SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

মুহাম্মদ আবদুহ: মিশরে ইসলামী রেনেসাঁর পথপ্রদর্শক

বিখ্যাত ২৮ জানু. ২০২১
জানা-অজানা
মুহাম্মদ আবদুহ

১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ আবদুহ নামে একজন মিশরীয় ইসলামী তাত্ত্বিক, সাংবাদিক এবং উদারপন্থী বুদ্ধিজীবি। মিশরের নীলনদ অববাহিকায় একজন তুর্কি পিতার ঔরসে এবং মিশরীয় মাতার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইসলামী আধুনিকতাবাদের মূল তাত্ত্বিকদের মধ্যে অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক হিসেবে বিবেচিত হন।

মুহাম্মদ আবদুহ-র ইলম অর্জন

১৩ বছর বয়সে তাকে তানতার আহমদী মসজিদ সংলগ্ন মাদ্রাসায় ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। কিন্তু এখানে প্রচলিত শিক্ষা গ্রহণের প্রাচীন পদ্ধতির সাথে তিনি নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে অসমর্থ হন। এখানে শিক্ষার্থীরা বিভিন্নরকম গ্রন্থ কোনো রকম বোধগম্যতা ছাড়াই শুধু মুখস্ত করে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণ করত। এই অভিজ্ঞতা থেকেই পরবর্তীতে শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কারের জন্য তিনি অনুপ্রেরণা পেয়েছেন।

১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে গমন করেন। এবং সেখানে তার শিক্ষক সাইয়্যেদ জামালুদ্দীন আফগানীর দ্বারা তিনি ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন। সাইয়্যেদ জামালুদ্দীন আফগানী ছিলেন প্যান-ইসলামীজম আন্দোলনের মূল পথিকৃত। যে আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল সকল মুসলিম ভূখন্ডসমূহকে একই বিশ্বাসের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ করা। জামালুদ্দীন আফগানীই তাঁকে প্রথম ইসলামী স্বর্ণযুগের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন।

মুহাম্মদ আবদুহ-র সংস্কার আন্দোলনের সূচনা

মুহাম্মদ আবদুহ জামালুদ্দীন আফগানীর কর্মপ্রেরণা থেকে অনুপ্রেণীত হন এবং ঔপনিবেশকতার অভিশাপ থেকে মুসলিম সমাজকে মুক্ত করে ইসলামী রেনেসাঁর সূচনার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তার এই সংস্কার আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল ইসলাম সম্পর্কে তৎকালীন যুগে প্রচলিত বিভিন্ন বদ্ধমূল ধারণা ও হীনমন্যতার অবসান ঘটানো। ইসলামের মৌলিক আদর্শের সাথে তিনি পশ্চিমা সভ্যতার চর্চিত জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমন্বয় সাধনের প্রয়াস চালান। যদিও তার এই প্রয়াস তৎকালীন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদের দ্বারা চরমভাবে সমালোচিত হয়; তথাপি তার এই সংস্কারমূলক চিন্তার প্রতিফলন ঘটে পরবর্তীতে আরব ও মুসলিম বিশ্বে বিভিন্ন প্রকার সংস্কার আন্দোলনের সূচনা হয়।

মুহাম্মদ আবদুহ দুটি প্রধান মুসলিম সম্প্রদায়, শিয়া ও সুন্নীদের মধ্যকার যাবতীয় বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে তাদের মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার উপর গুরুত্বারোপ করেন। এর পাশাপাশি ইসলামের বিভিন্ন সম্প্রদায় ও মাযহাবের অনুসারীদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়াস চালান।

ইসলামী ও পাশ্চাত্য মূল্যবোধ

পশ্চিমা বিশ্বের সাথে মুহাম্মদ আবদুহর সম্পর্ক ছিল পছন্দ এবং ঘৃণার সংমিশ্রণ। তিনি পশ্চিমা ঔপনিবেশিক মনোভাব এবং মিশরে ব্রিটিশ দখলদারিত্বের প্রচন্ড বিরোধী ছিলেন। তথাপি তিনি ছিলেন পশ্চিমা স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের মূল্যবোধের গুনগ্রাহী।

১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে মিশরীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তার সমর্থনের কারণে মিশর শাসনকারী ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাকে মিশর ত্যাগে বাধ্য করে। এসময় তিনি উসমানী শাসনাধীন লেবানন এবং ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে অবস্থান করেন। এই নির্বাসনকালীন সময়টিতে তিনি পশ্চিমা সভ্যতা ও মূল্যবোধ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ পান। তার মতে, পাশ্চাত্য সভ্যতার মৌলিক মূল্যবোধ সমূহ যথা বাকস্বাধীনতা, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের ধারণা সম্পূর্ণরূপে বৈশ্বিক এবং তার সাথে ইসলামের কোনো সংঘর্ষ নেই।

