মুসলিম বিশ্বে দক্ষ সেচ ব্যবস্থার পিছনে কে ছিলেন?

al jazari

অষ্টম শতাব্দীর গোড়ার দিকে স্পেনের কর্ডোবা থেকে শুরু করে দামেস্ক, বাগদাদ, ফেজ, মেরাকেচ পর্যন্ত বিস্তৃত মুসলিম সভ্যতার হাতে ছিল বিশ্বের সবচেয়ে উন্নতমানের জল প্রযুক্তি। সমাজের উন্নয়নে এবং সেবায় সেই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তখনকার মুসলমানরা তৈরি করে বাঁধ, খাল এবং জলবিদ্যুতের  মতো উদ্ভাবনী কৌশল। পরবর্তীতে যা বিপুল ভাবে ব্যবহৃত হয়েছে সেচ ব্যবস্থায়।

সেই যুগের শ্রেষ্ঠ প্রযুক্তিবিদ আল জাজারি জন্মগ্রহণ করেন দ্বাদশ শতাব্দীতে। নদীর জল উত্তোলনের জন্য সেই সময়কার উদ্ভাবক আল জাজারি সম্ভবত পাঁচটি মেশিন নির্মাণ করেন। তাদের বর্ণনা কথিত রয়েছে তাঁর বিখ্যাত পুস্তক- ‘আল-জামি বাইন আল-ইলম ওয়া আল-আমল আল-নাফি ফি সিনা আত আল হিয়াল’ বা ‘দি বুক অফ নলেজ অফ ইনজেনিয়াস মেকানিকেল ডিভাইসেস’-এ। এটি ইসলামি প্রকৌশলের ইতিহাসে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণামূলক পুস্তক। জানা যায়, ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি এই প্রযুক্তির ইতিহাস রচনা করেন। তাঁর মৃত্যুর আটশ বছর পর বিজ্ঞানের আধুনিক ইতিহাসে তার কর্মের স্বীকৃতি দিয়ে তাকে সম্মান জানানো হয়েছে। আল-জাজারি রচিত এ গ্রন্থটি প্রযুক্তি এবং শিল্পকলার ঐতিহাসিকদের সবসময় আগ্রহ জুগিয়ে এসেছে।

বই থেকে আমরা জানতে পারি, জল তোলার মেশিনের মধ্যে নাজুরা বা নুরিয়া একটি ঐতিহাসিক এবং গুরুত্বপূর্ণ মেশিন, এটি কাঠের তৈরী একটি চাকা ও প্যাডেল সরবরাহ করে। এর প্রচলন করা হয়েছিল স্পেনের মুসলিম কৃষকদের এবং প্রকৌশলী হাত ধরে। কর্ডোবার আলবোফিয়ায় নুড়িয়া আজও বর্তমান। তখনকার সময় এই নুড়িয়া নদীর জল খলিফাদের প্রাসাদ পর্যন্ত তুলে দিত। প্রথম আব্দুল রহমান এই নির্মান কাজ প্রথম পরিচালনা করেছিলেন এবং জানা গেছে যে এটি অনেকবার পুর্ননির্মান করা হয়েছে।

সম্ভবত আল জাজারির আবিষ্কারগুলোর কথা মনে করলে সবচেয়ে অবাক করেছিল যে যন্ত্রটি সেটি হল যমজ সিলিন্ডার পাম্প। দুরকম নীতি অনুসরন করে দ্রুত কাজ করাই ছিল এর গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বাইজানটাইন আমলে গ্রিক ফায়ার নামে আগুন ছুড়ে মারা অস্ত্রে যে ধরনের সাইফন ব্যবহার করা হতো, তার উদ্ধৃতি দিয়ে আল-জাজারি সর্বপ্রথম শোষণ নল, সাকশন-পাম্প এবং দ্বিগুণ কার্যকর পাম্পের নকশা বর্ণনা করে সর্বপ্রথম ভালব এবং ক্র্যাঙ্কশ্যাফট কানেকটিং রড ব্যবহার করেন। এছাড়া তিনি দুই সিলিন্ডারবিশিষ্ট পিস্টনের সাকশন-পাম্প উদ্ভাবন করেন। আধুনিক প্রকৌশল ব্যবস্থার উন্নতিতে এ জল উত্তোলন যন্ত্রটির সরাসরি গুরুত্ব রয়েছে। ১৫ শতকে ইউরোপে প্রচলিত সাকশন-পাম্পের চেয়ে এটি অনেক উন্নত ছিল।

