মেহমানদারিতে আছে আনন্দ ও পুণ্য

guests
Family and friends gather after dinner, Islam Family and friends dinner Islam

অতিথিকে প্রফুল্লচিত্তে স্বাগত জানানো এবং অতিথির সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার অঙ্গ। অতিথির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা একটি মহৎ মানবীয় গুণ। মানবজীবনে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

কোনো ব্যক্তি যখন কারও বাড়িতে উপস্থিত হন, তখন তিনি সেই বাড়ির মেহমান। আর যাঁর বাড়িতে মেহমান গেছেন, তিনি মেজবান বা মাহরাম। অতিথিকে সম্মান করা একজন মুসলমানের ইমানি কর্তব্য। মানবতার ধর্ম ইসলামে অতিথি আপ্যায়ন সওয়াবের কাজ বলে বিবেচিত। যেসব ভালো গুণের সম্মিলন একজন মানুষকে সামাজিকভাবে ভালো মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, অতিথিপরায়ণতা এর অন্যতম। অতিথিপরায়ণতা ইসলামের অন্যতম একটি বিধানও বটে। এই গুণটির কারণে শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তৎকালীন সময়ে কাফের-মুশরিকদের কাছেও সমাদৃত ছিলেন। মেহমানদারি একটি মহৎ গুণ, যা আত্মীয়তার বন্ধনকে মজবুত করে, বন্ধুত্বকে করে সুদৃঢ় এবং সামাজিক সৌহার্দ্য সৃষ্টিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে।

অতিথিপরায়ণতাকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মুমিনের পরিচায়ক রূপে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন অবশ্যই অতিথির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে।’ (বুখারি, কিতাব আল আদব; মুসলিম, কিতাব আল ঈমান)।

মেহমানের সঙ্গে মেজবান বসে একত্রে আহার গ্রহণ করলে বরকত যেমন হয় তেমনি ভ্রাতৃত্ববোধও সুদৃঢ় হয়। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে আগত সব অতিথির প্রতি সম্মান ও ভালো ব্যবহার করা জরুরি। মেহমানকে বোঝা মনে করা অনুচিত। ধর্মীয় বিশ্বাস মতে মেহমান নিজের রিযিক নিয়ে মেজবানের ঘরে আসেন; এতে করে মেজবানের রিযিকের পরিমাণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।

কথিত আছে, হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে প্রতি রাতে তিন থেকে ১০ আবার কখনো ১০০ জন পর্যন্ত মেহমানের সমাগম ঘটত। হজরত আতিয়্যা আওফি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম (আ.)-কে এ কারণে বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন যে তিনি মানুষকে খানা খাওয়াতেন, বেশি বেশি সালাম দিতেন আর মানুষ রাতে ঘুমিয়ে পড়লে তিনি নামাজ আদায় করতেন। (তাম্বিহুল গাফিলিন)

আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল। আর রমজান মাসে তিনি সবচেয়ে বেশি দান করতেন। যখন জিব্রাইল (আ.) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন, তখন তিনি প্রবল বাতাসের চেয়েও বেশি দানশীল হতেন।’ (বুখারি, হাদিস : ৬; মুসলিম, হাদিস : ২৩০৮)

বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মেহমানদারির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অনেক সময় অতিথি আপ্যায়ন করতে গিয়ে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে অনাহারে থাকতে হয়েছে। নিজ ঘরে মেহমানদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে না পারলে তিনি মেহমানদের কোনো ধনী সাহাবির বাড়িতে পাঠিয়ে দিতেন। নবী হওয়ার আগে থেকেই তিনি অতিথিসেবায় সচেষ্ট ছিলেন। সর্বপ্রথম ওহিপ্রাপ্ত হয়ে অনেকটা বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন মহানবী (সা.)। হজরত খাদিজা (রা.) তখন তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন এভাবে—‘আল্লাহর কসম, আল্লাহ আপনাকে কখনো লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি তো রক্ষা করেন আত্মীয়তার বন্ধন, বহন করেন অন্যের বোঝা, উপার্জনক্ষম করেন নিঃস্বকে, আহার দেন অতিথিকে, সাহায্য করেন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে।’ (বুখারি, হাদিস : ৩)

কেউ যদি বাড়ি নির্মাণ করে, তাহলে সেখানে মেহমানের জন্য বিশেষ ঘর বা কক্ষের ব্যবস্থা রাখার নির্দেশ হাদিস শরিফে রয়েছে। একজন মেহমান এক গৃহে একবারে তিন দিন থাকার হক বা অধিকার রাখেন। অতিথিকে যা আপ্যায়ন করা হবে তা সাদাকা হিসেবে গণ্য হবে। আর মেহমানের জন্যও বৈধ নয় দীর্ঘ সময় মেজবানের গৃহে অবস্থান করা- যাতে তার কষ্ট হয়। যে ঘরে মেহমানদারী করা হয়, সে ঘরে আল্লাহর তরফ হতে বরকত নাযিল হয়।

অতিথি কোনো ঘরে গেলে সর্বপ্রথম গৃহকর্তার অনুমতি নিয়ে ভেতরে ঢুকতে হবে। পূর্ব অনুমতি ছাড়া কারও বাড়িতে প্রবেশ বা আতিথ্য গ্রহণ উচিত নয়; এতে গৃহকর্তা অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। অতিথির উচিত নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মেজবানের জন্য কিছু উপহার বা হাদিয়া নিয়ে যাওয়া।

মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা পরস্পর উপঢৌকন বিনিময় কর। এতে করে মুহাব্বত বৃদ্ধি পাবে।’ বিদায়কালীন অতিথির সঙ্গে বাড়ির আঙ্গিনা পর্যন্ত যাওয়া সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। এতে মেহমানের প্রতি সম্মান করা হয় এবং তিনি পুলকিত হন। অতিথি যদি আত্মীয়-স্বজন হন তাহলে তাদের মেহমানদারীর প্রতি মেজবানের আরও যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। কারণ, আত্মীয়ের সঙ্গে রক্ত, আত্মা ও বৈবাহিক সম্পর্ক থাকে।

আতিথ্য প্রদর্শন করতে গিয়ে কেবল ধনী ও অভিজাতদের প্রতি দৃষ্টি দিলে চলবে না। দরিদ্র ও অভাকগ্রস্তদের প্রতিও সুনজর রাখতে হবে। এতে ধনী-দরিদ্রের মাঝে কোনো বিভাজন উচিত নয়। মহানবী (সা.) বলেন, ‘কেউ যদি তোমাকে খাবারের দাওয়াত দেয়, তা কবুল করা উচিত।

খাওয়া শেষ হওয়ার আগে খাদ্যদ্রব্য টেবিল অথবা দস্তরখান থেকে তোলা উচিত নয়। টেবিল থেকে খাবারের কোনো অংশ নিচে পড়লে তা যদি নষ্ট না হয় তা হলে পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ব্যবহার করা দরকার। এগুলো আল্লাহর নেয়ামত। টেবিলে অথবা দস্তরখানে অযথা খাবার নষ্ট করা অনুচিত। কারণ খাবারের প্রতিটি কণা বরকতময়।

খাবারের প্লেটে খাবারের উচ্ছিষ্ট যেন না থাকে। পরিবেশিত খাবারের কোনো দোষ ত্রুটি বর্ণনা করা অতিথির উচিত নয়, এতে মেজবান কষ্ট পেতে পারেন।