মূসা (আঃ)-এর জীবনী থেকে কিছু শিক্ষা

কুরআনে নবীগণের কাহিনী ২টি উদ্দেশ্যে আলোচনা করা হয়। মুসলমানদের ঐতিহাসিক তথ্য সম্পর্ক জানাতে এবং নবীদের জীবনী থেকে শিক্ষা নিতে।

মূসা(আঃ) এর জীবনী ও দাওয়াতি কার্যক্রম থেকে আমাদের জন্য অসংখ্য উপদেশ ও শিক্ষনীয় বিষয় রয়েছে। সেগুলি সম্পর্কে সংক্ষেপে নিম্নে আলোচনা করা হলঃ

নম্র ও উত্তম ব্যবহার

ইসলামী দাওয়াতের ক্ষেত্রে এ গুণটির গুরুত্ব অপরিসীম। নম্রতা দা’ঈকে দাওয়াত শ্রবণকারীর নিকটতম করে দেয় এবং তাদেরকে দ্বীন গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। নূহ(আঃ), মূসা(আঃ) সহ আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এ গুণের প্রকৃষ্ট উদাহরণ ছিলেন। পবিত্র কুরআনে এসেছে,

“সুতরাং আল্লাহর পরম অনুগ্রহ যে তুমি তাদের উপর দয়ার্দ্র রয়েছ, এবং যদি তুমি রূঢ় মেজাজ ও কঠিন হৃদয় হতে তবে অবশ্যই তারা তোমার নিকট হতে সরে যেত। সুতরাং তাদের দোষ ক্ষমা কর এবং আল্লাহর কাছে তাদের গুনাহের জন্য ক্ষমা চাও এবং কাজ-কর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ কর, অতঃপর যখন (কোন ব্যাপারে) সংকল্পবদ্ধ হও, তখন আল্লাহরই প্রতি ভরসা কর; নিশ্চয় আল্লাহ ভরসাকারীদেরকে পছন্দ করেন।”(আল কুরআন-৩:১৫৯)

সুস্পষ্ট বক্তৃতা  ও বিবৃতি দান

দাওয়াতের ক্ষেত্রে বক্তৃতা ও বিবৃতি চুম্বকের ন্যায় মানুষকে আকৃষ্ট করে। সুস্পষ্ট বক্তৃতা মানুষের হৃদয়ে জাদুর ন্যায় প্রভাব ফেলে। কর্কশ ও কঠোর হৃদয়ও নম্র, ভদ্র, শালীন ও হকের উপদেশ গ্রহণে উপযোগী হয়ে ওঠে। যেমনটি মুসা(আঃ) ও ফের’আউন এবং তার সম্প্রদায়ের মাঝে দেখা যায়।

উৎসাহ ও ভীতিসঞ্চার উভয়ের মাঝে সমন্বয় সাধন

দাঈ মানুষকে সৎকাজের দিকে আহ্বান করার পাশাপাশি সকল প্রকার অন্যায়-অবিচার, পাপ-পংকিলতা প্রভৃতি গর্হিত কাজ থেকেও সতর্কতা প্রদর্শনমূলক ভীতি সঞ্চারে উদ্বুদ্ধ হবে। তাহলেই দাওয়াত পূর্ণরূপে কার্যকর হবে। প্রত্যকে নবী মানুষকে আল্লাহর পুরস্কার ঘোষণার পাশাপাশি তাঁর শাস্তির কথাও স্ব-স্ব জাতিকে জানিয়েছেন।

সর্বোত্তম পন্থায় বিরোধীদের বক্তব্য খণ্ডন

এটি হিকমতের নামান্তর এবং ইসলামী দাওয়াত প্রচারের অত্যন্ত কার্যকর একটি পন্থা। মূসা(আঃ) বিরোধীদের যাবতীয় বক্তব্যকে অসার ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করার নিমিত্তে সর্বোত্তম পন্থায় তাদের সাথে যুক্তি-তর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন। আজকেও যারা ইসলামের বিরোধিতায় লিপ্ত হয় তাদের বক্তব্যকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য দাঈদের জ্ঞানের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের মাধ্যমে সর্বোত্তম পন্থায় তার উত্তর প্রদানে সচেষ্ট হতে হবে। এ মর্মে আল্লাহ বলেন, “জ্ঞান-বুদ্ধি আর উত্তম উপদেশের মাধ্যমে প্রতিপালকের পথে আহবান জানাও আর লোকেদের সাথে বিতর্ক কর উত্তম পন্থায়।”(আল কুরআন-১৬:১২৫)

অনুকুল প্রতিকূল সর্বাবস্থায় দ্বীনে হকের উপর অবিচল থাকা

একজন দাঈ দাওয়াতের ক্ষেত্রে যেমনি হিকমতের অবলম্বন করবে, তেমনি অনুকূল, প্রতিকূল সর্বাবস্থায় সত্য দ্বীনের উপর অটল ও অবিচল থাকবে। এক্ষেত্রে অত্যাচারী শাসকের অত্যাচার এ হুমকির ফলে সত্যপথ থেকে বিচ্যুত হবে না। মূসা আ’লাইহিস সালাম জন্ম থেকেই প্রতিকূল অবস্থায় দিনাতিপাত করে পূর্ণাঙ্গ মানুষে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। তবুও এক মুহুর্তের জন্যও তিনি সত্যদ্বীন থেকে বিমূখ হয়ে যান নি। ঘোর শত্রু

ফের’আউনের গৃহে আল্লাহ তাঁকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। অতএব, মহান আল্লাহর নিকট সর্বাস্থায় সাহায্য ও আশ্রয় প্রত্যাশার মাধ্যমে সত্য ও সঠিক পথে অবিচল থাকা সম্ভব।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ শোন।ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্যে আছে তোমরা দাবী কর। এটা ক্ষমাশীল করুনাময়ের পক্ষ থেকে সাদর আপ্যায়ন।” (আল কুরআন-৪১:৩০-৩২)

পরিশেষে বলা যায় যে, মূসা(আঃ) একজন বড়মাপের দাঈ ও মুজাহিদ ছিলেন। একজন দাঈ ইলাল্লাহ হিসেবে তিনি অসংখ্য গুণের আধার ছিলেন। অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পৃথিবীতে আগমন করেও যিনি সারাজীবন দ্বীনে হকের উপর অবিচল থাকার অভিপ্রায় নিয়ে মানুষকে যাবতীয় যুলুম নির্যাতন হতে রক্ষা করে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ইসলামী দাওয়াতকে মানুষের মাঝে তুলে ধরার জন্য তিনি স্থান, কাল, পাত্র ভেদে বিভিন্ন হিকমতপূর্ণ কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। এমনকি, দাওয়াতকে ফলপ্রসূ করার নিমিত্তে আল্লাহর সাহায্য ও তাঁর প্রতি পূর্ণ নির্ভর হওয়ার পাশাপাশি সমসাময়িক যুগশ্রেষ্ঠ উপকরণ ব্যবহার করতেও দ্বিধা করেননি। আল্লাহ তাঁর সাথে সরাসরি কথা বলে তাঁকে মর্যাদাবান করেছেন। অতএব, আজকের যুগেও কেউ যদি এই আদর্শ ও পন্থা বেছে দাওয়াতি কাজ আঞ্জাম দেয়, তবে তা একটি বিপ্লব সৃষ্টি করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।