মুসলমানদের শিক্ষিত হতে হবে, বলে গিয়েছেন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)

dreamstime_s_3202641

ইসলাম এমন একটি ধর্ম যা শিক্ষার প্রসারে উৎসাহ প্রদান করে। কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় প্রথম শব্দটি ছিল ইকরা – অর্থাৎ পড়ুন, শিখুন, বুঝুন। 

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কখনও পড়তে বা লিখতে শেখেননি, কিন্তু তিনি শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। যদিও তৎকালীন আরবদের বেশিরভাগই নিরক্ষর ছিলেন, তবে শব্দের প্রতি তাঁদের প্রচণ্ড এবং স্বতঃস্ফূর্ত ভালবাসা ছিল। আরবরা শব্দের জাদুকর ছিলেন  – কবিতা, গল্প বলা এবং বংশতালিকা অবলীলায় মুখস্ত করতে পারতেন। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই তাঁরা শিক্ষার প্রসারে উৎসাহ দিয়েছিলেন। 

মুসলমানরা বিশ্বাস করেন যে, কুরআনের প্রতিটি আয়াত হল আল্লাহের নির্দেশ এবং তা কীভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, সেই বিষয়ে তাঁরা সর্বদাই উদ্বিগ্ন থাকতেন। ইসলামের প্রথম দিক থেকেই নবীর সাহাবীরা কুরআনের আয়াতগুলি লিখে রাখতে শুরু করেছিলেন। গাছের ছাল, হাড়, পশুর চামড়া এবং এমনকি পাথরেও তাঁরা আয়াত লিখে রাখতেন। তখন থেকেই শুরু হয় অক্ষর পরিচয়, আর এভাবেই নতুন যুগ শুরু হয়েছিল।

প্রথম মুসলমানদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন মক্কা সমাজের সবচেয়ে দরিদ্র, বা দাস শ্রেণীর লোক। ইসলাম তাঁদেরকে সমাজে সমান অধিকার ও সম্মান নিয়ে জীবনযাপন করার সুযোগ দিয়েছিল। হযরত মুহাম্মদ বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর অনুগামীরা ভালো ভাবে বাঁচতে পারবে ও জীবনে উন্নতি করতে পারবে যদি সাক্ষর এবং সুশিক্ষিত হন।

মক্কার অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধ ছিল বদরের যুদ্ধ। এই যুদ্ধের শেষে, নবীন মুসলিম সেনাবাহিনী সত্তর জনকে বন্দী বানিয়েছিল। নবী মুহাম্মদ জানতেন যে, বন্দীদের অধিকাংশই শিক্ষিত ছিলেন এবং যাঁরা অন্তত দশজন মুসলমানকে পড়তে এবং লিখতে শেখাবে সেই বন্দিদের তিনি মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

ধীরে ধীরে নতুন মুসলমানরা তাঁদের জীবনে কুরআনের নির্দেশ মেনে চলার গুরুত্ব বুঝতে শুরু করেন। ফলে কুরআন পড়ে আল্লাহের সান্নিধ্য লাভের আশায় মুসলমানরা অক্ষরের সাথে পরিচয় করতে শুরু করে। তাঁরা নিজেদের বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করার জন্য জ্ঞানপিপাসু হয়ে উঠেছিল, এবং আল্লাহের নির্দেশ সম্পর্কে আরও বেশি জানার কাজেই তাঁরা অক্ষর জ্ঞানের ব্যবহার করতে শুরু করে।  

মুসলিম বিদ্বজ্জনরা কঠোর পরিশ্রম করে সেই সময়ে যে সমস্ত ঐতিহ্যের কথা লিখে রেখে গিয়েছেন, সেখানে দেখা গিয়েছে, নবী সর্বদাই তাঁর অনুসারীদের জ্ঞান অর্জনের জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, কেউ জ্ঞানের সন্ধান করার জন্য কোনও  পথ অনুসরণ করলে  আল্লাহ তাঁর জান্নাতের পথ সহজ করে দেবেন। তিনি আরও বলেছিলেন যে, জ্ঞান অর্জন হ’ল তিনটি ভালো কাজের মধ্যে একটি, যা মৃত্যুর পরেও অব্যাহত থাকে।

মানুষের মন এবং বুদ্ধি, দুইই রয়েছে। আমাদের কাছে যুক্তি দিয়ে বিচার করার ক্ষমতা এবং জ্ঞান গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার স্বাধীন ইচ্ছাও আছে। আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান অর্জনের সরঞ্জাম দিয়ে তৈরি করেছেন। তিনি মানবজাতির পিতা আদমকে সব কিছুর নাম শিখিয়েছিলেন। আদমকে ভাষার দক্ষতা, এবং জ্ঞান প্রয়োগ করা, পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতি শেখানো হয়েছিল। আমরা, আদমের সন্তানরা, এই দক্ষতা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি যাতে আমরা পৃথিবীতে থাকতে পারি এবং আল্লাহের রাস্তায় চলতে পারি।

ইসলামে জ্ঞানের সাধনা গুরুত্বপূর্ণ। নবী মুহাম্মদ তাঁর অনুগামীদের শিক্ষিত হতে উৎসাহিত করেছিলেন এবং তিনি কুরআনের শিক্ষকদের বাইরের দিকে বসবাসকারী অন্য উপজাতি এবং দূরের শহরগুলিতে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি নিজের অনুসারীদের সাথে বসে তাঁদের ইসলামের নীতিগুলি শিখিয়েছিলেন এবং প্রায়শই তাঁর মুখ থেকে কুরআন শুনে তাঁর দুই চোখ দিয়ে অশ্রুধারা নেমে আসত। নবী মুহাম্মদ বলেছিলেন যে, সেরা মুসলমান তাঁরাই যাঁরা কুরআন শিখেছিলেন এবং পরে অন্যদের শিক্ষা দিতেন।

প্রথম মুসলিমরা কুরআন ও ইসলামী বিজ্ঞান শিক্ষা প্রদানের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিল। অত্যাচারের ভয়ে গোপনে ইসলামের চর্চা করা হত। কাবার অদূরেই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আরকম বিন আবু আরকম ওরফে দারুল আরকম ওরফে দারুল খাইজারান নামক এক ব্যক্তির বাড়িতে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আজ, এই একবিংশ শতাব্দীতেও, ইসলামী বিশ্বজুড়ে, শিক্ষার্থীরা প্রথম ইসলামী বিদ্যালয়ের স্মৃতি এবং স্বীকৃতি হিসাবে দারুল আরকাম (আরকামের বাড়ি) নামের এই স্কুল পরিদর্শন করে। 

ইসলাম জ্ঞান, শিক্ষা, সাক্ষরতা এবং বৌদ্ধিক অনুসরণকে উচ্চ সম্মান দেয়। সমগ্র ইসলামী ইতিহাসে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, গ্রন্থাগার ও থিঙ্ক ট্যাঙ্কের অজস্র উদাহরণ রয়েছে। মুসলমানরা শিক্ষার তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে, পাঠ্যক্রম রচনা করেছে, সাহিত্য ও শিল্প অনুশীলন করেছে, চিকিৎসাশাস্ত্রে নতুন দিশা দেখিয়েছে, জ্যোতির্বিদ্যায় তাঁদের বহু অবদান রয়েছে, পৃথিবীকে ক্যালিগ্রাফির মতো শিল্প উপহার দিয়েছে, এছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ের জ্ঞানকে নতুন সীমায় নিয়ে গিয়েছে।