মেক্সিকোতে ধীর ছন্দে ছড়িয়ে পড়ছে ইসলামের বাণী

আমেরিকা Contributor
জানা-অজানা
মেক্সিকোতে
Zocalo Square and Mexico City Cathedral - Mexico City, Mexico © Diego Grandi | Dreamstime.com

উত্তর আমেরিকার দক্ষিণতম দেশ হল মেক্সিকো। প্রশান্ত মহাসাগর দ্বারা বেষ্টিত মেক্সিকোতে রোমান ক্যাথলিক ধর্মের রমরমা থাকলেও চোরাস্রোতের মতো নিজের জায়গা করে নিচ্ছে ইসলাম। সম্প্রতি প্রকাশিত এক পরিসংখ্যানে জানা যায় দেশটিতে ২৫০০০ জনের বেশ মুসলমান বাস করেন, মোট জনসংখ্যার যা ০.০২ শতাংশ। তবে, সুখবর এটাই এই সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

‘বছর কুড়ি আগেও মেক্সিকোর ইসলাম ধর্মাবলম্বি মানুষেরা নমাজ পড়ার জন্য নিজেদের বাড়ি ছাড়া আর কোনও জায়গা খুঁজে পেতেন না। কিন্তু এখন, সেই অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। শুধু তাই নয়, ইসলামের প্রসার ঘটছে অত্যন্ত দ্রুতভাবেই।’ মৃদু হেসে আমাদের জানালেন লৌহাবি। মরক্কো থেকে ১৯৯৪ সালে মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেছেন তিনি।

তাঁর কাছ থেকেই জানা গেল, ১৯৯৪ সালে যখন লৌহাবির মতো আরও অনেক ইসলাম ধর্মাবলম্বি মানুষকে পাকিস্তানের দূতাবাসে সমস্ত ইসলাম সম্পর্কিত উৎসব ও অর্চনা পালন করতে হত। তৎকালীন মেক্সিকোতে না ছিল একটি মসজিদ, না ছিল কোনও ইসলামী কেন্দ্র বা মাদ্রাসা।

‘আমি এ শহরে পা রেখেই উপাসনার জন্য মসজিদের অন্বেষণ করতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু তখন এ শহরে কেন, মেক্সিকোর কোথাওই কোনও মসজিদ ছিল না। আমরা তখন পাকিস্তানের দূতাবাসে সমবেত হয়ে নমাজ আদায় করতাম। আমরা ছিলামও অবশ্য মাত্র ৮০ জন।’ স্মৃতির অতল থেকে যেন কথাগুলো তুলে আনছিলেন পেশায় স্কুল শিক্ষক লৌহাবি।

বর্তমানে, শতাধিক মুসলমান ভাইয়ের পাশে বসে নমাজ আদায় থেকে ঈদ পালন সমস্তকিছুই করতে পারেন তিনি। মেক্সিকো সিটির আঞ্জুরেস এলাকায় তিন তলা উচ্চতাবিশিষ্ট সুসজ্জিত মুসলিম কমিউনিটি এডুকেশনার সেন্টার তাঁদের এই সুবিধা করে দিয়েছে। প্রতি জুমাবারে আরবি ও স্প্যানিশে আধান উচ্চারিত হয় এই সেন্টারে।

ইসলামের প্রচারে ইন্টারনেটের প্রভাব

আনন্দের ব্যাপার হল, এই কমিউনিটি সেন্টারে অন্যান্য দেশ থেকে আসা মুসলমান যেমন রয়েছে সেরকম মেক্সিক্যান মুসলমানও হয়েছে। লৌহাবি জানালেন, গত দশ বছরে এ দেশের সাধারণ মানুষ আস্তে-আস্তে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। ফলে, প্রচুর মেক্সিক্যান ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। সবচেয়ে বেশি ইসলামীকরণ দেখা গিয়েছে উপজাতীয় মানুষদের মধ্যে।

স্থানীয় মুসলমানদের ধারণা, কুখ্যাত ৯/১১ এর বিস্ফোরণ ও ইন্টারনেটের প্রসারের ফলেই মেক্সিকোর মানুষদের মধ্যে ইসলামের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।

‘আসলে ওয়র্ল্ড ট্রেড সেন্টারের বিস্ফোরণের পর মানুষ আমাদের ধর্ম নিয়ে ইন্টারনেটে খোঁজাখুঁজি শুরু করে। প্রথমে অবশ্য ইসলাম মানেই সন্তাসবাদ কিনা সেই নিয়ে মানুষের কৌতূহল ছিল বেশি। কিন্তু ক্রমশ মানুষ বুঝতে পারে যে আমাদের ধর্ম আসলে শান্তির বাণী প্রচার করে। জিহাদ আসলে সম্পুর্ণ অন্য জিনিস। ইসলাম আসলেই সন্তাসবাদের বিরুদ্ধে। সেইখান থেকেই মানুষের ইসলামের প্রতি আকর্ষণ শুরু।’ জানালেন অ্যালেক্সান্ডার হাটন্স, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর যিনি নাম নিয়েছেন আহমেদ আব্বাস। পেশায় পাইলট আব্বাস আরও জানালেন তিনিও প্রথমে ইন্টারনেট থেকেই ইসলাম ও কুরআন সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন। তারপর ইসলামী পণ্ডিতদের বই পত্র পড়ে তিনি ইসলামের প্রেমে পড়ে যান।