জল উত্তোলনের একধরনের সরল যন্ত্র চেইন পাম্প। যার মধ্যে একটি বড় পাইপের ভেতরে একটি চেইনের সাথে সংযুক্ত একাধিক ডিস্ক বসানো থাকে। চেইন ঘুরতে শুরু করলে জলের ডিস্ক দ্বারা আটকা পড়ে এবং ধীরে ধীরে উপরে উঠে আসে। পৃথিবীর প্রাচীনতম চেইন পাম্প আবিষ্কার করেছিলেন আর্কিমিডিস। বহু শতাব্দী পর আল জাজারি একটি নয়, দুটি নয়, পাঁচটি ভিন্ন কৌশলের চেইন পাম্প তৈরি করলেন! তার তৈরি এই পাম্পগুলো একটি সাধারণ নাম, ‘সাকিয়া চেইন পাম্প’ নামে পরিচিত। চেইন পাম্পে ক্র্যাংকশ্যাফটের ব্যবহারও সর্বপ্রথম জাজারির যন্ত্রেই দেখা যায়। আর আধুনিক যুগের অত্যাধুনিক যন্ত্রগুলোতে প্রয়োগ করা ‘ইন্টারমিটেন্সি সিস্টেম’ এর ধারণাও প্রথম আসে জাজারির এই সাকিয়া পাম্প থেকেই। অন্যদিকে, ‘হাইড্রোপাওয়ার’ দ্বারা পরিচালিত একটি সাকিয়া পাম্পও তৈরি করেছিলেন জাজারি, যা দ্বারা জল উত্তোলনে মানুষের কায়িক পরিশ্রমের কোনো প্রয়োজন ছিল না। পুরো মধ্যযুগ জুড়ে আরবে জাজারির যন্ত্রগুলো জল উত্তোলনে ব্যবহৃত হয়েছে। সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের অনেক স্থানে এখনো এই যন্ত্র ব্যবহৃত হয়।

ইংরেজ ঐতিহাসিক ডোনাল্ড আর. হিল তার রচিত ‘স্টাডিস ইন মেডিয়েভল ইসলামিক টেকনলজি’ পুস্তকে উল্লেখ করেন : ‘ প্রকৌশলের ইতিহাসে আল-জাজারির গুরুত্বকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আধুনিক কাল পর্যন্ত আর কোনো সভ্যতা থেকে এর তুলনীয় যন্ত্রের নকশা, উৎপাদন এবং বিভিন্ন নির্দেশমালা সংবলিত তেমন কোনো রচনা পাওয়া যায়নি।

 

 

water mill

কর্ন বা ভুট্টার কল তখনকার দিনে জল বিদ্যুতের সহায়তায় চলত এমন প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে আল জাজারির বইয়ে। এটি অর্থনৈতিক জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ছিল। বলা হয়, মুসলমান প্রযুক্তিবিদরা নদী দেখলেই ভাবতেন এর থেকে কটা শস্যের কল চালাতে পারবেন। এর প্রমাণস্বরূপ বলা যেতে পারে, খুরসান(ইরান),বোখারা (উজবেকিস্তান ),ফেজ (মরক্কো), টেলমেন(আলজিরিয়া) এবং কাস্পিয়ান প্রদেশগুলিতে অসংখ্য জলের মিলের নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া ইবেরিয়ান উপদ্বীপে মিলগুলির বিস্তৃতি রয়েছে।

