মুসলিম যুবকরা কেন বিভ্রান্তিতে নিপতিত?

dreamstime_s_38733867

এটি অনস্বীকার্য যে, মুসলিম যুবকদের এক বিরাট অংশ বর্তমানে দিশেহারা এবং বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে এবং পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপের দিকে এগুচ্ছে। ইসলাম অনুশীলনে দুর্বলতার পাশাপাশি কিছু কিছু ক্ষেত্রে ধর্মত্যাগের প্রবণতাও বেড়ে চলেছে।

বিষয়গুলি এতটাই সূক্ষ্ম যে, যে ব্যক্তি এই রোগে আক্রান্ত সে নিজেও এ সম্পর্কে অবগত হতে পারছে না। বিষয়টি অনেকটা “নীরব ঘাতক” এর মত, যা ধীরে ধীরে বিকাশ লাভ করে এবং এর লক্ষণগুলি প্রায়শই অনুধাবন করা যায় না।

এটি খুবই দুঃখজনক যে, এই বিষয়গুলি মুসলিম যুবকদের মাঝেই বেশি দেখা যাচ্ছে। একটি সম্প্রদায়ের ভবিষ্যত যুবকদের উপর নির্ভরশীল। তাই যুবকরা যদি এরূপ বিভ্রান্তিতে নিপতিত হয় তবে সম্প্রদায়ের ভবিষ্যত যে কতটা ক্ষতির সম্মুখীন হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আজ মুসলিম যুবকের বিভ্রান্তির প্রধান কিছু কারণ ও তার প্রতিকার নিম্নরূপঃ

শিক্ষার অভাবঃ  শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। মেরুদন্ডহীন প্রাণী যেমন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না তেমনি শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। যে জাতি যতবেশী শিক্ষিত সে জাতি ততবেশী উন্নত। এই জন্য মহান আল্লাহ বিশ্ব মানবতার জন্য প্রথম যে নির্দেশনা দিয়েছেন তা হল ‘শিক্ষা’। তিনি বলেন, ‘পড়! তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন’ (আল কুরআন-৯৬:১)। এ মর্মে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘প্রত্যেক মুসলিমের উপর জ্ঞান অর্জন করা ফরয’ (ইবনু মাজাহ, মিশকাত)। অতএব প্রকৃত শিক্ষাই শক্তি, যার মাধ্যমে মানুষ সবকিছু জানতে পারে, বুঝতে পারে। প্রকৃত অর্থে জ্ঞান অর্জনের দ্বারাই মানুষ সত্য-মিথ্যার, ন্যায়-অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য করতে পারে। পক্ষান্তরে যারা লিখতে, পড়তে জানে না তারা অন্যের উপর নির্ভরশীল হয় এবং সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য করতে পারে না। ফলে অপরাধ জগতের সাথে মিশে যায় এবং তাদের মাধ্যমে নৈতিক অবক্ষয় বৃদ্ধি পায়।

ইসলামী শিক্ষার অভাবঃ ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। সকল কালের সকল মানবের জন্য যুগোপযোগী একটি জীবন বিধান। কর্মহীন শিক্ষা যেমন অবাস্তব, ধর্মহীন শিক্ষাও তেমনই ফলদায়ক নয়। কেবলমাত্র ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যেই ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তির পথনির্দেশনা রয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষাকে সংকোচন করে কখনো নৈতিক শিক্ষা আশা করা যায় না। সঠিক সময়ে সমাজের সকলকে ধর্মীয় শিক্ষা না দেয়া গেলে তাদের মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতি এবং নৈতিকতা ও নীতিবোধ জাগ্রত হ’তে পারে না। তাই ধর্মীয় শিক্ষার অভাবকে নৈতিক অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ বলা হয়।

পাশ্চাত্যের অপসংস্কৃতির অনুকরণঃ দেশের আপামর জনসাধারণ অপসংস্কৃতির অক্টোপাশে জড়িয়ে নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়ে এখন সত্যের অমোঘ বাণী হাতড়িয়ে বেড়াচ্ছে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতি, যা উদ্দম নৃত্য, সীমাহীন আনন্দ-উলস্নাস, তরুণ-তরুণীদের উষ্ণ আলীঙ্গন আর জমকালো নানা ধরনের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অতি উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে পালিত হয়। বস্ত্রহীন দেহ, অসুস্থ মানসিকতা আর যৌন উত্তেজনার চূড়ান্ত পর্যায়ের দৃশ্যবলী বহিঃপ্রকাশ পরের দিন দেশের দৈনিক পত্রিকাগুলোতে প্রথম পৃষ্ঠায় ঘটা করে প্রকাশ করা হয়। যেন বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে এটাই দেশীয় সংস্কৃতি। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন দিবসীয় সংস্কৃতি। আছে ফ্যাশন ও বিজ্ঞাপন সংস্কৃতি, যা দেখে যুবচরিত্র ধ্বংস হচ্ছে, জড়িয়ে পড়ছে নানা অশ্লীলতায়। ফলে নৈতিকতার অবক্ষয় আরো প্রকট আকার ধারণ করছে।

প্রতিকার

১. ধর্মীয় শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দান। ২. অভিভাবকদের দায়িত্ব ও সচেতনতা বৃদ্ধিসহ ছেলে-মেয়েদের ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখা। ৩. নারী-পুরুষের সহশিক্ষা বন্ধ করা। প্রয়োজনে শিফটিং পদ্ধতি চালু করা। ৪. মসজিদ ও পঞ্চায়েতগুলোতে ধর্মীয় উপদেশ ও সামাজিক শাসন বৃদ্ধি করা। ৫. ধর্ম ও সমাজ বিরোধী মেলা ও অনুষ্ঠান বন্ধ করা। ৬. বিদেশী সংস্কৃতি বর্জন করা ও বিদেশী মন্দ চ্যানেলগুলো বন্ধ করা। ৭. ইন্টারনেট ও মোবাইলের মন্দ ব্যবহারের সুযোগগুলো বন্ধ করা। ৮. সেই সাথে এমন শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলবে, যা এ মন্দ স্রোতকে বাধা দিবে এবং তার স্থলে সুস্থ স্রোত প্রবাহিত করবে।

যতদ্রুত যুবকদের মাঝে পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদিস ভিত্তিক বিশুদ্ধ আক্বীদা ও আমলের প্রচার ও প্রসার এবং মন্দ প্রতিরোধকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে গ্রহণ করা হবে, ততদ্রুত স্ব স্ব পরিবারে, সমাজে, ও রাষ্ট্রে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে ইনশাআল্লাহ। তাই আসুন! আমরা এ সমাজ ও দেশকে ভালবাসি। সকলেই মিলে নিজেদের ও ভবিষ্যত প্রজম্মের স্বার্থে একটি সুন্দর, সুখী, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধশালী সমাজ ও দেশ গঠনে সম্মিলিত ভাবে আত্মনিয়োগ করি। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন

(লেখক ড. স্পাহিক ওমর, অ্যাসোসিয়েট প্রোফেসর, ইন্টারন্যাশনাল  ইসলামিক ইউনিভার্সিটি মালেয়শিয়া)