মুসলমানদের কতটা প্রভাব ছিল পর্তুগালে?

pena palace portugal
Pena Palace in Sintra - Portugal - ID 80529690 © Nikolai Sorokin | Dreamstime.com

বলা হয়, আপনি উজ্জ্বল চাঁদনি রাতে আপনি সেররা ডি সিন্ট্রার সবুজে মোড়া পাহাড়ে ঘুরে বেড়ান, তবে সম্ভাবনা রয়েছে যে আপনি সাদা পোশাকে পরা কোনো মুরিশ সুন্দরীর(Moorish maiden) সাক্ষাৎ পাবেন। তাঁর হাতে থাকবে একটি পাত্র। সেই পাত্র নিয়ে তিনি চলে যাবেন কাছের ঝর্ণায়। সেই জল দিয়ে তিনি ওই পাত্র পূর্ণ করবেন। তিনি আপনার সাথে কথা বলবে না বা আপনার দিকে তাকাবেনও না। তবে তিনি যখন আপনাকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যাবেন তখন মনোযোগ দিয়ে শুনুন, মনে হবে যেন পৃথিবী, গাছ এবং বাতাস সবাই একসাথে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে,কারণ সেই মুহূর্তটি অতীতের গহ্বরে চলে গেল এবং আর কখনও তা ফিরে আসবে না।

৭১৪ খ্রিস্টাব্দে উত্তর আফ্রিকা আইবেরিয়ান উপদ্বীপে দখল করে নিলে, মুসলমানরা প্রথম আল-গারব আল-আন্দালুসে (যা বর্তমানে আধুনিক পর্তুগালের অন্তর্গত) পদার্পণ করে। প্রায় ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখানে বসবাস করার ফলে মুসলিমদের প্রভাবে স্থানীয় বাসিন্দাদের কৃষিকাজ, খাওয়া, কথা বলা, পোষাক এমনকী আচার-আচরণের পরিবর্তন হয়েছিল। মুসলিমরা এই অঞ্চল ত্যাগ করে ১১৪৭ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ, কিন্তু এখনও সেই আমলের কথা পর্তুগীজরা ভুলে যাননি। কয়েক শতক পেরিয়ে গেলেও স্থানীয়রা এখনও বিশ্বাস করেন, রহস্যময়ী মুরিশ সুন্দরী মাঝে মধ্যেই এখানে আবির্ভূত হন।

মুসলিম আমলে, প্রতিবেশী আল-আন্দালুস (স্পেন) এর মতো আল-গারব আল-আন্দালুসও যথেষ্ট সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। উদ্ভাবনী কৃষিপদ্ধতি চালু হয়েছিল, নতুন ধরনের বিদেশী খাবার এবং মশলা তখন ঘরে ঘরে ব্যবহৃত হত, আল-ইশবুন (লিসবন) -এর মতো শহরে বড় বড় শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল; সঙ্গীত এবং কবিতার ব্যাপক প্রসার হয়েছিল এবং সেখানে ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলমানরা পাশাপাশি মিলে-মিশে শান্তিতে বসবাস করত। অনেকেই হয়তো জানেন না, যে আলফোনসো হেনরিক্স আল-গারব আল-আন্দালুস দখল করার পরে তাকে পর্তুগালের খ্রিস্টান রাজত্ব হিসেবে ঘোষণা করার বহু বছর পরেও, স্থানীয় বাসিন্দারা মুসলিম শাসনকেই ওই এলাকার স্বর্ণযুগ বলে মনে করতেন। দেশের রাজধানী লিসবনের উত্তর-পশ্চিমে ৩০ কিলোমিটার দূরে, সিন্ট্রার সুন্দর সবুজ পাহাড়কে বর্তমানে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ পার্কের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। 

আল-ইশবুন শহরকে সুরক্ষিত রাখার কৌশল হিসেবে, দশম শতাব্দীতে সিন্ট্রার মুরিশ দুর্গটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এটি পর্তুগালের বা বলা যায় গোটা ইউরোপের মধ্যে, সবচেয়ে ভালো ভাবে সংরক্ষিত মুসলিম দুর্গ। কেবলমাত্র বাইরের প্রাচীরটি এখনও টিকে আছে এবং এর পুরানো রয়্যাল টাওয়ার থেকে প্রাসাদের অভ্যন্তর ভাগ পর্যন্ত – পুরো রাস্তাটি হেঁটে যাওয়ার সময় আপনি অবাক হয়ে দেখবেন জাতীয় উদ্যানের পাদদেশের সৌন্দর্য এবং মাঝপথে থাকা অন্যান্য স্থাপত্যশৈলী। পুরো রাস্তাটি এগারোটি পতাকা দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে দশটির মাধ্যমে দ্বাদশ শতাব্দীর সাধারণ নীল এবং সাদা ক্রস থেকে বর্তমান আধুনিক সংস্করণ পর্যন্ত পুরো বিবর্তন খুব সুন্দর ভাবে বোঝা যায়। 

