মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় হিজরত কেন করতে হল?

আফ্রিকা ২৪ ডিসে. ২০২০ Tamalika Basu

ইসলামের ইতিহাসে মুসলমানদের মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের ঘটনা এতটা প্রসিদ্ধ যে, এই হিজরতের ঘটনা জানে না এমন কাউকে খুজে পাওয়া হয়ত মুশকিল হবে। কিন্তু এই বিশাল হিজরতের পূর্বে নবুওয়াতের ৫ম বর্ষে মুসলমানরা যে দুইবার আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন তা হয়ত অনেকেরই অজানা। তাই আজকের নিবন্ধে মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় হিজরত সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করা হল।

হিজরত কেন করতে হল?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবীদের উপর অন্যায়-অত্যাচারের বিভীষিকাময় ধারা-প্রক্রিয়া শুরু হয় নবুওয়াতের চতুর্থ বর্ষের শেষের দিক থেকে। জুলুম-নির্যাতনের মাত্রা শুরুতে সামান্যই ছিল। কিন্তু দিন যত অতিবাহিত হতে লাগলো জুলুম-নির্যাতনের মাত্রা ততই বৃদ্ধি পেতে পেতে লাগল। শেষ পর্যন্ত অবস্থা এমন হলো যে, মক্কায় মুসলমানদের টিকে থাকাটাই একরকম অসম্ভব হয়ে উঠলো। তাই এ বিভীষিকাময় অত্যাচারের কবল থেকে পরিত্রাণ লাভের জন্য তাঁরা বাধ্য হলেন অন্য পথের সন্ধান করতে।

অনিশ্চয়তা এবং দুঃখ-দুর্দশার এ ঘোর অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থার মধ্যে আল্লাহ তা’আলা অবতীর্ণ করলেন, ‘আল্লাহর জমিন অপ্রশস্ত নয়।’ এই আয়াতে মূলত হিজরতের ইঙ্গিত প্রদান করা হয়েছে।

হিজরতের স্থান হিসেবে আবিসিনিয়ায় বেছে নেওয়ার কারণ

এই আয়াত অবতীর্ণের পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবীদের জন্য দেশান্তরের কথা চিন্তা করতে লাগলেন। তিনি বহু পূর্ব থেকেই আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাশির উদারতা এবং ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে শুনে আসছিলেন। অধিকন্তু, সেখানে যে কারো প্রতি কোনো অন্যায়-অত্যাচার বা অবিচার করা হয় না, সে কথাও তিনি শুনেছিলেন। মুসলিমগণ যদি সেখানে গমন করে তাহলে সেখানে নিরাপদে থাকার এবং নির্বিঘ্নে ইসলাম পালনের সুযোগ লাভ করবে এই বিশ্বাস নবীজীর ছিল। এসব কিছু বিবেচনা করে তাঁদের জীবন ও ঈমানের নিরাপত্তাবিধান এবং নির্বিঘ্নে ইসলাম পালনের সুযোগ লাভের উদ্দেশ্যে আল্লাহর হুকুমে হিজরত করে আবিসিনিয়ায় গমনের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীগণকে নির্দেশ প্রদান করলেন।

কঠিন পরিস্থিতির মুখে হিজরতের সূচনা

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ পেয়ে মুসলমানগণ ব্যাপকভাবে হিজরতের প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। কিন্তু এ হিজরত ছিল খুবই কঠিন। কেননা, এর আগেও একবার মুসলিমগণ হিজরতের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সামান্য অসতর্কতার দরুণ সে সময় তাঁদের সে যাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়। এখন কাফেররা অতন্দ্র প্রহরীর মতো আরও সচেতন এবং যে কোনো মূল্যে এ ধরনের প্রচেষ্টা প্রতিহত করার ব্যাপারে তারা ছিল বদ্ধপরিকর।

কিন্তু আকাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য সাধনে সাফল্য লাভের ব্যাপারে কুরাইশগণের তুলনায় মুসলমানদের সচেতনতা ও ঐকান্তিকতার মাত্রা ছিলো অনেকগুণ বেশি। উপরন্তু নির্দোষ এবং ন্যায়নিষ্ঠ মুসলমানদের প্রতি ছিলো আল্লাহ তা’আলার বিশেষ অনুগ্রহ। যার ফলে কুরাইশগণের পক্ষ থেকে কোনো রকমের অনিষ্ট কিংবা প্রতিবন্ধকতা আসার পূর্বেই তাঁরা নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে গিয়ে পৌঁছলেন আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাশির দরবারে।

এই হিজরতে সর্বমোট ৮২ কিংবা ৮৩ জন পুরুষ অংশ নিয়েছিলেন এবং ১৮ কিংবা ১৯ জন মহিলা ঐ দলে ছিলেন। নাজ্জাশীর দরবারে পৌছে তারা হিজরতের কারণ তাঁর সামনে তুলে ধরলে বাদশাহ তাদেরকে মঞ্জুর করলেন। তাদেরকে নির্বিধ্নে সেখানে থাকার এবং দ্বীন পালনের আশ্বাস দিলেন।

এই হিজরতের পরেই আল্লাহ তা’আলা নাযিল করলেন,

“যারা নির্যাতিত হওযার পর আল্লাহর হুকুমে গৃহ ত্যাগ করেছে, আমি অবশ্যই তাদেরকে দুনিয়াতে উত্তম আবাস দেব এবং পরকালের পুরস্কার তো সর্বাধিক।” (আল কুরআন-১৬:৪১)

আবিসিনিয়ায় মুসলমানদের নির্বিঘ্নে দিন যাপন

এদিকে মুসলমানরা পালিয়ে গেছেন দেখে মক্কার কাফেররা খুবই ক্রোধান্বিত হল। হিজরতকারীদের ধরে আনার জন্য তারা তৎক্ষণাৎ একদল লোক জেদ্দা বন্দরের দিকে পাঠিয়ে দিল। কিন্তু তারা কাউকে না পেয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল।

কুরাইশরা পরামর্শ সভা আহবান করল। এই সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে মুসলমাদেরকে আবিসিনিয়া থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য আব্দুল্লাহ ইবনে আবু রাবি’আ ও আমর ইবনে আ’সের সমন্বয়ে এক প্রতিনিধি দল বিভিন্ন উপঢৌকনসহ আবিসিনিয়ায় প্রেরিত হল।

তারা বাদশাহ নাজ্জাশীর দরবারে উপস্থিত হয়ে প্রত্যেক সভাসদকে উপঢৌকন প্রদান করে বাদশাহকে মুসলমানদের ব্যাপারে ক্ষেপিয়ে তুলতে চাইল। কিন্তু নাজ্জাশী তাঁর দূরদর্শিতার কারণে এই ছল-চাতুরি বুঝে ফেললেন। মুসলমানদের মধ্য থেকে সকলকে উপস্থিত করে তিনি কুরাইশদের অভিযোগ তাদের সামনে তুলে ধরলেন। রাসূলের আপন চাচাত ভাই জাফর ইবনে আবু তালেব(রাযিঃ) এর বিচক্ষণতা পূর্ণ বক্তব্যে বাদশাহ অভিভূত হলেন। এরপর তিনি কুরাইশদের দাবী বাদশাহ প্রত্যাখ্যান করলেন এবং প্রতিনিধি দলের শেষ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তারা বিভ্রান্ত হয়ে মক্কায় ফিরে এল।

এভাবেই আবিসিনিয়ায় মুসলমানদের নির্বিঘ্নে দিন যাপন আরও ত্বারান্বিত হল এবং মুসলমানরা বাদশাহর শুকরিয়া আদায় করে সেখানে অবস্থান করতে লাগল।