মুসলিম ছাত্রদের উপর অনলাইন শিক্ষার কী প্রভাব হতে পারে?

শিক্ষা ১১ মার্চ ২০২১ Contributor
মতামত
মুসলিম ছাত্রদের উপর অনলাইন
Photo by Julia M Cameron from Pexels

করোনা ভাইরাসের দাপট এবং লকডাউনের ফলে গোটা বিশ্ব ধীরে-ধীরে পরিচিত হতে শুরু করেছে ডিজিটাল দুনিয়ার সঙ্গে। লেখাপড়াও এর ব্যতিক্রম নয়। আপনার ঘরের কমবয়সী সদস্যটিও হয়তো এখন ক্লাসরুমের বদলে অনলাইনেই লেখাপড়ায় অভ্যস্ত উঠেছে। কিন্তু জানেন কি, মুসলিম ছাত্রদের উপর অনলাইন শিক্ষার প্রভাব কী? অনলাইনে শিক্ষার নানা ভাল দিকের পাশাপাশি এর নানা খারাপ দিকও রয়েছে। আজকে আমরা মুসলিম ছাত্রদের উপর অনলাইন শিক্ষার প্রভাব নিয়ে আলোচনা করব।

মুসলিম ছাত্রদের উপর অনলাইন শিক্ষার প্রভাব

আপনারা সকলেই জানেন, আমেরিকার মতো পশ্চিমী দেশগুলিতে মুসলিম কলেজ ছাত্রছাত্রীরা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, পোশাক ও আচরণের জন্য কলেজ ক্যাম্পাসে কীভাবে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। আমেরিকায় ৯/১১-র বিমানহানার পরই মুসলিমদের প্রতি এই বিভাজন শুরু হয়। তাদের সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হয়। যার জেরে বেশ কয়েকবছর আগে বিখ্যাত বলিউড তারকা শাহরুখ খানকেও আমেরিকার এক বিমানবন্দরে ইউএস ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট দ্বারা আটক হতে হয়! কিন্তু বিশ্বজুড়ে এই করোনা মহামারি এবার আমেরিকা সহ সমগ্র বিশ্বের মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের এক অন্যরকম সমস্যার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। লকডাউনের ফলে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় শুরু হয়েছে অনলাইনে ক্লাস।

আর এই অনলাইনে লেখাপড়া মুসলিম ছাত্রদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে! লকডাউনের ফলে দীর্ঘ গৃহবন্দিত্ব বাধা সৃষ্টি করছে তাদের পারস্পরিক মেলামেশায়। পবিত্র রমজান মাসের মেলামেশা, ইদের উৎসব, সবই বন্ধ থাকায় ঘরে থাকতে-থাকতে, ঘরে বসে কম্পিউটার স্ক্রিনে বা স্মার্টফোনের পরদায় একভাবে চোখ রেখে পড়তে-পড়তে চলে যাচ্ছে পরস্পরের সঙ্গে মেশা, সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার অভ্যেস। এবং তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

করোনার ফলে জমায়েতে বাধা

ইসলাম আমাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করতে বলে, পরস্পর মিলেমিশে থাকতে বলে। এতদিন পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীরা কলেজ ক্যাম্পাসেই একসঙ্গে জমায়েত করতে পারতেন। কিন্তু করোনার ফলে স্বাস্থ্যগত কারণেই এইসমস্ত জমায়েতের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এমনকী, এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ হয় স্কুলে-স্কুলে মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের জমায়েতে প্রার্থনা করার ক্ষেত্রেও। মসজিদ, গির্জা এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রার্থনার স্থানগুলি বন্ধ হওয়ার ফলে বাড়িতেই তাঁরা বাধ্য হয়ে একাকী প্রার্থনা জানাতে থাকেন। আগে পশ্চিমী দেশগুলিতে এই ধর্মীয় জমায়েত বন্ধ করার প্রতিবাদ হলেও শেষমেশ করোনা আবহে বন্ধ হয়ে যায় মক্কার মসজিদের প্রার্থনা জমায়েতও! এর ফলে বাধ্য হয়েই মুসলিম ছাত্ররা নিজেদের ছোট কিছু গ্রুপের মধ্যেই রমজান বা ইদের মতো উৎসবগুলি পালন করেন। একসঙ্গে উৎসব পালন আমাদের মনে খুশির ছোঁয়া এনে দেয়। কিন্তু তার বদলে ঘরে বন্দি এই উৎসবযাপন অনেকের ক্ষেত্রেই কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

