মুঘল রাজপুত্র আজম শাহ নির্মিত দুর্গ লালবাগ কেল্লা

lalbagh fort bangladesh
People visit mausoleum of Bibipari in Lalbagh fort in Dhaka, Bangladesh.ID 59839549 © Dmitry Chulov | Dreamstime.com

ঢাকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে একটি অসমাপ্ত মোগল দুর্গই হচ্ছে লালবাগের কেল্লা। এই লালবাগের কেল্লা নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ১৬৭৮ সালে। সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র মুঘল সুবাদার মোহাম্মদ আজম শাহ কর্তিক এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। যিনি পরবর্তীতে নিজেও সম্রাট পদক প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তার উত্তরসূরি মুঘল সুবাদার শায়েস্তা খাঁ ১৬৮০ সালে নির্মাণকাজ আবার পুনরায় শুরু করেন কিন্তু তিনি ও শেষ করতে পারেননি। আসলে সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পত্র মুঘল রাজপুত্র আজম শাহ বাংলার সুবেদার থাকাকালীন ১৬৭৮ সালে নির্মাণ কাজ শুরু করেন। ওই সময় তিনি এই বাংলায় ১৫ মাস ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন দুর্গের তৈরীর কাজ সফলভাবে সমাপ্ত করতে। কিন্তু দুর্গের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই মারাঠা বিদ্রোহ দমনের জন্য তার পিতা সম্রাট আওরঙ্গজেব তাকে দিল্লি থেকে ডেকে পাঠান। ফলে তাঁকে এই দুর্গ নির্মাণ কাজ অসমাপ্ত রেখেই চলে যেতে হয়েছিল। ওই সময় একটি মসজিদ ও দরবার হল নির্মাণের পর দুর্গের কাজ থেমে যায়। শায়েস্তা খাঁ ১৬৮০ সালে পুনরায় বাংলায় সুবেদার হিসেবে ঢাকায় আসেন। তিনি এসে দুর্গের পুনর্নির্মাণের কাজ আবার শুরু করেন। ১৬৮৪ সালে এখানে শায়েস্তা খাঁর কন্যা ইরান দুখত রাহমাত বানুর যাকে আমরা পরিবিবি বলেও জানে তার মৃত্যু ঘটে কন্যার মৃত্যু তাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। কন্যার মৃত্যুর পর শায়েস্তা খাঁ দুর্গটিকে অপয়া মনে করেন এবং ১৬৮৪ খ্রিষ্টাব্দে এই দুর্গের কাজ অসমাপ্ত অবস্থায় এর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন। লালবাগের কেল্লার তিনটি প্রধান স্থাপনার একটি হল পরী বিবির সমাধি। ওই সময় ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে রাজধানী হস্তান্তর করার যে কয়েকটা কারণ ছিল এই কারণটি ছিল তার অন্যতম। রাজকীয় মুঘল আমলের স্থাপত্য দুর্গটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়ে গেল।

একটা সময় মনে করা হয়েছিল যে দুর্গটি হচ্ছে তিনটি ভবন স্থাপনার সমন্বয়। মসজিদ, পরীবিবির সমাধি ও দেওয়ান-ই-আম। এর সাথে রয়েছে দুটি বিশাল তরুণ ও আংশিক ধ্বংসপ্রাপ্ত মজবুত দুর্গের প্রাচীর। বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খনন কাজের মাধ্যমে অন্যান্য বেশকিছু অবকাঠামোর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। দক্ষিণস্থ দুর্গ প্রাচীরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে একটি বিরাট বুরূজ ছিল। দক্ষিণস্থ দুর্গ প্রাচীরের উত্তরে ছিল কয়েকটি ভবন, আস্তাবল, প্রশাসনিক ভবন, এবং পশ্চিম অংশে জলাধার ও ফোয়ারা সহ একটি সুন্দর ছাদ-বাগানের ব্যবস্থা ছিল। আবাসিক অংশটি ছিল দুর্গ প্রাচীরের পশ্চিম-পূর্বে, প্রধানত মসজিদটির দক্ষিণ-পশ্চিমে। দক্ষিণের দুর্গ প্রাচীরে নির্দিষ্ট ব্যবধানে ৫ টি বুরুজ ছিল উচ্চতায় দুই তালার সমান, এবং পশ্চিমের দুর্গ প্রাচীরে ছিল ২ টি বুরুজ যার সবচেয়ে বড়টি ছিল দক্ষিণস্থ প্রধান প্রবেশদ্বারে। বুরুজ গুলোর ছিল একটি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ। কেল্লাটির কেন্দ্রীয় এলাকা দখল করে ছিল তিনটি প্রধান ভবন। পূর্বে দেওয়ান-ই-আম ও হাম্মাম খানা, পশ্চিমে মসজিদটি এবং পরী বিবির সমাধি দুটোর মাঝখানে এক লাইনে, কিন্তু সমান দূরত্বে নয়। নির্দিষ্ট ব্যবধানে কয়েকটি ফোয়ারা সহ একটি পানির নালা তিনটি ভবনকে পূর্ব থেকে পশ্চিমে ও উত্তর থেকে দক্ষিণে সংযুক্ত করেছে।

এই অনন্য লালবাগ কেল্লার তিনটি স্থাপনা অন্যতম একটি হচ্ছে পরী বিবির সমাধি। শায়েস্তা খান তার কন্যার স্মরণে এই সমাধিটি নির্মাণ করেন। বর্তমানে লালবাগের কেল্লার তিনটি বিশাল দরজার মধ্যে যেই দরজা দিয়ে সাধারন জনগন ভেতরে প্রবেশ করতে পারে, সেই দরজা দিয়ে ঢুকলে বরাবর সোজা চোখে পড়ে পরীবিবির সমাধির ছবি। পরি বিবি যার অন্য নাম ইরান দুখত রহমত বানু। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র শাহজাদা মুহাম্মদ আজমের সাথে ১৬৬৮ সালের ৩ মে পরি বিবির বিয়ে হয়। ১৬৮৪ সালে পরী বিবির অকালমৃত্যুর পর তাকে নির্মাণাধীন লালবাগ কেল্লার অভ্যন্তরে সমাহিত করা হয়। স্থাপনাটির অভ্যন্তর ভাগ সাদা মার্বেল পাথর দিয়ে আচ্ছাদিত। ২০.২ মিটার বর্গাকৃতির এই সমাধিটি ১৬৮৮ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে নির্মিত। তবে বিশেষজ্ঞদের অভিমত বর্তমানে এখানে পরি বিবির মরদেহ নেই বলে। সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র শাহজাদা আজম বাংলার সুবাদার থাকাকালীন এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন ১৬৭৮-৭৯ খ্রিষ্টাব্দে। আয়তাকারে (১৯.১৯ মি: × ৯.৮৪ মি) নির্মিত তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি এদেশের প্রচলিত মুঘল মসজিদের একটি আদর্শ উদাহরণ।