মুসলিম ইউরোপের মুকুটে সবচেয়ে উজ্জ্বল রত্ন, আলহাম্ব্রা

alhambra
ID 62100541 © Taiga | Dreamstime.com

কথায় বলে, “আপনি যদি একবার আলহাম্ব্রা ঘুরে আসেন, তাহলে বাকি সারা জীবন অপেক্ষা করবেন আর একবার সেখানে ফিরে যাওয়ার জন্য …”

স্পেনের গ্রানাডা শহরে রয়েছে ইউরোপের সবচেয়ে বিখ্যাত এই ইসলামিক স্মৃতিসৌধটি। রেকর্ড বলছে, বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা অন্তত ৬ হাজার ব্যক্তি রোজ আলহাম্ব্রা দেখতে আসেন। তাই আলহাম্ব্রা দেখার ইচ্ছা থাকলে, টিকিট কাটুন আগে ভাগে। বিশেষ করে, মরসুমে গেলে দিনের দিন টিকিট না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ফলে ঝুঁকি এড়াতে অনলাইনে টিকিট কেটে রাখতে পারেন আগে থেকেই।

আলহাম্ব্রা কথাটির উদ্ভব হয়েছে – আরবি আল-কালাআত আল-হামরা থেকে, যার অর্থ, ‘লাল দুর্গ’। ফলে নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, এটি লাল পাহাড়ের উপরে অবস্থিত একটি সম্পূর্ণ প্রাসাদীয় শহর। এখানে রয়েছে বিভিন্ন মুসলিম এবং খ্রিস্টান শাসক দ্বারা নির্মীত স্মৃতিস্তম্ভের মিশ্রণ। 

প্রতিটি গাইডবুকের প্রচ্ছদে আঁকা যে ছবিটি মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কাটে সেটি হল, আলহাম্ব্রা নামক এই মুসলিম ইউরোপীয় মুকুটের সবচেয়ে দামি ‘রত্ন’ – প্যালাসিওস নাজারেস বা নাস্রিদ প্যালেস – যা ছিল গ্রানাডার মুসলিম শাসকের রাজপ্রাসাদ। আলহাম্ব্রার এই অংশ দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে। এই অংশের নিখুঁত এবং সূক্ষ্ম কারুকাজ দেখে যে কেউ সম্মোহিত হয়ে যেতে পারেন। এই প্রাসাদের প্রতিটি স্তম্ভ, প্রতিটি দরজা, দেওয়ালের প্রতিটি কোণায় রয়েছে শিল্পীর মননশীল সৃষ্টির ছোঁয়া।

“জলই আলহামব্রার রহস্যময় জীবন গড়ে তুলেছে: এই জলই এখানকার উদ্যানগুলিকে অবিরাম সবুজ করে তোলে, এর জন্যই ঝোপঝাড় এবং গুল্মগুলি ভরে ওঠে রাশি রাশি ফুলে, এটি পুলগুলির স্থির জলে সুন্দর মার্বেলের হলগুলির প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হয়ে অনন্য সৌন্দর্যের জন্ম দেয়, ফোয়ারা থেকে প্রতিনিয়ত বেরিয়ে আসা জলরাশির মৃদু গুঞ্জন প্রতি মূহূর্তে প্রতিধ্বনিত হয়ে পৌঁছে যায় এই প্রাসাদের কেন্দ্রে। ঠিক যেমন কুরআনে জান্নাতের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।”- টাইটাস বার্কার্ড, ইসলামিক শিল্প ও স্থাপত্যের জার্মান-সুইস বিশেষজ্ঞ।

তারপরে রয়েছে কোমারেস টাওয়ার (Comares Tower)যেখানে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রশংসা করা হয়েছে আরবি ক্যালিগ্রাফিতে। হল অফ কিংস-এর অনবদ্য স্থাপত্যশৈলি ভাষায় বর্ণনা করা দুঃসাহসই বলা যায়। এই সৌন্দর্যের খোঁজেই দূর দূরান্ত থেকে অনুসন্ধিৎসুরা আসেন গ্রানাডার আলহাম্ব্রায়। 

