মুসলমান হিসেবে প্রকৃতি রক্ষার দায়ভার আমাদের উপরও বর্তায়

Préservation de l'environnement, non à la déforestation sans replantation
© Sarayut Thaneerat | Dreamstime.com

ইসলামিক ধর্ম-সংস্কৃতির ঐতিহ্য যথার্থই বহুমুখী। মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষেরা সামগ্রিকভাবে এবং ঐতিহাসিক বিচারের নিরিখে সর্বদাই মানবাধিকার অর্থাৎ প্রতিটি মানুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার কথাই প্রচার এবং প্রসারে সহয়তা করেছে। নিপীড়িতদের জন্য তাঁদের ন্যায়বিচারের নীতি প্রকৃত অর্থেই উল্লেখযোগ্য। ইসলাম সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষদের মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য এবং নিবেদিত ভঙ্গিমা সকলেরই বিশেষরূপে অবগত। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করতেই হয় ইসলাম হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা। তিনি প্রথমেই নারী ও শিশু হত্যার বর্বরোচিত ঘটনাসমূহের তীব্র নিন্দা করেছিলেন এবং তা নির্মূল করার ক্ষেত্রেও এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। সুরা আল-নিসার উদাহরণ অনুসারে নারীর অধিকার ও মর্যাদাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতি পক্ষপাতী ছিলেন তিনি।

ব্যক্তিকেন্দ্রিক অধিকার এবং স্বার্থরক্ষার পাশাপাশি, বৃহত্তর জনগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠার প্রতিও ইসলামীয় সংস্কৃতির বিশেষ অবদান লক্ষ করা যায়। প্রাকৃতিক সম্পদের প্রকৃত সম্মান করার প্রয়োজনীয়তা তাঁরা বিশেষভাবে নিজেদের জীবনাচরণে রপ্ত করতে শিখেছিল। কুরআন নিজেই প্রাকৃতিক বিশ্বের জীববৈচিত্র্য কাব্যিকতা পূর্ণ আয়াতের মাধ্যমে তুলে ধরেছে এবং আধুনিক বিজ্ঞানীরা এসব জটিল বিষয় এখনও আবিষ্কার করে চলেছেন।

বিশ্বউষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং অত্যাধুনিক এই সময়ে অন্যতম প্রধান সমস্যা। বিশদে বিবেচনা করলে বোঝা যাবে, এই সবই হল মনুষ্যসৃষ্ট… মানুষের আবিষ্কৃত জ্বালানি থেকে ক্ষতিকর পদার্থ নিঃসৃত হয়ে আজ প্রকৃতিকে করে তুলেছে বিষাক্ত… যে প্রকৃতিতে একসময়ে ছিল স্বর্গীয় প্রশান্তি, সেই প্রকৃতির পরিবেশই আজ অশান্ত, কালিমালিপ্ত।

কিন্তু কোরান শরীফে প্রতিফলিত নির্দেশ এবং আচরণবিধির যদি আমরা মান্যতা দিই, তাহলে দেখব এই গ্রন্থেই প্রাকৃতিক সম্পদের রক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং মূল্যায়নের প্রসঙ্গে বিভিন্ন নির্দেশ এবং প্রতিনির্দেশের কথা বলা রয়েছে। কিন্তু আজ সভ্যতার ক্রম অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষ একে ঠেলে দিচ্ছে একপ্রকার বিপণ্ণতার দিকে। প্রকৃতিকে ধ্বংসের মুখোমুখি এনে দাঁড় করিয়ে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ সংশয়ের কারণ হয়ে উঠছে এই মানুষই… মনুষ্যসৃষ্ট বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ।

এমত অবস্থায় আমাদের অবশ্যই একটি ইকোসিস্টেমের গুরুত্ব এবং ন্যায়বিচারের পদ্ধতি আনয়ন করা। যার সাহায্যে এই সকল অন্যায়সাধনের প্রতি একধরনের জবাবদিহি করা সম্ভব হবে।

এর জন্য আমাদের কতকগুলি পদ্ধতিগত রীতি-নীতি আনয়ন করতে হবে। আমাদের মসজিদগুলিতে এবং আমাদের বৃহত্তর সম্প্রদায়ের মধ্যে এই প্রসঙ্গে আলাপ-আলোচনার ক্ষেত্র বিস্তৃত করা বিশেষভাবে প্রয়োজন। কথোপকথনের প্রধান উৎস হওয়া উচিত যে আমরা কীভাবে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির উত্সগুলিতে স্থানান্তর করতে পারি। যা আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে একটি ‘সবুজ’ জীবনযাত্রাকে আরও প্রসারিত এবং সম্প্রসারিত করে তুলতে পারবে। হালাল জীবন যাপন করার অর্থ কী তা আমাদের পুনরায় মূল্যায়ন করতে হবে।

একটি সহজ তবে যুগান্তকারী পরিবর্তন আমরা ঘটাতে পারি আমাদের খাবারের তালিকা নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে। মাংস শিল্প জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য প্রভাব সৃষ্টিকারী একটি বৃহত্তম মাধ্যম (এবং হ্যাঁ-এর মধ্যে হালাল মাংসও অন্তর্ভুক্ত)। পশ্চিমারা পশু থেকে তৈরি বিভিন্ন পণ্য ব্যবহার করে এবং আমরাও এই বিষয়টিকে গুরুত্বহীন মনে করি কারণ কিছু খাওয়ার অনুমতি রয়েছে মানে তার অর্থ এই নয় যে, আমরা যেকোনো পরিস্থিতিতে তা গ্রহণ করব আর তা ন্যায়সঙ্গত হবে।

দুর্ভাগ্যক্রমে, আমাদের কাছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিক্রিয়া জানার মতো সময় এবং অবকাশ নেই। কিন্তু বৈজ্ঞানিক বহুক্ষেত্রেই একথা ঘোষিত যে আমরা যদি আজকে কাজ না করি তবে আমরা এই বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তনকে রোধ করতে অক্ষম হতে পারি। যেহেতু আমাদের পৃথিবী অস্থিতিশীলতার পথে চলেছে আমরা আশা করতে পারি না যে আমাদের সমাজ এবং সরকারগুলি এর পরেও একরকম সুরক্ষিত থাকবে। মুসলমান হিসাবে আমাদের উপর নিপীড়িত ও নির্বোধদের পক্ষে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব। মনুষ্যসমাজ রক্ষা এবং প্রকৃতি রক্ষার প্রতি বিশেষ দায়বোধ আমাদের অবশ্যই রয়েছে।