মতামত ১৭-জানু.-২০২০

মুসলমানদের প্রতি পাশ্চাত্যের ‘আমরা-ওরা’, এই বিভাজনের শেষ কোথায়?

صورة ملف شخصي
Zeeshan R

সুচিন্তিত বিবেচনার মাধ্যমে ভিন্ন চিন্তাধারাকে সহনীয় পর্যায়ে স্থান দেয়ার নাম পরমতসহিষ্ণুতা। রাষ্ট্রের সব শ্রেণী, পেশা, দলমত ও সব ধর্মের অনুসারীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা প্রদর্শনও এর অন্তর্ভুক্ত। এটি গণতন্ত্রের অন্যতম নিয়ামকও। কোনো সমাজে ভিন্নমতের অনুশীলন ও চর্চা না হলে সে সমাজকে সভ্য ও গণতান্ত্রিক বলার সুযোগ থাকে না। যে সমাজে ভিন্নমতের কদর নেই, সেখানে গণতন্ত্রও নেই। দার্শনিক ভলতেয়ায়ের ভাষায়, ‘আমি তোমার সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারি, কিন্তু তোমার মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষার জন্য আমি জীবন দিতেও কুণ্ঠিত নই।’ মূলত এটিই গণতন্ত্র ও সভ্যতার মানদণ্ড।

বিভিন্ন সংস্কৃতির একসঙ্গে পথ চলা, পাশাপাশি বেড়ে ওঠা, বিশ্ব দরবারে নির্দিষ্ট দেশ বা সভ্যতাকে মহান করে তোলে। কিন্তু পুব আর পশ্চিমের মেলবন্ধন ইতিহাসেও ঘটেনি, সুদূর ভবিষ্যতেও তার নিশ্চয়তা দেখিনা।

পশ্চিমা দেশগুলোর রাজনীতিক ও পণ্ডিত এবং জিহাদিদের মধ্যে অভিন্ন কিছু বিষয় রয়েছে। তারা উভয়েই পশ্চিমা ও মুসলিম বিশ্বের মধ্যকার সংঘাতকে ‘ক্লাশ অব সিভিলাইজেশন’ বা সভ্যতার সংঘাত মহাথিসিসের আয়নায় দেখে থাকেন। কেউ কেউ একে চিরন্তন যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করেন।  এ দৃষ্টিভঙ্গি মহাভুল। এ দৃষ্টিভঙ্গি নিবিড় বিশ্লেষণের দাবি করা একটি জটিল সমস্যাকে অনেক বেশি সরলীকরণ করে ফেলে।

৯/১১-এর পর থেকে উগ্র ইসলামী সন্ত্রাসবাদ হয়ে পড়েছে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী হেডলাইন। সন্ত্রাসীদের নৃশংসতা ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি বৈরিতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছে। কিন্তু আমরা ভুলভাবে ইসলামকে একশীলা স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করছি। এ বিবেচনার মধ্যে যে বিষয়টি হারিয়ে গেছে তা হল বেশিরভাগ মুসলিম দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও বেকারত্বের সঙ্গে লড়াই করছে। পশ্চিমা ‘জীবনযাপন’ ধ্বংস করার আকাঙ্ক্ষার কথা দূরে থাক, পশ্চিমা পদ্ধতির ‘জীবনযাপনে’র আশাই তো তারা তেমন করতে পারে না। অন্য সবার মতো মুসলমানরা প্রত্যাশা করেন এমন একটি ন্যায়সঙ্গত সমাজের অংশীদার হওয়ার, যাতে থাকবে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও সুশাসন।

আমরা জানি, পশ্চিমারা মুসলিম বিশ্বের সাংবিধান তত্ত্ব, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ে ঐতিহাসিকভাবে বক্তব্য দিয়ে গেছে। পশ্চিমাবিরোধী বলে বিবেচিত শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে নির্বাচনী রায় ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য তারা সহায়তা করে গেছে।

যদিও তারা ভণ্ডামিপূর্ণভাবে গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলে গেছে, প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমা বিশ্ব কিন্তু কেবল একনায়কদের সঙ্গে কাজ করাকেই প্রাধান্য দিয়ে গেছে (শাহ, জেনারেল জিয়াউল হক, জেনারেল আল-সিসিকে প্রাধান্য দিয়েছে মোসাদ্দেক, ভুট্টো ও মুরসির বিপরীতে)। বলতে কঠিন শোনালেও যখন আইএসের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তখন পশ্চিমে সাদ্দাম, গাদ্দাফি ও আসাদের জন্য নস্টালজিয়ায় ভোগে অনেকেই. তাদের প্রায় সবাইকে ধ্বংস করে দেয়ার পরও!

