মুমিনের দৃষ্টান্ত বৃক্ষের ন্যায়

আমাদের জীবন পরিবর্তনশীল। এই জীবনের কোনো অভিজ্ঞতাই স্থায়ী নয়; বরং প্রতিটি পরিস্থিতি অস্থায়ী এবং এগুলি প্রায়শই রূপান্তরিত হয়। অনুরূপভাবে আমাদের জীবনের প্রতিটি স্বাচ্ছন্দ্য এবং কষ্টও চিরকাল স্থায়ী হয় না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন,

“তোমরা যদি আহত হয়ে থাক, তবে তারাও তো তেমনি আহত হয়েছে। আর এ দিনগুলোকে আমি মানুষের মধ্যে পালাক্রমে আবর্তন ঘটিয়ে থাকি।” (আল কোরআন-৩:১৪০)

আমরা যদি এই আয়াতে প্রকাশিত গভীর সত্যের দিকে চিন্তা করি তবে আমরা দেখতে পাব যে, এই সত্য অভিজ্ঞতাটির সম্মুখীন আমরা প্রতিনিয়ত হই। আল্লাহ তা’আলার ন্যায়বিচারের সাথে মানবজাতির মধ্যে এই পরিস্থিতিগুলি এমনভাবে পরিবর্তিত হয় যাতে কেউই স্থির সুখের অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারে না; আবার কেউ স্থির কষ্ট বা দুঃখের অভিজ্ঞতাও লাভ করে না।

মুমিনের জন্য, জীবনের এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং তার প্রতি যথাযথ মনোভাব রাখা জরুরী যাতে আমরা প্রতিটি পরিস্থিতি থেকে উপকৃত হতে পারি এবং এগুলির মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

গভীর শিকড়ের লক্ষ্যে

“তুমি কি লক্ষ্য কর না, আল্লাহ তা’আলা কেমন উপমা বর্ণনা করেছেনঃ পবিত্র বাক্য হলো পবিত্র বৃক্ষের মত। তার শিকড় মজবুত এবং শাখা আকাশে উত্থিত।সে পালনকর্তার নির্দেশে অহরহ ফল দান করে। আল্লাহ মানুষের জন্যে দৃষ্টান্ত বর্ণণা করেন-যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।” (আল কোরআন-১৪:২৪-২৫)

হযরত ইবনে উমর (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “গাছের মধ্যে একটি গাছ রয়েছে যা মুসলমানের সদৃশ, এবং তা হল খেজুর গাছ।” (সহীহ বুখারী)

আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে জানিয়েছেন যে, এটি সাধারণ কোনো গাছ নয়; বরং এটি একটি শক্তিশালী, দৃঢ় গাছ, যার শিকড় মাটির গভীরে প্রোথিত। তেমনিভাবে, মুমিনকেও আল্লাহ তা’আলার সাথে দৃঢ় সংযোগ স্থাপনের জন্য, তার ঈমানের শিকড় গভীর ও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কাজ করা দরকার। দৈনিক ৫ ওয়াক্ত সালাত, কোরআন তেলাওয়াত, দ্বীনি চিন্তা-ভাবনা এবং রাসূলের সীরাত অধ্যয়ন এই শিকড়কে দৃঢ় ও শক্তিশালী করার জন্য কিছু দুর্দান্ত উপায়।

এছাড়া যেমন গাছ ক্রমবর্ধমান ও পরিপক্ক হওয়ার জন্য অবিরাম বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন হয়, তেমনি একজন মুমিনের ঈমানের বৃদ্ধি এবং শক্তিশালীতা গড়ে তুলতে তার হৃদয়েরও পানির প্রয়োজন। আর আল্লাহর হুকুম পালন হল হৃদয়ের জন্য পানি সদৃশ।

শেষ পর্যন্ত, এই গাছটি সর্বদা মানুষের উপকার পৌছায়। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেছেন যে, এটি আবহাওয়া বা ঋতু নির্বিশেষে সর্বদা ফল দেয় এবং পরিবেশকে উপকার করে এবং এটি তার পালনকর্তার নির্দেশে এরূপ করে। অনুরূপভাবে যে ঈমানদার তার ঈমান হৃদয়ের গভীরের প্রোথিত হয় এবং ঈমানের বলে সে তার চারপাশের মানুষের জন্য সর্বদা উপকারের উত্স হয়ে যায়। বৃষ্টি বা গর্জন, বাতাস বা ঝড়, গ্রীষ্ম বা শীত – সর্বদা গাছটি নিয়মিত ফল দান করে। এই গুণটির মত মুমিনও সর্বদা মানুষের উপকার করে। তাঁর জীবনে যত কঠিন পরিস্থিতিই আসুক না কেন সে কখনই মানুষকে উপকার করার এই গুণ থেকে নিভৃত হয় না।

কোমল হৃদয়ের অধিকারী

আরেক হাদিসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “মুমিনের দৃষ্টান্ত হল নরম কোমল শস্যের মত, বাতাস যেদিকে দোলা দেয়, শস্যের পাতা সেদিকেই দুলতে থাকে। বাতাস থেমে গেলে স্থির হয়ে যায়। মুমিনও তেমনি বিভিন্ন আপদ-বিপদ দিয়ে তাকে দোলা দেওয়া হয়। আর কাফিরের দৃষ্টান্ত হল দেবদারু গাছের মত, দৃঢ় স্থির (বাতাস তাকে টলাতে পারে না) অবশেষে আল্লাহ যখন ইচ্ছা করেন তাকে মূলোৎপাটন করে দেন।” (সহীহ বুখারী)

অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনে সময়ে সময়ে মুমিনের উপর বিভিন্ন বিপদ-মুসীবত, রোগ-শোক, কষ্ট-ক্লেশ ইত্যাদি এসে থাকে। এগুলোর মাধ্যমেও মুমিন আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রভূত কল্যাণ এবং বিশেষ দয়া ও রহমত লাভ করে থাকে। এতে তার গুনাহ মাফ হয়। আল্লাহর কাছে তার মর্তবা বুলন্দ হয়। আমল-ইবাদতের কমতির ক্ষতিপূরণ হয়। সৌভাগ্যবান বান্দা যারা, তাদের আত্মিক তারবিয়াত হয়।

এরপর আল্লাহই তাদের রোগ-শোক, বিপদ-আপদ সব দূর করে দেন, তাঁর নেয়ামত দ্বারা পরিপূর্ণ করে দেন।

আর কাফিরকে আল্লাহ তাআলা ঢিল দেন। দুনিয়াতে সে অনেক আরাম-আয়েশ, স্বচ্ছন্দতা লাভ করে। আখেরাতে তার জন্য কিছুই নেই। শুধুই যন্ত্রণা আর যন্ত্রণা। অবশেষে যখন আল্লাহ তাকে ধ্বংস করার ইচ্ছা করেন, তখন তাকে যন্ত্রণাদায়ক ভয়ংকর মৃত্যুর মুখোমুখি করেন এবং অনন্তকাল তার জন্য আযাব ও শাস্তির ফয়সালা করেন।

আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে এইসকল গুণাবলি অর্জনের তাওফিক নিসীব করুন। আমীন।