মোঘলাই, চাঙ্গেজী, হালুয়া-ফালুদা কী নেই জাকারিয়া স্ট্রিট ফুডের সম্ভারে

zakaria street kolkata

কলকাতা মহানগরীকে ঘিরে রয়েছে বহু জনপ্রিয় ইতিহাস, লোককথা, ঐতিহ্য। এই কলকাতা শহরের মধ্যেই এক বা একাধিক ধর্ম-সম্প্রদায়ের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান যেমন চোখে পড়ে, তেমনই আবার পারস্পরিক সংস্কৃতি বিনিময়ের এক সম্পর্কসূত্র তৈরি হয়েছে এই শহরবাসীর একেবারে নিজস্ব ছোঁয়ায়। কলকাতা শহরের অলি-গলি যেন এক-একটা সময়, এক-একটা ঐতিহাসিক মুহূ্র্তের সাক্ষী।

বেশ কিছুদিন আগেই আমরা একটি প্রতিবেদনে জাকারিয়া স্ট্রিট সংলগ্ন ‘নাখোদা মসজিদ’-এর কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরেছিলাম। আজ আমাদের আলোচনার বিষয় হল এই জাকারিয়া স্ট্রিট। শুধুমাত্র রহজান মাস বা ঈদের দিনগুলোতে নয়, জাকারিয়া স্ট্রিট কিন্তু সারাবছর ধরেই বেশ জমজমাট থাকে।

মধ্যকলকাতার অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং প্রাচীন নাখোদা মসজিদের প্রতি আগত পর্যটকদের যেমন আলাদা আগ্রহ থাকে, তেমনই এই জাকারিয়া স্ট্রিট জুড়ে বিভিন্ন জিনিস পত্রের পসার সামগ্রীর প্রতিও আলাদা আকর্ষণ থাকে তাঁদের।

জাকারিয়া স্ট্রিট ধরে আপনি যদি হাঁটতে শুরু করেন তাহলে আপনি অবশ্যই পাবেন লক্ষ্নৌ মেজাজের আস্বাদ… বলা ভাল এখানকার বাতাসে যেন শাহী খাবারের সুবাস ছড়িয়ে রয়েছে। হরেক রকমের কাবাব থেকে সেমাইয়ের রকমারি আয়োজনে কোনটা ছেড়ে কোনটা চেখে দেখবেন এ নিয়ে রীতিমতো হয়রানি হতে পারে। অনেক পথচারীই একবাক্যে স্বীকার করে নিয়েছেন যে, জাকারিয়া স্ট্রিটের সবরকমের খাবার একটু একটু করে চেখে দেখার পক্ষে একটা দিন মোটেই আদর্শ নয়। কমপক্ষে দুই-তিনটি দিন তো এক্ষেত্রে লেগে যায়!

জাকারিয়া স্ট্রিটে পৌঁছাবেন কীভাবে? মেট্রোতে যারা যাতায়াত করতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য মস্ত সুবিধা রয়েছে। মহাত্মা গান্ধী রোড বা এমজিরোড মেট্রো বা সেন্ট্রাল মেট্রো স্টেশনে নেমে মাত্র দশমিনিটের হাঁটা পথেই আপনি পৌঁছে যাবেন এই জাকারিয়া স্ট্রিটে। রমজান মাস বা অন্য পরবের সময়ে জাকারিয়া স্ট্রিটের সৌন্দর্য সত্যিই চোখে পড়ার মতো। চারদিকে আলোর রোশনাই আর স্ট্রিট ফুডের সম্ভারে ভর্তি জাকারিয়া স্ট্রিটের নবাবী মেজাজ তখন একটু আলাদাই বটে।

জাকারিয়া স্ট্রিটে জামাকাপড়, নমাজের টুপি এবং অন্যান্য আরও অনেক জিনিসের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত হলেও, জাকারিয়া স্ট্রিটের আসল ঐতিহ্য লুকিয়ে রয়েছে এর জিভে জল আনা মোঘলাই খাবারের সুবাসে। রকমারি কাবাব যেমন- মালাই কাবাব, বটি কাবাব থেকে শুরু করে গলৌতি কাবাব কিংবা হালিমের রকমারি সম্ভার, এনে দেয় আলাদা মাধুর্য। অন্যদিকে সেমাই, শাহী টুকরা, ফিরনি, বোম্বে হালুয়াতে ঘি-র গন্ধ… আপনার রসনাকে তৃপ্ত করতে বাধ্য। এই কথা বিনা বাক্যে স্বীকার করা যায়।