একই কথা বললেন ওমর রেমি। ‘আল্লাহ খুব অদ্ভুতভাবে আমাদের জীবনে রহমত বর্ষণ করেন।’ জানালেন তিনি, ‘ইন্টারনেট অত্যন্ত প্রভাবশালী নতুন প্রজন্মের কাছে, আর সেই ইন্টারনেটের মাধ্যমেই ইসলাম ছড়িয়ে পড়ছে মেক্সিকোর প্রতিটি মানুষের কাছে।’

১৯৭৯ সালে মিশরে গিয়েছিলেন, সেখান থেকেই ইসলামের প্রতি তাঁর আকর্ষণ। বর্তমানে মেক্সিকোর কমিউনিটি সেন্টারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করছেন ওমর।

বৈচিত্র্যের মধ্যে ইসলামী ঐক্য

যদিও গত কয়েক বছরে ইসলামের প্রভাব ও প্রসার বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু আদতে মেক্সিকোতে ইসলামের পা রাখা কিন্তু বহু আগে। যখন স্পেনীয়দের দখলে ছিল এই দেশ, তখন থেকেই ইসলামের প্রসার শুরু।

‘ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলির মধ্যে শুধু মেক্সিকোতে নয়, প্রায় সমস্ত দেশেই স্পেনীয়রা ইসলাম ধর্মের বীজ প্রোথিত করেছিল।’ ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনের প্রোফেসর জিদান জেরাউই আল আওয়াদ এরকমই মনে করেন। তবে তিনি আরও জানিয়েছেন, এ দেশে ইসলাম মূলত প্রসারিত হচ্ছে ধর্মান্তরণের মাধ্যমে।

মেক্সিকোর মুসলমান সম্প্রদায় আসলেই বেশ বৈচিত্র্যময়। একদিকে যেমন অন্যান্য দেশ থেকে আসা ইসলাম ধর্মাবলম্বি মানুষ রয়েছেন , সেরকমই ধর্মান্তরিত নব্য মুসলমানও রয়েছেন। এঁদের মধ্যে বিখ্যাত হল মার্ক ওমর ওয়েস্টন। বিশ্বখ্যাত এই ওয়াটার-স্কিয়ার বর্তমানে মেক্সিকোর মোরেলোতে একটি ইসলামী কমিউনিটি সেন্টার ও হোটেল পরিচালনা করেন।

‘প্রাচীন মুসলমান ও নব্য ধর্মান্তরিত মুসলমানদের মধ্যে সাংস্কৃতিক ভাবে খানিক তফাত রয়েছে। নব্য মুসলমানরা অনেক বেশি কৌতূহলী, তাঁদের কাছে এ যেন এক নতুন জিনিস, নতুন জীবনবোধ।’ ওমর খোলাখুলি জানালেন। ‘আমার মতে, শিক্ষার হার যত বৃদ্ধি পাবে, মানুষ তত এই শান্তিপূর্ণ ধর্মের প্রতিই ঝুঁকবে।’

মেক্সিকোতে মুসলমানদের সংখ্যা

মেক্সিকো সরকারের প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে জানা যায় দেশে বর্তমানে ৩৭০০ জন ইসলাম ধর্মাবলম্বি মানুষ রয়েছেন। আসল সংখ্যা কিন্তু প্রায় ২৫০০০-এর উপরে। ওয়াশিংটনের পিউ ফোরাম অন্য রিলিজিন অ্যান্ড পাবলিক লাইফ-এর সমীক্ষা অনুসারে মেক্সিকোতে ১,১০,০০০-এর কাছাকাছি ইসলাম ধর্মের মানুষ রয়েছে।

‘এই সংখ্যা আরও বাড়বে, কারণ মানুষ ইসলামের মর্ম সবে বুঝতে শুরু করেছে।’ সহাস্যে জানালেন লুই লেহ ফ্রায়াস। সম্প্রতি তিনিও সপরিবারে ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তাঁর নতুন নাম হয়েছে লোকমান ইদ্রিস।

মহান আল্লাহ ঠিক এভাবেই শান্তির পথে আমাদের উম্মাহর প্রসার চেয়েছিলেন, আজ তাঁরই রহমতে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে পড়ছে ইসলাম।

Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.
Enjoy Ali Huda! Exclusive for your kids.