“আধুনিক ইউরোপ যে সমস্ত গৌরব অর্জন করেছে তার অধিকাংশেরই উৎস মুসলিম স্পেন। কূটনীতি, অবাধ বাণিজ্য, মুক্ত সীমানা, অ্যাকাডেমিক গবেষণার কৌশল, নৃতত্ত্ববিজ্ঞান, শিষ্টাচার, ফ্যাশান, বিভিন্ন ধরনের ঔষধ এবং হাসপাতাল –  সবই এই মহান শহরগুলি থেকে পাওয়া।” – প্রিন্স চার্লস, প্রিন্স অফ ওয়েলস

আলহাম্ব্রা নির্মাণের প্রকৃত কারণ হল, আল-আন্দালুসের পতন। পাহাড়ের উপরে অবস্থিত একটি প্রাসাদ, যেখানে বর্তমান আলহাম্ব্রার অবস্থান, তা একাদশ শতকের গোড়ার দিকে প্রথম নির্মাণ করেছিলেন এক ইহুদি পণ্ডিত, কবি ও উজির স্যামুয়েল ইবন।

আলহাম্ব্রার উত্থান শুরু হয়েছিল অষ্টম শতাব্দীর গোড়ার দিকে এবং একাদশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত এর স্থায়িত্ব ছিল। জানা যায়, গ্রানাডার মুসলিম শাসক – জিরিদ সুলতানরা – আলবায়েজিনের একটি প্রাসাদে বাস করতেন। তখন উত্তর থেকে আসা খ্রিস্টানরা যখন একের পর এক তায়েফাকে (সামন্ততান্ত্রিক রাজ্য) দখল করে নিচ্ছিল। সেই সময়, ১২৩১ সালে এক আরব ব্যক্তি (তাঁর পরিবারের সাথে মদিনার দীর্ঘ সম্পর্কের ইতিহাস ছিল) মহম্মদ ইবনে ইউসুফ ইবনে নসর, গ্রানাডার শাসনভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। 

এই ইবনে নসরই আলহাম্ব্রাকে তাঁর পরিবারের বাসস্থানে পরিণত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তাঁর রাজবংশেরই নাম ছিল – নাস্রিদ। এই রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতাতেই আলহাম্ব্রা পরিণত হয় বাজার, মসজিদ, আবাসিক কোয়ার্টার, স্নানঘর ও উদ্যান সমন্বিত একটি পরিপূর্ণ একটি প্রাসাদীয় নগরীতে। 

১২৬৪ সাল নাগাদ খ্রিস্টান অধ্যুষিত আইবেরিয়ায় এই নাস্রিদরাই ছিল একমাত্র মুসলিম শাসক, এবং পরবর্তী আড়াই শতক পর্যন্ত তারা একাই ‘মুসলিম স্পেন’-এর ধ্বজাধারী ছিল।

এই যুগেই, গ্রানাডার বিকাশ হয়েছিল, এবং তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বর্ণযুগে পৌঁছেছিল (১৩৪৪-১৩৬৬ সালে); আর এই সময়কালেই এই প্রাসাদ নগরীর সর্বাধিক আকর্ষণীয় অংশগুলি নির্মাণ করা হয়েছিল।

পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষার্ধে আবু আবদুল্লাহের রাজত্বকাল পর্যন্ত আলহাম্ব্রা ছিল নাস্রিদ শাসকদের বাসস্থান এবং এই সময়কাল – পশ্চিমে ‘বোয়াবদিল’ নামে পরিচিত। এই শেষ নাস্রিদ শাসক ১৪৯২ সালের জানুয়ারি মাসে ক্যাথলিক সম্রাট, দ্বিতীয় ফার্ডিনান্দ এবং প্রথম ইসাবেলার কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। এর ফলে স্পেনের প্রায় ৭৮১ বছর দীর্ঘ মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে।

পরবর্তী কয়েক শতকে, আলহাম্ব্রা বিভিন্ন স্পেনীয় খ্রিস্টান রাজাদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, এবং তাঁরাও এই প্রাসাদে বেশি কিছু সংযোজন করেছিলেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল পঞ্চম চার্লসের গোলাকার প্রাসাদ।

১৮৭০ সালে, স্পেনীয় কর্তৃপক্ষ আলহাম্ব্রা প্রাসাদ শহরটিকে জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ হিসাবে ঘোষণা করে এবং তার সংস্কারের কাজ শুরু করে। ১৯৮৪ সালে, একে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তালিকায় যুক্ত করা হয়।