একনায়ক ও স্বৈরশাসকদের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থন মুসলিম বিশ্বের অনেক অংশে রাজনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ‘গণতন্ত্র ইসলামের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়’- এ বিতর্কের ন্যায্যতা প্রতিপাদন করা কঠিন, যদি পরিস্থিতি একে সমর্থন না করে। আত্মসেবার এ নীতির পরিণতি হল, এতে করে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো তাদের রক্তপিপাসু আদর্শ ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগ পায়।

ধর্ম ও সংস্কৃতিগুলোর মধ্যকার সংঘাত পশ্চিমা ও মুসলিম বিশ্বের বিশেষ স্বার্থান্বেষী গ্রুপগুলোকে সমানভাবে উপকৃত করে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে সামরিক শিল্পের জটিল ক্ষমতাশীল পক্ষ এবং জনতুষ্টিবাদী রাজনীতিকরা। এ গ্রুপটিকে ৯/১১-এর ফলাফল ও সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের মূল বিজয়ী হিসেবে বিবেচনা করি আমি। পশ্চিমা ক্ষমতাশীল এলিট এবং তাদের কৃপাপ্রাপ্ত আরব বিশ্বের একনায়কদের জন্য ‘উগ্র ইসলামী সন্ত্রাসবাদ’ কেবল একটি সাইড শো। এ স্বার্থান্বেষী মহলের মূল ফোকাস হচ্ছে আকর্ষণীয় অস্ত্র বিক্রি ও তেল ক্রয়। মূল তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা হাতেগোনা কয়েকজনের মধ্যে সীমিত থাকে- এটি তাদের সহায়তা করে। এ সীমিত লোকজনের মধ্যে আছে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েতের রাজ পরিবারের ২৩ হাজার সদস্য; যাদের সম্পদের অস্বাভাবিক আকার হচ্ছে ২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার।

পশ্চিমা বিশ্বের লক্ষ্য হচ্ছে এই একনায়ক-স্বৈরশাসকদের অভ্যন্তরীণ ও বহির্হুমকি থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য তাদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করা। বিনিময়ে একনায়করা তেলের জগতে পশ্চিমাদের প্রবেশাধিকার নিষ্কণ্টক রাখে। মুসলিম বিশ্ব ত্রুটিমুক্ত নয়। আত্মসমালোচনা পরিহার করার মধ্য দিয়ে মুসলমানরা ইসলামী বিশ্বের গভীর অস্থিরতা লুকিয়ে রাখে। ইসলামের ঘটনাবহুল ইতিহাসের প্রথম চারশ’ বছর পর যুক্তিবাদীদের কাছে পরাজয়ের পর থেকে ইসলামে বুদ্ধিভিত্তিক ক্রমাবনতি ঘটেছে।

মুসলমানরা পিছিয়ে পড়েছে, কারণ ইসলামী সমাজগুলোতে মুক্ত অনুসন্ধানকে নিরুৎসাহিত করা হয়। বর্তমানে স্পর্শকাতর এ বিষয়টি নিয়ে একটি পরিশীলিত বিতর্ক মুসলিমদের কাছ থেকে মুখোমুখি অবস্থানের প্রতিক্রিয়া নিয়ে আসে। ইসলাম একটি শান্তিপূর্ণ ধর্ম- এ লাইনের সঙ্গে একাত্ম থাকতেই মুসলমানরা অনেক বেশি স্বস্তি অনুভব করে। তারা অনুভব করে যে, সামান্য কিছু সন্ত্রাসী ইসলামের বদনাম করেছে, যা অন্যায্যভাবে পশ্চিমা বিশ্বে বৃহদাকারে ইসলামভীতি ছড়ানোর সুযোগ করে দেয়। একইভাবে মুসলিম বিশ্বেও পশ্চিমাবিরোধী অনুভূতি লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে।