মুসলিম ছাত্রদের অনলাইন-এ লেখাপড়ায় সমস্যা

লকডাউনে কলেজ ও স্কুল বন্ধ থাকায় প্রায় বেশিরভাগ শিক্ষাই অনলাইনে চালু হয়েছে। অথচ ভার্চুয়াল মোডে শিক্ষণের যথাযথ পরিকাঠামো না থাকায় ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, উভয়কেই বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে পঠনপাঠনে। এছাড়া যাদের হাতে স্মার্টফোন নেই বা ল্যাপটপ, কম্পিউটারের সুযোগ নেই, ইন্টারনেটের কানেকশন নেই, এই ব্যবস্থায় তাঁরা পড়েছেন বিপদে। অনেকক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, বাবা-মা-রা সন্তানকে ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন কিনে দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনলাইনে ক্লাস না করতে পারার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে লেখাপড়া। ফলে দেখা যাচ্ছে, যে ছাত্র স্কুলে শ্রেণিকক্ষে লেখাপড়ায় দুর্দান্ত ছিল, ভার্চুয়াল লেখাপড়ার দুনিয়ায় মানিয়ে নিতে না পেরে তার রেজাল্ট ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে।

মুসলিম ছাত্রদের কাউন্সেলিংয়ের অভাব

লকডাউনের ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অনিশ্চয়তা দেখা গিয়েছে, তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। কোনও মুসলিম ছাত্র নতুন লেখাপড়ার ব্যবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেনি, কারওর ক্ষেত্রে বন্ধুবান্ধবহীন অবস্থায় বাড়িতে থেকে গ্রাস করেছে মানসিক সমস্যা! শারীরিক সমস্যাও লকডাউনে বেড়েছে। যারা বিভিন্ন স্থানে কলেজের হস্টেলে আটকে পড়েছিল, তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও বেশি করে দেখা গিয়েছে। যে-পরিস্থিতিতে ইমামদের সঙ্গে কথা বললে হয়তো মনে খানিক শান্তি পাওয়া যেত, সেইসময়ে এইসমস্ত উপায় বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও খারাপ আকার ধারণ করেছে।

মুসলিম ছাত্রদের উপর অনলাইন শিক্ষার প্রভাবে বিকল্প কেরিয়ারের ভাবনা

মুসলিম ছাত্রদের উপর অনলাইন শিক্ষার প্রভাবের অন্যতম একটি দিক হল করোনাকালীন লকডাউনের অনেক খারাপ দিকের মধ্যেও বেশ কিছু ভাল দিক দেখা গিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হল, ছাত্রছাত্রীরা এখন গতে বাঁধা কেরিয়ারের চিন্তাভাবনা থেকে সরে অনলাইনে নানা কাজ, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার দিকে ঝুঁকছে। বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী তাদের খরচ চালানোর জন্য পার্টটাইম নানা কাজও করতে শুরু করেছে। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে মুসলিম ছেলেমেয়েরা তাদের ক্রিয়েটিভিটি দেখাচ্ছে, ঘরের আগল থেকে বেরিয়ে তারা বাইরের দুনিয়ায় আরও বেশি করে মুখ খুলছে, জীবনের নানারকম অভিজ্ঞতার কথা পডকাস্টে ভাগ করে নিচ্ছে। ঘরে বসেই অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ার পাশাপাশি শুরু করছে ব্যবসা, জোরকদমে যার প্রচার চলছে ইনস্টাগ্র্যাম ও ফেসবুকে। পিছিয়ে নেই মুসলিম মেয়েরাও। তারাও নানারকম ফ্যাশন ও ডিজাইন ব্লগ খুলছে।

মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য কমবে কি?

