মিষ্টির যত ভাল-মন্দ- মিষ্টি খাওয়ার নিয়ম

dessert-salamtoday

চিনি, শর্করা বা সুগার যে নামেই মিষ্টান্নজাতীয় খাবারকে ডাকুন না কেন গত কয়েক দশকে বিজ্ঞানী আর ডাক্তারদের ক্রমাগত সতর্কবার্তার ফলে ফলাফল এই দাঁড়িয়েছে যে, মিষ্টি এখন জনস্বাস্থ্যের প্রধান শত্রুতে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, ‘আমাদের খাবার থেকে চিনিকে সম্পূর্ণরূপে বাদ দিতে।”

আমরা সবসময়ই শুনে থাকি যে, যারা বেশি মিষ্টি খায় তাদের ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, এবং ক্যান্সারের ঝুঁকি বেশি থাকে।

কিন্তু এর পাল্টা জবাবও একটা আছে। আসলে এসব স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য শর্করাই যে একমাত্র দায়ী তাও আসলে সঠিক নয়।

মিষ্টি কেন একমাত্র সমস্যা নয়?

গত পাঁচ বছর যাবত একাধিক গবেষণার ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, কোনো একদিনের খাবারে যদি ১৫০ গ্রামের বেশি ফ্রুক্টোজ থাকে, তবে তা উচ্চরক্তচাপ বা কোলেস্টেরলের মতো সমস্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

কিন্তু গবেষকরা আরও বলেছেন যে, এটা তখনই ঘটে যখন উচ্চ ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবারের সাথে আপনি উচ্চমাত্রায় শর্করাসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করবেন। তারা আরও বলছেন যে, শুধু মিষ্টিজাতীয় খাবারের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয় এটা আসলে বলা যায় না।

তাছাড়া, বিজ্ঞানীরা আরও বলছেন যে, কোনো একটি খাবারকে সমস্যার মূল কারণ বলে চিহ্নিত করারও কিছু খারাপ দিক আছে। কারণ, এর ফলে এমনও হতে পারে যে, মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো খাবার খাওয়া হয়তো আপনি বন্ধ করে দিবেন।

মিষ্টিজাতীয় খাবারের সাথে স্থূলতার কী সম্পর্ক আছে

অনেকে মনে করেন, মিষ্টিজাতীয় খাবারের সাথে স্থূলতার সম্পর্ক আছে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, উচ্চ মাত্রার ফ্রুক্টোজ সমৃদ্ধ কর্ন সিরাপ বা বাড়তি মিষ্টি মিশ্রিত পানীয়, জুস ড্রিংক, মধু, বা সাদা চিনি এগেুলো হৃদযন্ত্রের সমস্যা তৈরি করতে পারে। কারণ, তা ধমনীর ভেতর ট্রাইগ্লিসারাইড জাতীয় চর্বি জমাতে ভুমিকা পালন করে।

বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, এই বাড়তি যুক্ত হওয়া মিষ্টান্ন দ্রব্যের সাথে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার সম্পর্ক আছে।

কিন্তু শুধুমাত্র সুগারের কারণেই যে হৃদরোগ ও ডায়াবেটিস হয় এটা স্পষ্ট করে কেউই বলেননি। মূলত, অতিরিক্ত ক্যালরি ডায়াবেটিস, স্থূলতা এবং উচ্চ রক্তচাপের কারণ এবং মিষ্টি সেই উচ্চ ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবারের নিছক একটা অংশ মাত্র।

এমনও দেখা গেছে যে, যারা ক্রীড়াবিদ বা অধিক পরিশ্রম করেন তারা বেশি শর্করা খেলেও শারীরিক পরিশ্রম বেশি করছেন বলে তা হজম হয়ে যায়। এতে শরীরে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে না।

শর্করা কী নেশার মতো?

কিছু গবেষণায় অবশ্য এটাও বলা হয় যে, মিষ্টি খাওয়ার আকর্ষণ অনেকটা কোকেনের আকর্ষণের মতোই। যাকে এককথায় নেশা বলা চলে। কিন্তু এসব গবেষণার বিরুদ্ধে এমন সমালোচনাও হয়েছে যে অনেকে বলেছেন, এখানে উপাত্তকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পূর্বে কিছু জরিপে এরূপ বলা হয়েছে যে, যারা অধিক পরিমাণে কোমলপানীয় বা ফলের জুস পান করেন তাদের স্মৃতিশক্তি দুর্বল ও মস্তিষ্কের গড় আয়তন কম।

কিন্তু বৈজ্ঞানিকরা বর্তমানে এমন বলছেন যে, শর্করার সাথে বিভিন্ন রোগের সম্পর্ক মোটেও সরল নয়। অনেকে এটাও বলেছেন যে, মস্তিষ্কের উপর শুধু শর্করাই প্রভাব ফেলে এটা তারা নিশ্চিত নন। তাছাড়া এমনও হতে পারে যে, যারা অধিক পরিমাণে কোমল পানীয় পান করেন, তারা হয়তো শরীরচর্চা কম করেন। মস্তিষ্কের সাথে তো এটিরও একটা সম্পর্ক থাকতে পারে।

তাহলে মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস কি ভালো?

গবেষকরা বলছেন, যেকোনো মিষ্টিজাতীয় খাবার খেলেই শরীরে ‘সেরিটোনিন’ নামক হরমোন ক্ষরিত হয়। এই হরমোন নিউরোট্রান্সমিটার হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ মিষ্টি খাবার খেলে আপনার মধ্যে একপ্রকার সুখ ও আনন্দের অনুভূতি তৈরি হয়। এই অনুভূতি শরীরের সামগ্রিক

সুস্থতার জন্য অত্যন্ত জরুরি। যখনই আমরা কিছু খাই, তখন সেই খাবারকে হজম করার জন্যে আমাদের শরীরের ভিতরে অ্যাসিড ক্ষরণ শুরু হয়। ঝাল বা তেল-মশলাযুক্ত খাবার খেলে এই অ্যাসিড ক্ষরণের পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়।

অন্যদিকে মিষ্টিজাতীয় খাবার এই এসিড ক্ষরণের পরিমাণটা কিছুটা কমিয়ে দেয়। এর ফলে পরিপাক ক্রিয়া ভালোভাবে সম্পন্ন হতে পারে। এছাড়া বেশি পরিমাণে তৈলাক্ত খাবার খাওয়ার পর শরীরের উচ্চরক্তচাপ অনেকাংশেই কমে যায়। এইসময় মিষ্টিজাতীয় খাবার রক্তচাপকে স্বাভাবিক করতে সাহায্য করে। যা আপনার মাঝে স্বস্তি এনে দেয়।

কিন্তু একইসঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে, মিষ্টিজাতীয় খাবার শরীরে চর্বির পরিমাণ বাড়াতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর। ফলে অধিক পরিমাণে মিষ্টি খাওয়া কখনই ভালো নয়। আপনি যদি ভাবেন বাকি চর্বিযুক্ত খাবার না খেয়ে শুধু বেশি করে মিষ্টি খাবেন সেটাও কিন্তু ভালো আইডিয়া নয়। কারণ মিষ্টি অধিক পরিমাণে খেলে শরীরে মেদ জমবে। যা ভবিষ্যতে একাধিক রোগ নিয়ে হাজির হবে।