মুখরোচক ফালাফেল-এর উৎপত্তি কোথায় জানেন?

মধ্যপ্রাচ্যে একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘স্ট্রিট ফুড’ হল ফালাফেল। সাধারণত যারা মাংস দিয়ে তৈরি কোনও খাবার খেতে পারেন না, তাদের জন্য ফালাফেল একবারে উপযুক্ত একথা নির্দিধায় বলা যায়। ফালাফেল হল ডুবো তেলে ভাজা একধরনের মচমচে, সুস্বাদু ফ্রাইবল। এই ফ্রাইবল তৈরি করতে সাধারণত মাংসের কিমা বা পনির ব্যবহার করা হয় না। মটরশুটি কিংবা ছোলা দিয়েই ফালাফেলের ভিতরের পুরটি তৈরি করা হয়ে থাকে। ফালাফেলের উপরে বিভিন্ন রকমের স্যালাড এবং মশলা-মরিচ ছড়িয়ে চিলি সস বা তিলের সসের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়।

ফালাফেলের উৎপত্তি প্রসঙ্গে বিভিন্ন মত উঠে আসে। অনেকেই মনে করেন এই খাবারের পদটি প্রথম মিশরে চালু হয়েছিল। মিশরীয় খ্রিস্টানদের মধ্যে একটা সময়ে ফালাফেল খুব বেশি পরিমাণে খাওয়ার চল ছিল। পরে অবশ্য বাণিজ্য ব্যবস্থার উন্নতির কারণে আলেকজান্দ্রিয়া বন্দর নগরী থেকে ফালাফেলের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশগুলোতেও। প্রথমদিকে পুর হিসেবে মটরশুটি ব্যবহার করা হলেও, লেভান্ট অঞ্চলে ফালাফেলের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মটরশুটির জায়গায় ছোলা ব্যবহারেরও একটা রন্ধনপ্রণালী তৈরি হয়। স্বাদেরও বেশ কিছু বদল ঘটে যায়, এই সময়েই।

মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষকরে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ফালাফেল খুব কম সময়ের মধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিকেলের মুখোরোচক খাবারের নাস্তা হিসেবে ওই প্রদেশের বাসিন্দারা ফালাফেল খেতে বেশ পছন্দই করতেন। রমজান মাসে রোজার ইফতার পার্টিতে এই পদটি রাখার ব্যবস্থাও চোখে পড়ে। কিন্তু ফালাফেলের প্রকৃত উৎস আরব না ইস্রায়েল তা নিয়ে ঐতিহাসিকেরাও বেশ সন্দিহান। ক্ষেত্রবিশেষে এই খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে তারা উভয় প্রদেশের রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সংযোগ খোঁজার চেষ্টা করেন। আধুনিক সময়ে অবশ্য ফালাফেলকে মিশর, ইস্রায়েল, প্যালেস্টাইনের জাতীয় খাবার হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।

ফালাফেল নামকরণ প্রসঙ্গেও বিভিন্ন মত আমরা পেয়ে থাকি। আরবিতে ফিলফিল মানে হল মরিচ, আর ফালাফেল শব্দটি হল ফিলফিলেরই বহুবচন। এই শব্দটিই আশেপাশের সব এলাকায় ছড়িয়ে গেছে যেমন পারসিয়ান পিলপিল। শব্দটি সংস্কৃত ‘পিপ্পালি’ থেকে এসেছে বলেও অনেকে ভাবেন, যার মানে ‘লম্বা মরিচ’। অথবা সিরীয় ফিলফাল (পূর্বের পিলপাল) যার মানে ‘ছোট গোল বস্তু’ থেকেও আসতে পারে। এভাবেই ফালাফেল শব্দটির উৎপত্তিগত অর্থ দাড়ালো ‘গোলাকার ছোট বল’। একটা মিশরীয়-খৃষ্টীয় উৎপত্তি মতবাদ অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে প্রস্তাবিত হয়েছে যাতে মনে করা হয় ‘ফা লা ফেল’ অর্থ ‘অনেকগুলো মটরশুটি’। যেটাই হোক, আরবি শব্দ ফালাফেল একটা খাবারের নাম হিসেবেই আরও অন্যান্য ভাষায় ঢুকে যায় এবং পৃথিবীব্যাপি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪১ সালে ইংরেজি ভাষায় প্রথম একে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

ফালাফেল উচ্চ মাত্রায় প্রোটিন সমৃদ্ধ। মটরশুটি কিংবা ছোলা, কখনও আবার এই দুটিকে একত্রে মিশ্রিত করেও ফালাফেল তৈরি করা হয়। মটরশুটিতে কোলেস্টেরল থাকে না, ফ্যাট প্রায় থাকে না বললেই চলে। কাজেই শরীরের মেদ বাড়তে দেয় না। এছাড়া মটরশুটি ম্যাগানিজ, ক্যালশিয়াম, জিঙ্ক, আয়রন সমৃদ্ধ যা সহজেই আমাদের দেহে প্রয়োজনীয় খনিজের চাহিদা পূরণ করে। ভিটামিন সি, থায়ামিন, ভিটামিন বি-তে ভরা মটরশুটি আমাদের শরীরের পক্ষে বিশেষ উপকারি। ফালাফেল বানানোও বেশ সহজ। বাড়িতেও সহজে বানিয়ে ফেলা যায় ফালাফেল।

উপকরণ

ছোলা ৪০০ গ্রাম (সারারাত পানিতে ভিজিয়ে ছেকে নেয়া), কাচা মরিচ- ৫/৬টা, পেয়াজ- ১টা, ধনেপাতা/পার্সলে- এক মুঠো, জিরা, ধনে আর মরিচ গুঁড়া- ১ চা চামচ, লবণ- পরিমাণমতো, ময়দা- ২ চা চামচ।

প্রস্তুত প্রণালী

১. ময়দা ছাড়া সবকয়টি উপকরণ প্রথমে ব্লেন্ডারে পেস্ট করে নিতে হবে।

২. তারপর ময়দা মাখিয়ে বলের শেইপ করে ডুবো তেলে ভাজতে হবে।

৩. ভাজা হয়ে গেলে গরম গরম রেড অনিয়ন আর মরিচের সস দিয়ে পরিবেশন করুন।

তথ্যসূত্র- উইকিপিয়া এবং অন্যান্য