নদীর তীর বরাবর এই ভুট্টার কল বা শস্যের কল নির্মাণ করা হত। নদীর স্রোতের গতি বাড়ানোর জন্য একাধিক উপায় অবলম্বন করা হত। যাতে শস্যের কলে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। যেখানে সম্ভব নদীর স্রোতের ধারা বাড়াতে আংশিক বাঁধ দেওয়া হত। যেখানে পারা যেত নদীর উপর কোন সেতু থাকলে, সেই সেতুর নীচে জলের চাকা বসানো হত। এর ফলে বৃদ্ধি পাওয়া স্রোত জল বিদ্যুত উৎপাদন করত যার ফলে চলত শস্যের কল। বৃদ্ধি পেত উৎপাদন।

এছাড়াও সেই যুগের উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবন ছিল শিপ মিল। নদীর উৎস বা মোহনাতে নয়, নদীর মধ্যভাগে স্রোত ত্বরান্বীত করতে এটি ব্যবহৃত হত। শীতকালে বা শুষ্ক ঋতুতে জলের স্তর অনেক নীচে চলে যেত, ফলে জল তুলতে প্রচুর অসুবিধা দেখা দিত। এই যন্ত্রের সাহায্যে এই অসুবিধা দূর করা হত। ৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে ভূগোলবিদ ইবন হাক্বল লিখেছেন, টাইগ্রীস নদীর উপর মসুল শহরে যে শিপ মিল ছিল তা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। স্পেনের জারাগজা, মুর্সিয়া, উচ্চ সুমেরু অঞ্চলে অনেক তুলনাহীন শিপ মিল চোখে পড়ত। কাঠের তৈরি শিপ মিল উচ্চ গতির স্রোত তৈরি করত এবং এই কাঠের যন্ত্রকে লোহার চেন দিয়ে তীরের সঙ্গে বেঁধে রাখা হত। এ ধরনের শিপ মিলে চব্বিশ ঘণ্টায় ১০ টন খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব ছিল। আর সেটা ২৫ হাজার মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ছিল। ইবন হাক্বলের মতে, দশম শতাব্দীতে ইরাকের বসরায় জলবিদ্যুত ব্যাবহার করা হত। অর্থাৎ ইউরোপে প্রথম জলবিদ্যুত ব্যবহারের অন্তত একশো বছর আগে।

তলদেশের জলের এবং ভূগর্ভস্থ জলের উভয় সংস্থানকে তৎকালীন পরিশীলিত সেচ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল।  উদাহরণস্বরূপ, মুসলিম সেচ ব্যবস্থাই কিন্তু স্পেনীয় কৃষির ভিত্তি ছিল। তখনকার হাইড্রলিক্স এবং জল উত্তোলন মেশিন ১৫ শতাব্দী পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে এবং আমেরিকার টেক্সাস এবং লুইসিয়ানা অঞ্চলে আখের  ক্ষেতে ব্যবহৃত হয়েছে মুসলিম অনুপ্রাণিত প্রযুক্তি। ফ্রান্সে একাদশ এবং দ্বাদশ শতাব্দীতে প্রকৌশলীরা সেই একই প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। শুষ্ক আরব অঞ্চলে একসময় ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ খুঁড়ে জল সরবরাহ বা সেচের কাজ করা হত। তাকে বলা হত কানাত। সেই প্রযুক্তি মুসলিম বিশ্ব থেকে চিনের পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।

মুসলিম জল উদ্ভাবকদের কৃতিত্ব সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান জ্ঞান সত্ত্বেও, সম্ভবত অনেকটাই অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে এবং অনুমান করা হয় যে হাজার হাজার আরবি পাণ্ডুলিপিগুলি মধ্যপ্রাচ্যের, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার লাইব্রেরিতে জীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সেগুলি ভাষান্তরিতও করা হয়নি এবং নথিভুক্ত করা হয়নি সঠিক ভাবে। না হলে মুসলিম বিশ্বের জল ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে অনেকটাই জ্ঞানলাভ করত আধুনিক বিশ্ব।