মুসলিম তার দানশীলতার ছায়ার মধ্যে থাকেন

dreamstime_s_170335913

দানের ছায়ায় আশ্রয় পাওয়ার ঘটনা

একদা ইবনে জুদান নামে এক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি তাঁর নিজের গল্পটি এভাবে বর্ণনা করেছেন: “আমি একবার বসন্তকালে বাইরে বের হলাম এবং আমার উটগুলিকে স্বাস্থ্যবান এবং উটনীগুলির স্তন দুধে ভরা দেখতে পেলাম। এর মধ্য থেকে আমি আমার সবথেকে প্রিয় উটটিকে বাছাই করলাম এবং আমার দরিদ্র প্রতিবেশী, যার সাতটি মেয়ে ছিল, তাকে উটটি উপহার দেব বলে মনস্থ করলাম। উটটি নিয়ে আমি তার দরজায় কড়া নাড়লাম। তিনি দরজা খুললে আমি তাকে বললাম, “দয়া করে এই উটটি আমার পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে গ্রহণ করুন।” তিনি শিহরিত এবং বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। পরবর্তীতে তিনি এই উটটি থেকে প্রচুর উপকৃত হয়েছেন; তিনি এর দুধ পান করতেন এবং উটের পিঠে কাঠ বহন করাতেন।

বসন্তকাল শেষ হল এবং গ্রীষ্ম তার প্রচন্ড তাপদাহ সহ আগমন করল। ইবনে জুদান বলে চললেন, ” গ্রীষ্মের তাপে আমরা বিস্তৃত প্রান্তরে ভূগর্ভস্থ পানির সন্ধান করতে লাগলাম। ভুগর্ভস্থ পানির সন্ধানে আনি একটি গর্তে অবতরণ করলাম এবং আমার তিন পুত্র আমার জন্য গর্তের মুখে অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু গর্তের ভিতর আমি পথ হারিয়ে ফেললাম!”

তার তিন পুত্র তিনদিন যাবত পিতার জন্য গর্তের মুখে অপেক্ষা করতে লাগল, কিন্তু তিনি আর বের হলেন না। তার ছেলেরা অবশেষে ভাবতে লাগল যে, তিনি হয়ত তার পথ হারিয়েছেন এবং ক্ষুধার তাড়নায় মারা গেছেন। এরপর তারা বাড়িতে ফিরে গেল এবং পিতা মারা গেছে ভেবে তার সমুদয় সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারা করতে লাগল। তাদের মনে ছিল যে, তাদের পিতা প্রতিবেশীকে একটি উট হাদিয়া দিয়েছিলেন। তাই তারা ঐ অভাবী প্রতিবেশীর কাছে গেল এবং সেই উটটি ফিরিয়ে দিতে পীড়াপীড়ি করতে লাগল। তারা লোকটিকে বলল, “হয় তুমি উটটি আমাদেরকে ফিরিয়ে দাও, নয়ত আমরা জোর করেই তা তোমার থেকে ছিনিয়ে নেব।”

কৃতজ্ঞতার সীমানা

লোকটি তখন বলল, “তোমরা যা বলছ, আমি তা তোমাদের পিতাকে জানিয়ে দেব।”

তারা বলল, “তিনি তো এতক্ষণে মারা গেছেন।”

একথা শুনে সে চিৎকার করে বলল: “মারা গেছেন? কিভাবে, কোথায় তিনি মারা গেলেন?”

তারা জবাব দিল, “তিনি একটি ভূগর্ভস্থ গর্তে পানির সন্ধানে ঢুকেছিলেন এবং আর বেরিয়ে আসেন নি।”

লোকটি একথা শুনে বলল, “উটটি তোমরা নিয়ে যাও। আমি তোমাদের উট চাই না, আমাকে কেবল ঐ গর্তটি দেখিয়ে দাও”

তখন তারা তাকে গর্তের কাছে নিয়ে গেল। প্রতিবেশীর কাছে একটি দড়ি ছিল। সেটি নিয়ে সেও গর্তের ভিতর ঢুকে পড়ল। গর্তের ভিতর অনেকদূর যেতে সে হঠাৎ কান্নার শব্দ শুনতে পেল। সে শব্দকে অনুসরণ করে এগিয়ে যেতে থাকল এবং অবশেষে কাদার ভিতর একজন মানুষকে পেয়ে গেল। সে তাকে টেনে উপরে তুলল এবং দেখল যে, এটিই ইবনে জুদান।

প্রতিবেশী লোকটি ইবনে জুদানকে খুজে পেল এবং তাকে কাধে করে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল।

আল্লাহর প্রতি ভরসা রাখার কাহিনী

বাড়িতে পৌছে কৌতুহলের সাথে সে ইবনে জুদানকে জিজ্ঞাসা করল, “কিভাবে আপনি এক সপ্তাহ যাবত গর্তের ভিতর জীবিত ছিলেন?”

ইবনে জুদান উত্তর দিলেন, “আমি যখন গর্তের ভিতরে পথ হারিয়ে ফেলি, তখন একটি ঝর্ণার পাশে বসেছিলাম, যাতে পিপাসায় আমার মৃত্যু না হয়। তবুও, শুধু পানি পান করে বেচে থাকা আমার জন্য খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে যায়; তিন দিন ধরে আমি অত্যন্ত ক্ষুধার্ত ছিলাম এবং কী করব তা আমার জানা ছিল না। আমি আল্লাহর উপর পুরোপুরি ভরসা করে সেখানে শুয়ে পড়লাম এবং হঠাৎ আমি অনুভব করলাম যে, দুধের ফোঁটা আমার মুখে পড়ছে। আমি সেই অবস্থাতেই বসে রইলাম, কিন্তু আশেপাশে কিছুই দেখতে পেলাম না। কারণ সেখানে অন্ধকার ছিল। আমি আমার মুখের কাছে দুধের পাত্র অনুভব করতাম এবং আমি আমার পেট ভরার আগ পর্যন্ত সেই পাত্রটি থেকে পান করতাম। পেট ভরে গেলেই পাত্রটি অদৃশ্য হয়ে যেত। এটি একদিনে তিনবার ঘটত। তবে দুদিন ধরে পাত্রটি আমার কাছে আর আসেনি।”

প্রতিবেশী লোকটি এ কথা শুনে ইবনে জুদানকে বলল, “আমি আপনাকে বলছি যে, কেন এই দু’দিন পাত্রটি আসে নি। আপনার ছেলেরা ভেবেছিল যে, আপনি মারা গেছেন। এবং এই কারণে দু’দিন আগে তারা আমার কাছে এসে আপনার দেওয়া উটটি নিয়ে গেছিল। উটটি নিয়ে যাওয়ার পর আপনার কাছে সেই পাত্রটি আর হাযির করা হয় নি। প্রকৃতপক্ষে, প্রত্যেক মুসলিমই তার দানের ছায়ার মধ্যে নিরাপদে থাকেন।”