মুসলিম সমাজে প্রতিপালনের গুরুত্ব

সমাজ ২৮ ডিসে. ২০২০ Contributor
ফোকাস
kid
Pexels - Juan pablo serrano arenas

আল্লাহর তৈরি এই দুনিয়ায় সকলের জন্য যত্ন ও ভাগ্য নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। যে শিশুর পিতা মাতা নেই, তারও যত্নের অভাব হয় না। কারোর না কারোর মনে ও গৃহে ঠিক তার জন্য স্থান থাকবে। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি এই কথা বলতে পারি।

নিজের একটা বাড়ির শখ আমার বরাবরের। তাই এই নতুন বাড়িতে এসে আমি ও আমার সন্তানরা ভীষণ খুশি হয়েছিলাম। আমার ছেলে মেয়ে সবচেয়ে আনন্দ পেয়েছিল নিজেদের ঘর পেয়ে। আমি খুশি হয়েছিলাম ইসলামি বিধান অনুসারে বাড়ির গঠন দেখে। আমরা সকলে যে যার নিজস্ব ঘর বেছে নেওয়ার পরেও একটি শোবার ঘর বাড়তি হয়েছিল।

অনাথের আশ্রয়

শুরুতে ভেবেছিলাম গেস্ট রুম বানাবো, তারপর মনে হল, এই পৃথিবীতে এমন কেউ তো রয়েছে যার হয়তো মাথার উপর ছাদও নেই ঠিকমতো। এরকম কাউকে ঐ ঘরে আশ্রয় দিলে কেমন হয়?

তখন থেকেই আমার একটি অনাথ শিশুকে প্রতিপালনের বা ফস্টারিং-এর ভাবনা চিন্তা শুরু।

এখনও আমাদের সমাজে দত্তক নেওয়াকেই সঠিকভাবে দেখা হয় না। একটি অনাথ শিশুকে হঠাৎ করে নিজের পরিবারের মধ্যে ঠাঁই দেওয়া নিয়ে অনেকেরই বেশ বিরূপ মনোভাব দেখা যায়। যুক্তি হিসাবে তাঁরা বলেন, অনাথ সে, কী তার কূল শীল পরিচয়? কে জানে তার শরীরের কোন মানুষের রক্ত বইছে। পরিচয়হীনতা অনেক ক্ষেত্রেই অনেক মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলে। প্রতিপালন বা ফস্টারিং-এর ক্ষেত্রেও তাই।

কিন্তু আমার মনে এই প্রশ্নগুলো আসেনি, আমার শুরু থেকেই মনে হয়েছিল আমার কাছে অতিরিক্ত ঘর রয়েছে। আমি একটা মানুষকে খাওয়াতে পারব। তাহলে কেন একটি অসহায় শিশুকে ভালবেসে আশ্রয় দিতে পারব না?

প্রতিপালন সম্পর্কে ইসলামে যা বলা হয়

আমি প্রথমে ইসলামে প্রতিপালন সম্পর্কে কী বলা হয় সেই নিয়ে পড়াশুনো শুরু করলাম। ইসলামে অন্য কারোর সন্তানের অভিভাবক হয়ে প্রতিপালনের অনুমতি রয়েছে। যদি কোনও অনাথ ও এতিম শিশুকে কেউ নিজের সন্তানের ন্যায় যত্ন করে বড় করে তোলে, তবে শরিয়াতে তাকে সমর্থন করা হয়।

অনেকেই দত্তক ও প্রতিপালনের মধ্যে সূক্ষ্ম যে পার্থক্য রয়েছে তা গুলিয়ে ফেলেন। দত্তকে জন্মদাতা পিতামাতার থেকে সমস্ত দায়িত্ব সরিয়ে নিয়ে তা স্থায়ী ভাবে কায়েম করা হয় দত্তক পিতামাতার উপর। এই ব্যবস্থা হয় মূলত আইনানুগ ভাবে। অপরদিকে প্রতিপালন মানে দরিদ্র পিতামাতার সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো বড় করে তোলা। অনেকক্ষেত্রে অনাথ শিশুকেও বড় করে তোলা হয়। দত্তক স্থায়ী ব্যবস্থা, প্রতিপালন অস্থায়ী। আমি ফস্টার পেরেন্ট, অর্থাৎ পালক-অভিভাবক হতে চেয়েছিলাম।