আরও বেশি গভীর রাজনৈতিক স্তরে ভিন্নমত ও ভিন্নধর্মী আইডিয়ার প্রতি অসহিষ্ণুতা রয়েছে। সেক্যুলার গণতন্ত্র অনেক মুসলমানের কাছে একটি ঘৃণিত বিষয়, যারা ইসলামকে একটি সম্পূর্ণ জীবন বিধানের বাইরে ভাবতে পারেন না। অনেকে একটি নতুন ধরনের ধারণা পোষণ করে যে, ধর্ম হচ্ছে ব্যক্তি ও সৃষ্টিকর্তার মধ্যকার একটি ব্যক্তিগত বিষয়। ইসলামেও রাজনীতি ও ধর্মকে আলাদা করার কোনো ঐতিহ্য নেই। বাকি বিশ্ব ধর্ম ও চার্চকে আলাদা করার মূলনীতি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ধর্মীয় বহুত্ববাদ ও নাগরিক সমাজকে আঁকড়ে ধরাকে মেরিট হিসেবে দেখছে। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে তীব্র বৈপরীত্যে মুসলিম বিশ্বে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ রয়ে গেছে স্বৈরশাসক, ধর্মতন্ত্র বা সামরিক বাহিনীর হাতে। আধুনিক রাজনৈতিক সংজ্ঞায় এটি একটি মারাত্মক সমস্যা এবং পশ্চিমা সভ্যতার সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণ। যেহেতু পশ্চিমা ও মুসলিম সম্পর্কের মধ্যে একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আমরা দেখছি, সেহেতু সব পক্ষে সংশোধনের একটি উদ্যোগ যতক্ষণ না আসবে, ততক্ষণ আমরা অব্যাহতভাবে নৈরাজ্য ও ধ্বংস দেখতে পাব। কর্তৃত্ববাদকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান এবং গণতন্ত্রের প্রতি সর্বোচ্চ সমর্থন অপরিহার্য। যতক্ষণ পর্যন্ত সন্ত্রাসবাদ কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত মুসলমানদের নেতিবাচক ধারণা পরিবর্তন করা কঠিন।

প্রাসঙ্গিক নিবন্ধসমূহ
মতামত
মতামত ২৮-আগস্ট-২০২০
Zeeshan R

সর্বপ্রথম যে মুসলিম দেশ থেকে মুসলমানরা ব্রিটেনে গিয়েছিল সে দেশটি হলো ইয়েমেন। সে সময় ইয়েমেনিরা ব্রিটিশদের বাণিজ্য জাহাজে নাবিক হিসেবে কাজ করতো। সেই সুবাদেই তারা ব্রিটেনে গিয়ে বসবাস করতে শুরু করেছিল। ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে তারা ব্রিটেনে সর্বপ্রথম মসজিদ তৈরি করেছিল।

চলবে চলবে
মতামত
মতামত ২৩-জুলাই-২০২০
Zeeshan R

কুরআন শরীফকে যদি এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, তাহলে তা ছোটদের বোঝাতে অনেক বেশি সুবিধা হবে বলেই মনে হয়। ছোটবেলা থেকে ধর্ম সম্পর্কে সঠিক এবং সুশিক্ষা তাদের বড় হয়ে সাচ্চা মুসলিম হতে সাহায্য করবে

চলবে চলবে
মতামত
মতামত ১৭-জুন-২০২০
Muhammad Nassar
Zeeshan R

আশ্রয় প্রার্থনায় শরণার্থী হওয়া বা আরও সমৃদ্ধ ভূমির সন্ধানে অভিবাসী হওয়ার পরিবর্তে, অভিবাসনের সন্ধানকারী মুসলমানদেরকে সমগ্র ইউরোপে অস্বীকার করার জন্য বলা হয়েছে

চলবে চলবে
মতামত
মতামত ১৭-জানু.-২০২০
Zeeshan R

অধ্যাপক লুডউইগ গুমপ্লায়িজ বলেন, ‘ইবনে খালদুন কোন পরিবারের উত্থান-পতন সম্পর্কে `তিন বংশ স্তরের` যে ধারণা দেন তা এখন অটোকার লরেঞ্জের কৃতিত্বের ভান্ডারে। অথচ লরেঞ্জের অনেক আগেই আরব দার্শনিক এই তত্ত্ব প্রচার করেছিলেন। বিস্ময়কর ব্যাপার ইবনে খালদুন সমর বিজ্ঞানের যেসব রীতি পদ্ধতি আলোচনা করেছিলেন ইউরোপীয়দের উত্থানের পুরো যুগে তাদের সেনাপতিরা সেসব রণকৌশল প্রয়োগ করেছেন। এছাড়া ম্যাকিয়াভেলি শাসকদের যেসব উপদেশ দিয়েছিলেন শতবর্ষ আগে ইবনে খালদুনও তা-ই লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন। অথচ তা কেউ জানত না।

চলবে চলবে