মেদ ঝরাতে কী নির্দেশ দিয়েছেন রাসুল (সা:)

পৃথিবীতে এমন কিছু রোগ আছে যা করোনার মতো অতিমারীর চেয়ে কোনো অংশে কম যায় না অথচ সেগুলোকে আমরা পাত্তাও দিইনা। এরকমই একটা শারীরিক সমস্যার নাম মেদবহুলতা বা সহজ ভাষায় অত্যাধিক চর্বির সমাগম। আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলিতে এই সমস্যা প্রতিবছর ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই রকম ভাবে এই সমস্যা বিস্তার করেছে ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতিতেও। এর কারণ হিসাবে বলা যেতে পারে প্রচুর পরিমাণে জাঙ্ক ফুড খাওয়া, শরীরের নাড়াচাড়া না হওয়া ইত্যাদি কারণে। এই অত্যাধিক মেদ থেকে হওয়া রোগের সংখ্যা নেহাত কম না; সুগার, ডায়াবেটিস, রক্তচাপ বৃদ্ধি, আর্থ্রাইটিস এমনকি ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে অত্যাধিক মেদ বা ওবেসিটি থেকে।

আজকের দিনে এই অত্যাধিক মেদের হাত থেকে রক্ষা পেতে একটি বিশেষ ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। রেডিক্যাল ব্যারিয়াট্রিক সার্জারি নামক এই সার্জারির মাধ্যমে অতিরিক্ত মেদকে শরীর থেকে বাদ দিয়ে মেদাক্রান্ত মানুষদের সুস্থ করা হয়। যদিও এ ব্যবস্থা যেমন খরচ সাপেক্ষ তেমনই অসুরক্ষিত।

এই অত্যাধিক মেদ বা ওবেসিটির হাত থেকে বাঁচার উপায় বহুদিন আগেই রাসুল (সা:) ব্যাখ্যা করে গেছেন। তাঁর নির্দেশে বলেছেন প্রতিটি মানুষকেই একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ খাদ্যাভাস তৈরি করার কথা। তাঁর মত অনুযায়ী, অতিরিক্ত খাদ্য আমাদের শরীরকে অসমর্থ ও নিশ্চল করে দেয়, এবং এর প্রভাব শুধুমাত্র ব্যক্তিজীবন নয় সমাজের উপরেও পরে।

রাসুল (সা:) বলেন অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণের থেকে বেশি সমস্যা আর কোনো কিছুতে হয় না। যখন মানুষ মাত্র কয়েকটি দানা খেয়েই দিনের পর দিন সাবলীল ভাবে দিন কাটাতে পারে, তাহলে অতিরিক্ত খাবার কোনো প্রয়োজন নেই। একজন মানুষের স্বাভাবিক খাদ্যতালিকায় থাকা উচিৎ এক-তৃতিয়াংশ খাদ্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয় এবং এক-তৃতীয়াংশ শুধু বাতাস।

এর থেকেই বোঝা যায় ইসলামে স্বাস্থ্যসচেতনতার মতো সংবেদনশীল বিষয়েও বিশদ তথ্য পাওয়া যায়। অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণের বিষয়ে হাদিসের প্রথম অংশে বলা হয়েছে, এখানে এর খারাপ দিকগুলোর বিশেষ বিবরণ পাওয়া যায়। অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণ শুধুমাত্র স্বাস্থ্য নয় আমাদের ঈমানের উপরেও হানা দেয়। যদিও প্রতিটা মানুষের শরীরের গঠন ও আভ্যন্তরীণ কার্যপ্রক্রিয়া আলাদা তাও একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে বেশি খাওয়া উচিত নয়। এর প্রধান কারণ হিসাবে বলা যেতে পারে, শরীরের থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়ার উদ্দেশ্য খেলে তা অত্যধিক খাওয়া হয়ে যাবে, কারণ শরীর ঠিক করতে পারে না কতটা খাওয়া উচিত। তাই শরীরের প্রয়োজনীয়তাটা নিজে ঠিক করাই ভালো।

আমাদের খাদ্যের মধ্যে থাকা উপদান যেমন প্রোটিন, ভিটামিন, শর্করার সাথে থাকে আরও একটি উপাদান যার নাম ফ্যাট। এই ফ্যাট অত্যাধিক মেদ জমাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে এবং শরীরে রোগ ডেকে নিয়ে আসে।

হাদিসের দ্বিতীয় অংশে রাসুল (সা:) বলেছেন আমাদের শরীরের চাহিদার কথা। আমাদের শরীরকে চালনা করার জন্য খুব কম খাবার প্রয়োজন হয়। এই বিষয়টা আরও ভালো ভাবে বোঝা যায় রোজার সময়, যখন আমরা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম খেয়েও স্বাভাবিক জীবনযাপন করি। বর্তমান বিজ্ঞানে এই খাদ্যব্যবস্থাকে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বলা হয়। রাসুল (সা:) স্বয়ং নিজের জীবন এই নিয়মে কাটিয়েছেন এবং প্রতি সপ্তাহে রোজা রাখা তাঁর সাধারণ জীবনের অঙ্গ ছিল।

হাদিসের তৃতীয় ভাগে বেশ কিছু বাস্তব উপদেশ দেওয়া আছে। আগেই যেটা বলেছি যে রাসুল (সা:)-এর নির্দেশ অনুযায়ী একজন মানুষের স্বাভাবিক খাদ্যতালিকায় থাকা উচিৎ এক-তৃতিয়াংশ খাদ্য, এক-তৃতীয়াংশ পানীয় এবং এক-তৃতীয়াংশ শুধু বাতাস। তিনি আরও বলেছেন এই ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনতে দুজনের খাবারকে তিনজনে খেতে বলেছেন এবং তিনজনের খাবার চারজনের খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

শুধুমাত্র আনন্দ ও তৃপ্তির জন্য খাবার না খেয়ে শরীরকে সুস্থ রাখার জন্য খেলে মেদ বা অন্যধরনের  অনেক রোগ থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়া যায়। মুসলিমরা যদি রাসুল (সা:)-এর এই উপদেশগুলি মাথায় রাখে তাহলে অত্যধিক মেদের মতো রোগকে খুব সহজেই ঠেকানো যায়।