কুরআন-হাদিসের আলোকে

আমি বিশদে কুরআন পড়ে জানতে পারলাম, আল্লা’তালা বলেছেন,

তোমরা তোমাদের মুখমন্ডল পূর্ব বা পশ্চিম দিকে প্রত্যাবর্তিত করলেই তাতে পুণ্য নেই, বরং পুণ্য তার যে ব্যক্তি আল্লাহ, আখিরাত, মালাইকা/ফেরেশতা, কিতাব ও নাবীগণের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাঁরই প্রেমে ধন-সম্পদের প্রতি আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও সে তা আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, দরিদ্র, পথিক ও ভিক্ষুকদেরকে এবং দাসত্ব মোচনের জন্য ব্যয় করে, আর সালাত প্রতিষ্ঠিত করে ও যাকাত প্রদান করে এবং অঙ্গীকার করলে তা পূরণ করে এবং যারা অভাবে ও ক্লেশে এবং যুদ্ধকালে ধৈর্যশীল তারাই সত্য পরায়ণ এবং তারাই ধর্মভীরু। [কুরআন অধ্যায় ২, স্তবক ১৭৭]

তারপর আমি এক শেখের কাছ থেকে এই বিষয়ে উপদেশ চাইতে গেলাম। তিনি আমাকে জানালেন, আমি যদি শিশুটিকে নিজের পদবী না গ্রহণ করাই, শিশুটি যদি পূর্ব পরিচয়েই আমার কাছে বড় হয়ে ওঠে তাহলে এটি একেবারেই শরিয়া বিরোধী নয়। বরং আমাদের মহান নবী সবসময় প্রতিপালনের সমর্থনে উৎসাহ দিয়ে এসেছেন,

সাহল বিন সাদ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন,

‘আমি ও এতিম প্রতিপালনকারী জান্নাতে এভাবে থাকব (তিনি তর্জনী ও মধ্য অঙ্গুলি দিয়ে ইঙ্গিত করেন। এবং এ দুটির মধ্যে তিনি সামান্য ফাঁক করেন)।’ [বুখারি, হাদিস : ৫৩০৪]

এরপর আমার প্রতিপালনের ইচ্ছে পরিপূরণের কোনও অসুবিধা হয়নি। আমি সহজেই একটি শিশুর দায়িত্ব নিয়ে তাকে বড় করে তুলছি।

ব্রিটেনে প্রতিপালনের নিয়ম অন্যান্য দেশের থেকে খানিকটা আলাদা, সেই বিষয়ে কতগুলি পরামর্শ রইল-

প্রতিপালনের নিয়ম সম্পর্ক অবগত হোন

প্রতিপালক ও অভিভাবক হওয়ার জন্য এদেশে বেশ গুরুতর কিছু নিয়মের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু সেই নিয়ম যদি যথার্থ ভাবে পালন করা হয় তাহলে তার থেকে যে মানসিক শান্তি পাওয়া যায় তা অতুলনীয়। অনেকেই মনে করেন ফস্টারিং করার মাধ্যমে হয়তো খানিকটা বেশ ওয়েলফেয়ার পাওয়া যাবে। কিন্তু আদতে ফস্টারিং তা নয়। যখন রাতে ঘুমন্ত শিশুর মুখ দেখবেন, আপনার নিজের মনের শান্তির কোনও সীমা পরিসীমা থাকবে না।