এটি কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমরা লেখার শুরুতেই বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের কীভাবে বৈষম্যের শিকার হতে হয়, তা নিয়ে আলোচনা করেছি। তবে মহামারির শুরুতে এই ধর্মীয় ও জাতিগত বৈষম্যের ঘটনা কিছু হলেও কমেছে। বৈষম্যের শিকার হবেন ভেবে যে-সমস্ত মুসলিম মহিলারা আগে বোরখার আড়ালে মুখ ঢাকতে ভয় পেতেন, তাঁরা এখন নিশ্চিন্তে বোরখা পরেই বেরতে পারছেন। এই বৈষম্য হ্রাসের অন্যতম কারণ হল, এখন মানুষে-মানুষে মেলামেশার সুযোগ কম থাকা। তবে অনলাইনে, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যের প্রবণতা কিন্তু এখনও কমেনি। আবার যেমন লকডাউনের শুরুতেই লন্ডনে করোনার বাড়বাড়ন্তের জন্য কিছু দল সেখানকার মুসলিম

অধিবাসীদের উপর দোষারোপ করতে শুরু করেছিল! তবে এখন ধর্মীয় বৈষম্য কম হলেও, পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই যে তা কমে যাবে, এমনটা কিন্তু না ভাবাই উচিত।

ছাত্রসমাজের ধর্মে বিশ্বাস বাড়ছে

লকডাউনের ফলে মুসলিম ছাত্রদের উপর অনলাইন শিক্ষার প্রভাবের আর একটি ইতিবাচক দিক হল, এই অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে তারা আরও বেশি করে ধর্মে বিশ্বাসী হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন পরে পরিবারের সঙ্গে বাড়িতে থাকার ফলে অবসর সময়টিতে তারা নিজেদের মানসিক দৃঢ়তা ও চারিত্রিক বলের জন্য এবং শান্তি পেতে পবিত্র কোরান পাঠে মন দিচ্ছে। অনলাইনেই ইসলামিক ছাত্রদের কমিউনিটি গড়ে উঠছে, যেখানে নানারকম ধর্মীয় আলোচনার মাধ্যমে তারা নিজেদের চারিত্রিক উন্নতির চেষ্টা করছে।

পরিচ্ছন্নতার প্রতি ছাত্রদের ঝোঁক বাড়ছে

ধর্মে বিশ্বাসী হয়ে ওঠার অনুষঙ্গেই বাড়ছে পরিচ্ছন্নতার প্রতি ঝোঁক। এমনিতেই করোনার ফলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা আরও বেশি করে সাবধানী ও স্বাস্থ্যসচেতন হয়ে উঠেছি। চার্লস স্টুয়ার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেহমেট ওজাল্পের মতে, ইসলাম ধর্ম সর্বদা যে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার কথা বলে, মানুষ এখন সেখানে আরও বেশি জোর দিচ্ছে। তাঁর কথায়, “প্রফেট মহম্মদের মতে, ‘বিশ্বাসের অর্ধেকই হল পরিচ্ছন্নতা’, এছাড়া তিনি খাওয়ার আগে ও পরে মুসলিমদের হাত ধুতেও শিক্ষা দিতেন…” মুসলিম ছাত্ররা এখন নবীর সেই কথাই অন্তরে অনুভব করছে। কারণ বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে ব্যক্তিগত হাইজিন বজায় রাখা এবং ডিসইনফেকশনের নিয়ম মেনে চলা ছাড়া আর উপায় নেই।

মুসলিম ছাত্রদের উপর অনলাইন শিক্ষার প্রভাব ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের হলেও এই প্রভাব যে সুদূরপ্রসারী, সে কথা বলাই বাহুল্য। বন্ধুদের অভাবে একাকিত্ব, মানসিক সমস্যা, অনিশ্চয় পরিস্থিতিতে যথাযথ পরামর্শদাতার অভাবে বিশ্বজুড়েই মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের ধর্মে বিশ্বাস বাড়ছে, নিজেকে উন্নত করার রাস্তা হিসেবে তারা এখন বিকল্প পথের সন্ধান করছে। তবে, মুসলিম ছাত্রদের উপর অনলাইন শিক্ষার প্রভাব স্বরূপ একথা বলাই যায়, একঝাঁক এই তরুণ-তরুণীর হাতে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ কিন্তু উজ্জ্বল।