, রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতার সঙ্গে দুধের সেরকম কোনও সম্পর্ক নেই। সাধারণত, বেশি করে মিল্ক ফ্যাট খেলে তা পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণের প্রবণতা হ্রাস করে। আর আমরা মনে করি, মায়ের খাদ্যতালিকায় যদি অতিরিক্ত পরিমাণে পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে, তাহলে তা কম বয়সেই সন্তানের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা গঠনের ক্ষেত্রে বাধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”

তাহলে স্তন্যপান করানোর সময় দুধ কেন খাবেন, এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয়ই আপনারা এতক্ষণে পেয়ে গিয়েছেন। ফলে নিজে সুস্থ থাকতে, এবং আপনার সন্তানকে সুস্থ রাখতে খাদ্যতালিকায় গরুর দুধ নিয়ম করে রাখা কিন্তু অবশ্যই প্রয়োজনীয়।

(এই গবেষণাটি সুইডিশ রিসার্চ কাউন্সিল, সুইডিশ রিসার্চ কাউন্সিল ফর হেলথ, ওয়র্কিং লাইফ অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার (ফোর্ট), ভাস্ত্রা গোটাল্যান্ড রিজিয়ন, রিজিয়ন নরবটেন, ম্যাগনাস বার্গভালস স্টিফেলস, উইলহেলম ওক মার্টিনা লান্ডগ্রেনস স্টিফেলস, পার হাকানসনস স্টিফেলস, স্টিফেলসেন সিগার্ড ওক এলসা গোলিজেস মিন, দ্য রয়্যাল সোসাইটি অফ আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস ইন গোথেনবার্গ অ্যান্ড জেন ওক ড্যান ওলসনস স্টিফেলস-এর থেকে আর্থিক সহযোগিতা পেয়েছে। তবে গবেষণার ধরন, তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, প্রকাশনা ইত্যাদির ক্ষেত্রে এদের কোনও ভূমিকা নেই।)