নিজের পরিবারকে আগাম জানান ও মানসিকভাবে তৈরি করুন

আপনার সন্তানদের সঙ্গে কথা বলুন। তাদের কিছু না জানিয়ে হঠাৎ করে প্রতিপালনের জন্য একটি শিশুকে বাড়িতে আনলে দুই তরফেই মানসিক অশান্তি শুরু হতে পারে। সন্তানদের জানান তাদের একটি ভাই/ বোন/ বন্ধু আসবে। তাদের শেখান ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ। আলহামদুলিল্লাহ, দেখবেন, আপনার বৃহৎ পরিবার আনন্দের সঙ্গে মেনে নেবে আপনার সব সন্তান।

যে শিশুটিকে প্রতিপালন করছেন তাকে গুরুত্ব দিন

আপনি একটি শিশুকে আশ্রয় দিয়েছেন মানেই আপনি তার উপর যা ইচ্ছে তাই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারেন না। সেও মানুষ। তার ইচ্ছে অনিচ্ছের মূল্যও আপনাকে দিতে হবে। সে কী খেতে চাইছে, কী পড়তে চাইছে সব বিষয়ে আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে। মনে রাখবেন, যত্ন, ভালবাসা ও সহমর্মিতার কোনও বিকল্প নেই।

ব্যবহার জনিত সমস্যার জন্য প্রস্তুত হোন

অনেকক্ষেত্রেই যে সমস্ত শিশুকে প্রতিপালনের জন্য দেওয়া হয় তারা জীবনে বহু ঝড়ের সম্মুখীন হয় ছোট থেকেই। দারিদ্র্য, অত্যাচারী পিতামাতা, যৌন হেনস্থা, ভয়, অনিরাপত্তা প্রভৃতি। সেই জন্য তাদের ব্যবহার অস্বাভাবিক হয়। কেউ ভীষণ চুপচাপ, চাপা। কেউ উত্তেজিত, সহজে রেগে যায়। কারোর মুখের ভাষা আবার খুবই খারাপ থাকে।

এই সমস্ত বিষয় আপনাকে শান্তভাবে ধৈর্যের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। মনে রাখবেন, চূড়ান্ত অনিরাপত্তা থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে এসে অনেকসময়ই তারা বিশ্বাস করে উঠতে পারে না তাদের সঙ্গে ভাল কিছু হচ্ছে। আপনাকে কিন্তু শিশুটির বন্ধু হয়ে উঠতে হবে।

নিজের পছন্দসই শিশুকে প্রতিপালনের নিয়ম নেই

যদিও সোশ্যাল সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট আপ্রাণ চেষ্টা করে একই ব্যাকগ্রাউন্ডের শিশুকে প্রতিপালনের জন্য দিতে, কিন্তু অনেকক্ষেত্রেই সেটা সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে একটু খেয়াল রেখে চলতে হবে। একবার আমার প্রতিপালনে একটি অমুসলমান ছেলে বড় হয়ে উঠছিল। সে রোজ আমার নমাজ আদায় করা দেখে নিজে নিজে অনুকরণ করার চেষ্টা করত। আমি কিন্তু সোশ্যাল সার্ভিস ডিপার্টমেন্টকে সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি জানিয়েছিলাম।

আমাকে অনেকেই প্রশ্ন করেন, আমি ধর্মে মুসলমান হওয়ায় আমার পক্ষে মুসলমান শিশুর প্রতিপালন বেশি সহজ কিনা। আমি উত্তর দিই, শিশুর একটাই পরিচয়। সে শিশু, সে আল্লাহর উপহার।

মুসলিম উম্মাহ তে প্রতিপালনের গুরুত্ব

এই চরম বিপদের সময় সমস্ত মুসলমান ভাই বেরাদরের উচিত তাদের অন্যান্য মুসলমান ভাই বেরাদরকে সাহায্য করা। প্রয়োজনে দরিদ্র ভাইয়ের সন্তানকে নিজের মতো করে প্রতিপালন করা। এভাবেই আমাদের মধ্যে প্রকৃত বন্ধন গড়ে উঠবে যা আমাদের মহান নবী ও আল্লাহ সবসময় নির্দেশ করে গিয়েছেন।