মিথ্যা কথা বলা সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গী

মনস্তত্ত্ব ১২ মার্চ ২০২১ Contributor
মিথ্যা কথা বলা
© Artur Szczybylo | Dreamstime.com

ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষা হল, সত্যবাদিতার গুণ অর্জন করা এবং মিথ্যা কথা বলা পরিহার করা। এ ছাড়া কেউ পরিপূর্ণ মুমিন হতে পারে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো আর সত্যবাদীদের সহচার্য অবলম্বন করো।” (৯:১১৯)

সত্য ও মিথ্যার পরিণতি তুলে ধরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা সত্যকে অবলম্বন করো। কারণ সত্যবাদিতা ভালো কাজে উপনীত করে। আর ভালো কাজ উপনীত করে জান্নাতে। মানুষ সত্য বলতে থাকে ও সত্যবাদিতার অন্বেষায় থাকে, এভাবে একপর্যায়ে সে আল্লাহর নিকট সত্যবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়।

আর মিথ্যা থেকে দূরে থাকো। কারণ মিথ্যা পাপাচারে উপনীত করে। আর পাপাচার উপনীত করে জাহান্নামে। কোনো ব্যক্তি মিথ্যা বলতে থাকে এবং মিথ্যার অন্বেষায় থাকে, এভাবে একপর্যায়ে আল্লাহর নিকট সে চরম মিথ্যুক হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়।” (মুসলিম)

এই হাদীসে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্যকে অবলম্বন করার এবং মিথ্যা কথা বলা থেকে দূরে থাকার জোর তাকীদ করেছেন। এজন্য সর্বদা সত্য বলা ফরয আর মিথ্যা বলা হারাম।

চারিত্রিক ব্যাধি মিথ্যা কথা বলা 

মিথ্যা বলা বা মিথ্যাচার জঘন্যতম ঘৃণিত অভ্যাস। জানবেন, মিথ্যা বলার চেয়ে অপরাধ আর নেই। তাই মিথ্যাবাদীকে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্ললাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আদৌ পছন্দ করেন না। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে মিথ্যুক এবং মিথ্যাবাদীর ভয়ানক পরিণতির কথা বলা হয়েছে। মিথ্যাচারে যে বা যারা অভ্যস্ত থাকে, কোনো মানুষ তার সামান্য কথা ও উক্তি বিশ্বাস করে না। কেননা, এসব লোকের খপ্পরে পড়লে মানুষ প্রতারিত হয়।

এই মিথ্যা বিষয়টি এমনই যে, মিথ্যাকে সত্য বলে প্রমাণ করতে গিয়ে হাজারও ছল-চাতুরি এবং আরও মিথ্যা বলার প্রয়োজন হয়। এ এমনই এক বদঅভ্যাস যার মধ্যে মিথ্যা বলার প্রবণতা ঢুকেছে তার আর উপায় নেই। মিথ্যাকথন পরিত্যাগ করা বড়ই কঠিন। মিথ্যুকদের দ্বারা পরিবারে, সমাজে এবং দেশে মহাদুর্যোগ সৃষ্টি হতে পারে। জানবেন, মিথ্যুকের মিথ্যা বলার খপ্পরে পড়ে অনেক নিরীহ মনুষ প্রতারিত হয়েছে, ঠকেছে এবং মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়েছে।

মিথ্যা কথা বলা মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য

কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা’আলা মুনাফিকদের যেসকল বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন এর মধ্যে নিকৃষ্ট বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন মিথ্যা কথনকে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তাদের (মুনাফিকদের) জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। এ কারণে যে, তারা মিথ্যা বলত। মিথ্যা কথনে অভ্যস্ত ছিল।” (২:১০)

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসেও এ বিষয়টির উল্লেখ পাওয়া যায়। হাদিসে উল্লেখ আছে যে, মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি। তার মধ্যে একটি হল যখন সে কথা বলে তখন মিথ্যা বলে। (অর্থাৎ মিথ্যা কথা বলা তার স্বভাব)”

সুতরাং, কুরআনের আয়াত থেকে এবং রাসূলের হাদীস থেকে থেকে স্পষ্ট পাওয়া যাচ্ছে যে, মিথ্যাবাদিতা ও মিথ্যা কথা বলায় অভ্যস্ততা মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য।

মিথ্যা কথা বলা ত্যাগ করা ও সত্যবাদিতা অবলম্বন করা ঈমানের শাখা

হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাযিঃ) বলেন, “তোমরা মিথ্যা থেকে দূরে থাক, কারণ মিথ্যা ঈমানের পরিপন্থী।”

সুতরাং যে মিথ্যা বলে সে পূর্ণ মুমিন নয়।

হযরত সা’দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, “মুমিনের মধ্যে স্বভাবগত বিভিন্ন দোষত্রুটি থাকতে পারে। তবে সে মিথ্যুক ও প্রতারক হতে পারে না।”

সুতরাং, মিথ্যা কথা বলা ইসলামের দৃষ্টিতে অতি গর্হিত একটি কাজ ও এটি অবশ্য-বর্জনীয়।

যেসব ক্ষেত্রে মিথ্যা কথা বলার অনুমতি রয়েছে

তিন ক্ষেত্রে মিথ্যা কথা বলার অনুমতি হাদিসে পাওয়া যায়। সেই তিনটি ক্ষেত্র হল-

এক. যুদ্ধের ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা বৈধ।

দুই. বিবাদমান দুই পক্ষের মাঝে সমঝোতা করার জন্য মিথ্যা বলা বৈধ।

তিন. স্বামী ও স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসা ও মিল-মহব্বত তৈরির করার জন্যও মিথ্যা বলা বৈধ।

মিথ্যার আশ্রয় বর্জনের উপায়

আমাদেরকে মিথ্যা বর্জন করতেই হবে। কিভাবে বর্জন করব সে দিকেও হাদীসে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। আর তা হচ্ছে, সত্য বলার চেষ্টা করা এবং এ সংকল্প করা যে, আমি আর মিথ্যা বলব না, কোনো অবস্থাতেই না। আমি চেষ্টা করব সদা সত্য বলার, সঠিক কথাটি বলার। দেখুন, আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো আর সঠিক কথা বলো।” (৩৩:৭০)

তাহলে আমাকে সবসময় সাবধান হতে হবে, আমি যে কথাটি বলছি, তা সঠিক কি না, ন্যায়সংগত কি না। সঠিক হলে বলব, আর না হয় বলব না। একজন মুমিন যদি এই প্রচেষ্টায় থাকেন, সত্যবাদিতার অন্বেষায় থাকেন আর আল্লাহর কাছে দু’আ করতে থাকেন তাহলে আল্লাহ তা’আলা তাকে অবশ্যই সত্যবাদিতার গুণ দান করবেন। আর যিনি তা লাভ করবেন তিনি এক মহা সম্পদ লাভ করবেন।

আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে মিথ্যার ভয়াবহতা বুঝে মিথ্যা পরিত্যাগ করে সত্যের উপর অবিচল থাকার তৌফীক দান করুন। আমীন।