শিক্ষায় সংস্কার

মুহাম্মদ আবদুহের লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষকে শিক্ষা সংস্কারের গুরুত্ব উপলব্ধি করানো এবং শিক্ষার উপকারিতা এবং অজ্ঞতার বিপদ সম্পর্কে তাদেরকে সচেতন করানো। একারণে পাশ্চাত্য সভ্যতার উন্নতির পিছনে জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভূমিকা তিনি চিত্রিত করেন এবং মুসলমানদের উন্নতির জন্য তার গুরুত্ব সম্পর্কে মত প্রকাশ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষকে শুধু একটি বদ্ধমূল ধারণায় আবদ্ধ হয়ে থাকার জন্য সৃষ্টি করা হয়নি, বরং তাকে চলার পথে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যই জ্ঞান দান করা হয়েছে। এ লক্ষ্যেই তিনি তৎকালীন মুখস্তনির্ভর পাঠক্রম পরিবর্তন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কারণ, শিক্ষার্থীদের জন্য তুলনামূলক আলোচনা এবং বিচার-বিশ্লেষণের কোনো সুযোগ মুখস্তবিদ্যায় থাকে না।

নারীর অধিকার আদায়ে মুহাম্মদ আবদুহ

নারীদের মৌলিক অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন উচ্চকন্ঠী। নারীদেরকে যথার্থ শিক্ষার অধিকার প্রদানের জন্য তিনি প্রচারণা চালান। তিনি বলেন, অধিকার ও দায়িত্ব আদায়ের দিক থেকে নারী-পুরুষ উভয়েই সমপর্যায়ের এবং আবেগ-অনুভূতি, চিন্তা-ভাবনা ও বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও তারা উভয়েই সমান।

তবে নারীদের অধিকার আদায়ের আলোচনায় পাশ্চাত্যের নারীবাদের সাথে ইসলামের পার্থক্যের কথাও তিনি তুলে ধরেন। এক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহকে ভিত্তি করে তিনি তার আলোচনায় অগ্রসর হন। নারী-পুরুষের আইনী অধিকার ও দায়িত্ব বন্টনের বিষয়ে তিনি বিভিন্ন পর্যালোচনা করে গ্রন্থ রচনা করেন।

ইজতিহাদ

ইজতিহাদ হল ফিকহ তথা ইসলামী আইন শাস্ত্রের একটি বিশেষ পরিভাষা; যা ইসলামী আইনের বিভিন্ন উৎস তথা কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞদের নিজস্ব, স্বাধীন মতামতকে নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়। বস্তুতঃ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে অনুসন্ধানের বিষয়ে মতামত দেওয়ার পূর্বে প্রচেষ্টা চালানোকে ইজতিহাদ বলে অবহিত করা হয়।

প্রাথমিক যুগের মুসলিম সমাজে সকল যোগ্য ব্যক্তিই নিজস্ব চিন্তাভাবনার প্রেক্ষিতে ইজতিহাদ করতেন। যারা ইজতিহাদ করে মত প্রদান করতেন, তাদেরকে মুজতাহিদ নামে ডাকা হত। কিন্তু আব্বাসীয় শাসনামলে প্রধান চারটি মাযহাবের প্রাতিষ্ঠার প্রেক্ষিতে নতুন করে ইজতিহাদের অনুশীলন থেমে যায় এবং কোনো বিশেষজ্ঞও এক্ষেত্রে নতুন করে গবেষণায় অগ্রসর হতেন না।

মুহাম্মদ আবদুহ এ সময় ইজতিহাদের গুরুত্ব সম্পর্কে প্রচারণা চালান। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানবজীবনের জন্য ইজতিহাদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করতেন, সংস্কৃতি, সাংস্কৃতিক রীতিনীতি, ঐতিহ্য ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন প্রকার হওয়ায় তা স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তিত হতে পারে। এ সকল বিষয় সম্পর্কে আলোচনার জন্য ইজতিহাদের প্রয়োজনীয়তা তিনি তুলে ধরেন।

তিনি বিশ্বাস করতেন, স্বাধীন চিন্তা-ভাবনা ও ইজতিহাদের চর্চার মাধ্যমেই মুসলিম বিশ্ব উন্নতি ও জ্ঞান চর্চার বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে, প্রাথমিক যুগে যার অনুশীলনের কারণেই মুসলমানরা বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল।

মৃত্যু

ইসলামী শিক্ষা ও চিন্তার জগতে তার সংস্কারমূলক এ সকল কার্যক্রমে বর্তমানকালের মুসলিম চিন্তাবিদরাও অনেকটাই প্রভাবিত। বিংশ শতাব্দীর মুসলিম চিন্তাজগতের সংস্কারের অগ্রপথিক এই চিন্তাবিদ ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই জুলাই মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় ইন্তেকাল করেন। বিংশ শতাব্দীতে মুসলমানদের চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে তার সংস্কারমূলক কারযক্রমসমূহ মুসলিম জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে তাকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।