মা হিসাবে মুসলিম মহিলার ভূমিকা

Daughter shake hand with mother and kissing her mother arms

ইসলাম একজন মাকে আদর্শ জননী হওয়ার প্রতি মনোযোগী হওয়ার কথা বলেছে এবং এ বিষয়ে বেশ গুরুত্ব প্রদান করেছে। পারিবারিক জীবনে মায়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান গর্ভে ধারণ ও লালন-পালনের সামগ্রিক দায়িত্ব মায়ের একার ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহ তা’আলা বলেন “মা সন্তানকে অতি কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করেন এবং প্রসব করেন।” (আল কুরআন-৩১:১৫)

সন্তানের চরিত্র গঠনে

কুরআন ও হাদিসের আলোকে একজন আদর্শ জননীকে নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলোর প্রতি তীক্ষ দৃষ্টি রাখতে হবে। মা সন্তানকে যে আদর্শে বড় করতে চান, প্রথমে তাকে সে আদর্শে গড়ে উঠতে হবে। সন্তানের সঙ্গে মায়ের সম্পর্ক নিবিড় হওয়া উচিত। আদর্শ পরিবারে মাকে সন্তান যেমন শ্রদ্ধা-সম্মানের চোখে দেখবে, তেমনি মায়েরও উচিত সন্তানের ব্যক্তিত্বের প্রতি লক্ষ্য রাখা। ছেলেমেয়েদের ইসলামী সহিহ আকিদা শেখাবেন। অবশ্যই মনে রাখতে হবে ছেলেমেয়েদের উপস্থিতিতে কখনো স্বামীর সঙ্গে তর্ক-বিতর্ক বা ঝগড়া করবেন না। মাঝে-মধ্যে সন্তানদের নিয়ে চরিত্র গঠনমূলক সত্য ও উন্নত কাহিনীর মাধ্যমে গল্প করবেন। ছেলেদের বাবা, ভাই অথবা বন্ধুদের সঙ্গে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মসজিদে পাঠাবেন।

মাকে এমনভাবে পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে সন্তান ধর্মীয় বিধি-বিধান, আইন-অনুশাসন পুরোপুরি মেনে চলে। সন্তানের সব সঙ্গতি-অসঙ্গতির ব্যাপারে প্রথমত মা’ই দায়ী। ফলে সন্তানের পরিশুদ্ধি, ধর্মের অনুশীলন ইত্যাদির ব্যাপারে প্রথমে মাকেই পরিশুদ্ধ হতে হবে, তাকে ধর্মচর্চা করতে হবে। মা যদি ধর্মীয় ব্যাপারে উদাসীন হন, তাহলে সন্তান কিছুতেই এ ব্যাপারে মায়ের নির্দেশ মানবে না। তাই মায়ের মধ্যে ধর্মীয় ব্যাপারে কোনো ত্রুটি থাকলে দ্রুত তা ঠিক করে ফেলা উচিত। নিজেরা ত্রুটিমুক্ত হলে সন্তানও ত্রুটিমুক্ত হবে। সন্তানের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলা মাযের কর্তব্য। তাদের সঙ্গে আচার-আচরণ, কথাবার্তা, চলাফেরায় সচেতন ও সতর্ক হওয়া। সন্তানের মন-মানসিকতা বুঝতে হবে। তাদের চাহিদাগুলো পূরণের ব্যাপারে আন্তরিক হতে হবে।

পৃথিবীর সব সন্তানের কাছে ‘মা’ শব্দটি যেমন সবচেয়ে দৃঢ় সম্পর্কের নাম, তেমনি সবচেয়ে পবিত্র ও মধুরতম শব্দের নাম। সন্তানের জীবনের চরম সংকটকালে পরম সান্ত্বনা ও ভরসার স্থল হিসেবে যার কথা প্রথম মনে পড়ে তিনি মমতাময়ী মা।

মায়ের পায়ের নীচে স্বর্গ

একজন আদর্শ মায়ের অভাবে ব্যক্তি, সমাজ ও জাতি বিপন্ন হতে বাধ্য। সুতরাং মা হিসেবে ইসলামে একজন মুসলিম নারীর অবস্থান বা মর্যাদা অকল্পনীয়। মায়ের সম্পর্কে পবিত্র হাদিসে বলা হয়েছে, “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।” কম শব্দের এ হাদিসে অত্যন্ত ব্যাপকভাবে বলে দেওয়া হয়েছে মা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি। সুতরাং মায়ের সন্তুষ্টি অর্জন একজন সন্তানের অপরিহার্য দায়িত্ব।

শান্তি, ন্যায় ও মানবতার ধর্ম ইসলাম মা’কে দিয়েছে বর্ণনাতীত মর্যাদা ও সম্মান। ইসলামের দৃষ্টিতে বাবার চেয়ে মায়ের মর্যাদা তিন গুণ বেশি। এ প্রসঙ্গে হাদিসে এরশাদ হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রাযিঃ) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে জানতে চাইলেন, হে আল্লাহর রাসূল! মানুষের মাঝে আমার নিকট থেকে সর্বোত্তম সেবা লাভের অধিকার কার? নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার মায়ের। লোকটি পুনরায় জানতে চাইলেন, তারপর কার? তিনি বললেন, তোমার মায়ের। লোকটি পুনরায় জানতে চাইলেন, তার পর কার? তিনি বললেন, তোমার মায়ের। লোকটি আবারও জানতে চাইলেন, তারপর কার? তিনি বললেন, তোমার পিতার। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

জননীর স্নেহ অতুলনীয়

মায়েরা সাধারণত আদর্শ হন। ইসলাম আদর্শ মা হওয়ার জন্য খুব বেশি কঠিন কোনো শর্ত দেয়নি। বিষয়টি খুব কঠিনও নয়। অনেক সময় মায়েরা অনেক কাজই অতিরিক্ত করেন, যা তাদের ইসলাম বাধ্য করেনি। যেমন ধরুন, সন্তানের লালন-পালনের বিষয়টি। আমাদের দেশে মা-ই সন্তানকে দেখভাল করেন বললে ভুল হবে না। ফজরের আগে থেকে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত মা তার সন্তানের জন্য সদা নিয়োজিত। কত কষ্টই না তারা করেন! আর বাবা থাকেন সারা দিন তার দুনিয়ার ব্যস্ততা নিয়ে।

এখন মা যদি চান তার সন্তানকে তার স্বামীর চেয়ে বেশি আদরযত্ন করবেন না; স্বামী যতটুকু সময় দেবেন, তিনিও ততটুকু সময় দেবেন; স্বামী যতটুকু দেখভাল করবেন, তিনিও ততটুকু দেখভাল করবেন। তাহলে তিনি তা করতে পারেন। হক আদায় না করার গুনাহ হবে না। তবে অবশ্যই তাকে সন্তানের প্রতি স্নেহ-ভালোবাসা কম করার জন্য জবাব দিতে হবে। কিন্তু মায়েরা তার ওপর যেটা হক বা আবশ্যক নয়, তা-ও সন্তানের জন্য করেন।

একজন মা যদি কেবল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর বিশ্বাস রাখেন আর ঠিকমতো তাঁর ফরজ দায়িত্বগুলো আদায় করে যেতে পারেন তাহলেই তার আখিরাত সফল হবেন।