মুরাকাবা – কিভাবে একাগ্রতা আপনার জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে?

ID 92418107 © selim Tanfous | Dreamstime.com

কেমন হত যদি জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে আপনার মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করার মত সহজ কোনো উপায় পাওয়া যেত? তাহলে আপনি অলসতাকে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হতেন বা আপনার ইবাদতে আরও ভালোভাবে মনোনিবেশ করতে পারতেন বা আধ্যাত্মিক ও সাময়িকভাবে আপনার জীবনের সামগ্রিক মানকে উন্নত করতে পারতেন।

আসল কথা হল, নিজেকে নিয়ন্ত্রণে করার কিছু কার্যকরী পন্থা আছে, যা সমসাময়িক বিজ্ঞান এবং ইসলামী চিন্তাধারা উভয়ই সমর্থন করে।

আপনি একাগ্রচিত্তের ধারণা সম্পর্কে হয়ত অবগত আছেন। এটি বর্তমানের মধ্যে নিজের চিন্তাকে আবদ্ধ করে আত্মসচেতনতা বৃদ্ধির একটি মানসিক উপায়।

একটি সরলরেখার কথা ভাবুন। এর এক প্রান্ত আনমনা হওয়ার পরিস্থিতিকে প্রতিনিধিত্ব করেঃ এখানে আপনি নিজের চিন্তাভাবনা এবং আবেগের প্রতিক্রিয়া ক্রোধান্বিত হওয়ার মাধ্যমে প্রকাশ করেন এবং এদেরকে সুযোগ দেন আপনাকে নিয়ন্ত্রণ করার। যদি কোনোকিছু আপনাকে ক্রুদ্ধ করে তোলে তবে আপনি এতে ক্রুদ্ধ হয়ে যান; যদি আপনি অলসতা বোধ করেন তবে কিছু করতে আগ্রহী হন না।

অপরদিকে সরলরেখার অপর প্রান্তে রয়েছে একাগ্রতাঃ এখানে আপনার সেই যোগ্যতার প্রতিফলন ঘটে যা দিয়ে আপনি পছন্দ করতে পারেন যে, আপনার কোন চিন্তা চেতনার অনুসরণ করবেন আর কোনগুলির অনুসরণ করবেন না।

মূলত, আপনাকে নিজের ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যদি কিছু আপনাকে রাগান্বিত করে, তবে আপনি এর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েন না; যদি আপনি অলস বোধ করেন তবে এটিকে দমন করার চেষ্টা করুন।

নানামুখি অধ্যয়ন থেকে জানা যায়, একাগ্রতার অনুশীলন মানসিক চাপ, আবেগপ্রবণতা, হতাশা এবং উদ্বেগ হ্রাস করে। স্মৃতিশক্তি এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের উন্নতি ঘটায় এবং সহানুভূতি বৃদ্ধি করে।

ইসলামের দৃষ্টিতে একাগ্রতা অর্জন

একাগ্রতা অর্জনের অনেকগুলি পন্থা রয়েছে যার মধ্যে মেডিটেশন(ধ্যানে মগ্ন থাকা) অন্যতম। ইসলামের দৃষ্টিতেও অনুরূপ একটি পন্থা রয়েছে যাকে ‘মুরাকাবা’ নামে অভিহিত করা হয়।

মূলতঃ মুরাকাবারত অবস্থায় থাকা মানে শান্তি লাভ করা। এই সত্য উপলব্ধি করা যে, আল্লাহ সর্বদাই বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণভাবে আপনাকে দেখছেন; এবং এর ফলস্বরূপ, আপনার চিন্তা-চেতনা, অনুভূতি সবকিছু আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী পরিচালিত হয়।

ভালোভাবে সম্পাদন করুন, মুরাকাবা দ্বিগুণ ফলাফল দেবেঃ

১- এই দুনিয়াতে আপনি শান্তি ও তৃপ্তিময় অবস্থায় পৌঁছাতে সক্ষম হবেন।

২- আখিরাতে, আপনি জান্নাতে অনন্ত শান্তি ও আনন্দময় অবস্থা অর্জন করতে সক্ষম হবেন।

কিভাবে মুরাকাবার হালত অর্জন করবেন?

মুরাকাবার মাধ্যেমে ইসলামের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভবঃ যেটিকে ইহসান বা আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব বলা হয়।

ইহসান হল এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করা যেন আপনি আল্লাহকে দেখছেন বা কমপক্ষে এটা মনে করা যে, আল্লাহ আপনাকে দেখছেন। এই চিন্তাগুলি স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মাঝে আত্ম-সচেতনতা সৃষ্টি করে।

কীভাবে আমরা একাগ্রতা অর্জন করতে পারি?

এজন্য, আমাদের বুঝতে হবে যে কীভাবে এটির অনুশীলন করা যায়।

মেডিটেশন বা মুরাকাবা হল একাগ্রতা অর্জনের একটি অনুশীলন।

প্রখ্যাত শাইখ আবদুল কাদির জিলানির মতে মুরাকাবা ৪টি উপায়ে অনুশীলন করা যায়ঃ

১- সর্বশক্তিমান সম্পর্কে জানা বা সচেতন হওয়া।

২- শত্রু ইবলিস বা শয়তান সম্পর্কে সচেতন হওয়া।

৩- নিজের আত্মার মন্দ কাজে প্ররোচনা দেওয়ার ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া।

৪- আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যেকোনো কাজ করা সম্পর্কে সচেতন হওয়া।

ইসলামিক মেডিটেশন

ধর্মনিরপেক্ষ মেডিটেশনের উদ্দেশ্য হল নিজের মন সম্পর্কে সচেতন হয়ে মানসিক শক্তি ও মঙ্গল অর্জন করা। অন্য কথায়, মুরাকাবা অনুশীলনের ৩ নম্বরটির মতই।

অপরদিকে ইসলামী মেডিটেশনের উদ্দেশ্য হল মুরাকাবার চারটি দিক সম্পর্কে সচেতন হয়ে মানসিক ও আধ্যাত্মিক উভয় প্রকার শক্তি ও মঙ্গল অর্জন করা।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত কিছু সময় আল্লাহর স্মরণে নির্জনতায় কাটাতেন এবং নীরবতা পালন করতেন যাতে তাঁর মন প্রশান্তি অনুভব করে।

আমাদের সালাফরাও (নেককার পূর্বসূরীরা) তাদের ইবাদত, প্রার্থনা ও যিকিরকে প্রাণবন্ত করার জন্য নিয়মিত কিছু সময় আল্লাহর স্মরণে নির্জনতায় কাটাতেন এবং মুরাকাবা করতেন।

উদাহরণস্বরূপ ইমাম ইবনুল কায়্যিম এর কথা বলা যায়, যিনি সাত ধরনের মেডিটেশন(ধ্যান) সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন। ইমাম গাজ্জালী একাগ্রতা অর্জনের জন্য সহায়ক হিসেবে দৈনিক চারটি অভ্যাস অনুশীলন করতে বলেছেন। সেগুলো হল দু’আ, যিকির(আল্লাহর স্মরণ), কুরআন তেলাওয়াত এবং গভীর চিন্তা-ফিকির।

মোদ্দাকথা হল, ভারসাম্যপূর্ণ আধ্যাত্মিক জীবন সম্পূর্ণরুপে অর্জন করার জন্য বিভিন্ন ইবাদত এবং ধ্যানের উপর নির্ভর করতে হয়।