এত তো গেল জাকারিয়া স্ট্রিটের বিভিন্ন পসারের কথা… এখন চলুন চট করে একবার দেখে নেওয়া যাক জাকারিয়া স্ট্রিট ঘুরতে গেলে আপনি কোন কোন খাবারগুলো অবশ্যই টেস্ট করবেন।

শীতের সময়ে জাকারিয়া স্ট্রিটের ‘সুফিয়া’ একপ্রকার মাস্ট ভিজিট জায়গার মধ্যে পড়ে। শীতের সকালে নিহারি এখানে বেশ পপুলার। কিন্তু অন্যান্য সময়ে গেলে আপনি অবশ্যই এখানকার হালিম পদটি খেতে পারেন। এখানে প্রধানত চার ধরনের হালিম চোখে পড়বে। চিকেন হালিম, মটন হালিম, ব্রেন বা মগজ এবং বিফ হালিম। সুতরাং, ব্যক্তিগত রসনা এবং চাহিদা বুঝে আপনি হালিম চেখে দেখতে পারবেন বেশ স্বচ্ছন্দেই। এই প্রসঙ্গে আরও একটা তথ্য আপনাদের দেওয়া যাক, রমজানের সময়ে কিন্তু ‘সুফিয়া’-র হালিমের জনপ্রিয়তা একটু বেশিই চোখে পড়ে।

হালিমের স্বাদটুকু মনের মধ্যে রেখে একটু এদিক-ওদিকে ঘুরে দেখতে দেখতে আপনি এবার একটু ডুবো তেলে ভাজা ‘চিকেন চাঙ্গেজী’ চেখে দেখতেই পারেন। চিকেন চাঙ্গেজী নামটি যেমন অন্যরকম, ঠিক তেমনই এরও স্বাদও বেশ অন্যরকম বটে। এক্ষেত্রে চিকেনের পিসগুলোকে ডবল ফ্রায়েড করা হয়ে থাকে, এছাড়া এখানকার অন্য আরেকটি স্পেশ্যালিটি হল ‘মাহি আকবরী’ বা ‘ফিস আকবরী’… স্পষ্টভাবে বলতে গেলে এটি হল একধরনের কাতলা মাছ ভাজা, বিভিন্ন মশলা এবং অন্যান্য অনেক কিছুর সহযোগে।

সুতরাং, ‘তাসকিনে’ এলে অবশ্যই এই দুটি পদ আপনি চেখে দেখতে পারেন। মশলা, তেল, ঝালের খাবার খেয়ে যদি একটু মিষ্টি জাতীয় খাবার খেতে ইচ্ছা করে, তাহলে অতি অবশ্যই ফালুদা খেতে পারেন।

এরপরে আপনাকে আমরা নিয়ে যাব দেড়শো বছরের পুরনো এক ইতিহাসের পাতায়। প্রায় দেড়শো বছরেও বেশি পুরনো ‘অ্যাডামস কাবাব শপ’-এ। এই দোকানের স্পেশ্যালিটি হল সুতা এবং বটি কাবাব। সুতরাং, এইখানের এইদুটি পদ চেখে দেখতে একদম ভুলবেন না যেন! আর অবশ্যই সন্ধে ৬.৩০ থেকে ৭ টার মধ্যে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। না হলে আপনার ভাগ্যে সুতলি এবং বটি কাবাব নাও জুটতে পারে।

জাকারিয়া স্ট্রিটের বিভিন্ন খাবারের দোকানের কথা বলতে বলতে অবশ্যই উল্লেখ করা প্রয়োজন ‘হাজি আলাউদ্দিন’-র কথা। এটি একটি জনপ্রিয় মিষ্টির দোকান। প্রায় ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সুস্বাদু মিষ্টি পদ পরিবেশন করে এসেছে এরা। এখানে বিভিন্ন পদের মধ্যে সবথেকে জনপ্রিয় হল ‘বত্তিশই হালওয়া বা হালুয়া’- অর্থাৎ এই হালুয়া প্রস্তুতির ক্ষেত্রে প্রায় ৩২ রকমের উপাদান ব্যবহার করা হয়ে থাকে। খেতে অবশ্যই অসাধারণ এবং অতুলনীয়। অন্যান্য আরও অনেক মিষ্টি জাতীয় পদের মধ্যে গরম গরম গোলাপজামুন, গাজরের হালুয়া, ফিরনি এবং অন্যান্য আরও অনেক কিছুই আপনি টেস্ট করতে পারেন।

কলকাতার অলি-গলি ঘুরতে ঘুরতে নাখোদা মসজিদ দর্শনের পর এই স্ট্রিট সংলগ্ন খাবারগুলো অবশ্যই খেতে কোনওমতেই ভোলা চলবে না।