মুজিযা বা অলৌকিক ঘটনা কী?

dreamstime_s_126919522
9522 © Ig0rzh | Dreamstime.com

মুজিযা আরবি শব্দ। যাকে বাংলায় অলৌকিক ঘটনা বলা যেতে পারে। কোনো অলৌকিক ঘটনার মধ্যে চারটি বৈশিষ্ট্য থাকলে তা মুজিযা বলে গণ্য হবে। ১। যিনি নিজেকে আল্লাহর নবী বলে দাবি করেন, তার দাবির সত্যতা প্রকাশ উদ্দেশ্য হওয়া, ২। নবুওয়াতের দাবির সাথে সম্পৃক্ত হওয়া, ৩। সাধারণ ও চিরাচরিত নিয়মের ব্যতিক্রম হওয়া, ৪। কল্যাণের প্রতি আহ্বান করা।

মুজিযা দুই প্রকার- ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও যুক্তিগ্রাহ্য

বাহ্যিক ইন্দ্রিয়শক্তি দ্বারা যে মুজিযা উপলব্ধি করা যায় তাকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য মুজিযা বলে। যেমন, মূসা (আঃ) এর লাঠি সাপে রূপান্তরিত হওয়া, তাঁর শ্বেত-শুভ্র হাত ইত্যাদি। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য মুজিযাগুলো সাধারণত সাময়িক এবং অস্থায়ী হয়। পক্ষান্তরে যে মুজিযা বাহ্যিক ইন্দ্রিয়শক্তি দ্বারা উপলব্ধি করা যায় না; বরং যুক্তি ও জ্ঞান দ্বারা অনুধাবন করা যায় তাকে যুক্তিগ্রাহ্য মুজিযা বলে। যেমন, কুরআন। যুক্তিগ্রাহ্য মুজিযা সাধারণত চিরন্তন ও স্থায়ী হয়।

বনী ইসরাঈলের নবীগণের অধিকাংশ মুজিযা ছিল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। কেননা সে যুগের মানুষের মেধা ছিল দুর্বল এবং তাদের সূক্ষ্ম বিষয় উপলব্ধি করার মতো জ্ঞান কম ছিল। আর এ উম্মতের সামনে প্রকাশিত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধিকাংশ  মুজিযা হল যুক্তিগ্রাহ্য। এর কারণ প্রথমত এই যে, এ উম্মতের মেধা ও বোধশক্তি পূর্ববর্তী উম্মতসমূহের তুলনায় প্রবল। দ্বিতীয়ত, এই শরীয়ত কিয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকবে। তাই এ উম্মতের জন্য যুক্তিগ্রাহ্য ও স্থায়ী মুজিযা প্রদান করা হয়েছে, যাতে জ্ঞানবান লোকেরা তা বুঝতে পারে।

হযরত মূসা (আঃ) এর মুজিযা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “হে মূসা! তুমি তোমার লাঠি নিক্ষেপ কর। অতপর সে লাঠিটি নিক্ষেপ করল, তখন দেখা গেল, তা একটি সাপ; দৌড়াচ্ছে। আল্লাহ বললেন, তুমি এটাকে ধর এবং ভয় পেয়ো না, আমি এটাকে অনতিবিলম্বে তার পূর্বরূপে ফিরিয়ে দেব। তোমার হাত বগলে রাখ, তা বের হয়ে আসবে নির্মল উজ্জ্বল রূপে অপর এক নিদর্শনস্বরূপ। এটা এজন্য যে, আমি তোমাকে আমার মহানিদর্শনগুলোর কিছু দেখাব।” (আল কুরআন-২০:১৭-২৩)

এরূপ মুজিযাগুলো সময়ের প্রয়োজন পূর্ণ করে দুনিয়া থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পক্ষান্তরে কুরআন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিরন্তন মুজিযা, যা কিয়ামত পর্যন্ত অব্যহত থাকবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আমিই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং অবশ্য আমিই এর হেফাজতকারী।” (আল কুরআন-১৫:৯)

মুজিযা ও জাদুর মধ্যে পার্থক্য

-জাদুবিদ্যা অর্জনের জন্য কোনো জাদুকরের নিকট থেকে জাদুর শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। জাদু প্রদর্শনে শিষ্য কখনও গুরুর চেয়ে অধিক দক্ষ হতে পারে। পক্ষান্তরে মুজিযা কারও নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে অর্জন করা যায় না। বরং, মুজিযার প্রকাশ ঘটানো সম্পূর্ণ আল্লাহ তা’আলার জিম্মায়, যা তিনি তাঁর মনোনীত নবী-রাসূলের মাধ্যমে প্রকাশ করে থাকেন।

-জাদুর প্রকাশ কারও চাহিদা মোতাবেক হয় না; বরং জাদুকরের বিদ্যা অনুযায়ী হয়। সুতরাং যে কয়টি বিষয় তার রপ্ত আছে, কেবল সেগুলিই সে প্রকাশ করতে পারে। এর বাইরে কোনো কিছু সে প্রকাশ করতে পারে না। পক্ষান্তরে, মুজিযার প্রকাশ আল্লাহর ইচ্ছায় আবদারকারীদের যে কোনো চাহিদা মোতাবেক হতে পারে। কেননা মুজিযা মানুষের সীমিত বিদ্যা বা শক্তির আওতাধীন নয়; বরং মহান আল্লাহর শক্তির অধীন। তিনি আবদারকারীদের যে কোনো আবদার বাস্তবায়ন করতে সক্ষম।

-মুজিযার মাধ্যমে প্রকাশ পাওয়া ফলগুলো প্রকৃত ও বাস্তব। যেমন সামান্য খাবার দ্বারা অনেক মানুষের পেটভরে আহার করা, সামান্য পানি দ্বারা অনেক মানুষের অযু ও পানীয়ের প্রয়োজন পূর্ণ হওয়া। কিন্তু জাদু তার বিপরীত। জাদুর মাধ্যমে প্রকাশ পাওয়া ফলগুলো প্রকৃত ও বাস্তব নয়; বরং জাদু হল দৃষ্টি ও কল্পনার ভ্রম মাত্র, যার প্রকাশ নির্দিষ্ট সময় ও স্থান ব্যতীত কখনই সম্ভব না।

উল্লেখ্য যে, জাদু দুই প্রকারঃ ১। বিস্ময়কর বা সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম কোনো কথা বা কর্মকাণ্ডের প্রকাশ, যা তন্ত্র-মন্ত্র, কুফরী-কালাম বা শয়তান ও জিনের সাহায্যে হয়ে থাকে। এরূপ জাদু শিরক বা কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।

২। এমন কিছু বিস্ময়কর কর্মকাণ্ডের প্রকাশ, যা কিছু অদৃশ্য উপায়-উপকরণের সাহায্যে অথবা বুদ্ধিগত কলাকৌশলের সাহায্যে হয়ে থাকে। এটা সমাজে জাদু নামে পরিচিত হলেও মূলত এর নাম ভেল্কিবাজি, ম্যাজিক ইত্যাদি। এটা শরীয়তের দৃষ্টিতে শিরক বা কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত না হলেও কাজ বা পেশা হিসেবে প্রশংসনীয় নয়। এটা অনর্থক ক্রিয়াকলাপের অন্তর্ভুক্ত, যা বর্জনীয়। এটাকে যদি প্রতারণার অবলম্বনরূপে গ্রহণ করা হয় তবে তা অবশ্যই কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত হবে।