রাজধানীর নিকটবর্তী সিন্ট্রা শহর তার শীতল জলবায়ু এবং পাহাড়ি সৌন্দর্যের জন্য সহ সর্বদা লিসবনের শাসকগোষ্ঠীর অত্যন্ত প্রিয় ছিল, তারা মুসলমান শাসক হোক বা খ্রিস্টান। শহরের বাইরে মুসলিম শাসকরা বিনোদনের জন্য যে প্রাসাদগুলি নির্মাণ করেছিলেন, সেগুলি এখন আর নেই। পরিবর্তে রয়েছে তাদের অবশিষ্টাংশের উপরে খ্রিস্টান অভিজাত ও রাজবংশের নিদর্শন। তবে তাঁদের মধ্যে অধিকাংশের এই অঞ্চলের মুসলিম ঐতিহ্যের জন্য কিছু দুর্বলতা ছিল। ফলস্বরূপ, সিন্ট্রার মুরিশ যুগ-পরবর্তী প্রাসাদগুলি দেখলেও দর্শকরা সেখানে সপ্তদশ ও অষ্টদশ শতকের রোমান্টিক মুরিশ শিল্পকীর্তির পুনর্ভাবনার ছায়া দেখতে পাবেন। তার আদর্শ উদাহরণ হল পেনা প্রাসাদ। এটি পর্তুগালের সিন্ট্রা শহরের সাও পেদ্রো ডি পেনাফেরিমে অবস্থিত। 

পেনা প্রাসাদ হল রাজা ডন (ডোম) দ্বিতীয় ফার্নান্দো-র কল্পনা, যিনি ১৮৩৮ সালে তৎকালীন উপেক্ষিত এই মঠটি কিনেছিলেন ও তার সংস্কার করে তাকে নবরূপ দিয়েছিলেন। তিনি স্থপতিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যেন উনবিংশ শতকের ইউরোপীয় শৈলীর সাথে বিশ্ব মুসলিম শৈলীর মিশ্রণ ঘটানোর জন্য। এই স্থাপনায় অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে নব্য ইসলামী, নব্য গোথিক, নব্য ম্যানুলাইন এবং নব্য রেনেসাঁ কারুকাজের সমাবেশ। প্রায় পুরো প্রাসাদটি পাথরের ওপর অবস্থিত। গঠনগত দিক থেকে প্রাসাদটিতে চারটি অংশ রয়েছে। রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে নয়নাভিরাম এ প্রাসাদটি রাজধানী লিসবন এবং শহরের অন্যান্য স্থান থেকে সহজেই দেখা যায়। এটি একটি জাতীয় স্থাপনা এবং এর মাধ্যমে ১৯ শতকের রোমান্টিসিজমের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।

পেনা প্রাসাদটি ডন ফার্নান্দোর উৎসাহের ফলে নির্মীত হলেও, এটি হল সমস্ত মুরিশ বস্তুর প্রতি পর্তুগীজদের ঐতিহাসিক দুর্বলতার সুস্পষ্ট প্রমাণ। তার অন্যতম কারণ হিসেবে বলা যায় এই স্থাপত্যে ফেজ, রিয়াদ, বা আল কারওয়াইন এর ছাপ বেশিমাত্রায় লক্ষণীয়।

অবস্থান: সিন্ট্রা ন্যাশনাল পার্কের অবস্থান হল পর্তুগালের রাজধানী শহর লিসবনের ঠিক উত্তর-পশ্চিমে।

কীভাবে যাবেন: প্রথমে ফ্লাইট ধরে পৌঁছে যান লিসবনে এবং তারপরে লিসবনের রসো মেট্রো স্টেশন থেকে শহরতলির লাইনটি ধরুন যা গিয়ে সিন্ট্রাতে শেষ হবে।

কিছু টিপস: যদিও সিন্ট্রা জাতীয় উদ্যানটি পায়ে হেঁটে ঘোরার জন্য খুবই সুন্দর জায়গা, কিন্তু এর  পাহাড়ী ভূপ্রকৃতিতে বেশি হাঁটাহাঁটি করলে পরদিন পায়ে ব্যথা হতে বাধ্য। তাই স্থানীয় হপ-অন-হপ-অফ ট্যুরিস্ট বাসের একদিনের টিকিট কেটে নিন, যাতে চেপে পাহাড়ের পাদদেশে শহর থেকে পুরো চক্রাকার পথে আপনি পুরো এলাকাই ভালো ভাবে ঘুরে দেখতে পাবেন।