মোঘল চিত্রকলা এবং আধুনিক ক্যালিগ্রাফির ধারণা

ID 50066039 © Serdar Başak | Dreamstime.com
ID 50066039 © Serdar Başak | Dreamstime.com

ভারতের ইতিহাসে ইসলামি শাসকদের ভূমিকা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। সাম্রাজ্য বিস্তারের পাশাপাশি তাঁরা এদেশীয় সাংস্কৃতিক চর্চার বিকাশেও ছিলেন অন্যতম ধারক এবং পোষক। ভারতবর্ষে সুলতানি শাসনকালে এবং পরবর্তীকালে মোঘল শাসনামলে শিল্প এবং চিত্রকলার প্রসার বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। তবে ভারতে সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠার আগে যে শিল্পকলার প্রচলন ছিল না এমনটা বলাটা ঠিক হবে না, কারণ-আদিযুগে পাথরে কিংবা গৃহস্থের বাড়ির দেওয়ালে অঙ্কনশিল্পের যোগসূত্র আমাদের চোখে পড়েছে। সুলতানি শাসন এবং পরে মোঘল শাসনকালে ভারতীয় চিত্রকলার ক্ষেত্রে একটা মৌলিক পরিবর্তন আসে… সেটা কী রকম?

বলা যায় ভিন্ন প্রদেশ এবং ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল থেকে আগত এই শাসকদের অনুপ্রেরণাতে ভারতীয় চিত্রকলাতে অন্যান্য দেশের, প্রদেশের চিত্ররীতির একধরনের সংমিশ্রণ ঘটে। একইসঙ্গে আঞ্চলিক চিত্রকলারও বিকাশসাধন ঘটে। সহজ কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন- মোঘল চিত্রকলাতে ভারতীয় এবং পারসিক চিত্রকলার মিশ্রণ ঘটেছিল, মোঘল দরবারে স্যার টমাস রো প্রমুখ ইউরোপীয় ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতির কারণে মোঘল চিত্রকলাতে ইউরোপীয় প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। এছাড়াও সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতার দরুণ রাজস্থান এবং কাংড়ায় লোকশিল্পের চিত্রকলাতেও একধরনের পরিবর্তন সেই সময়ে নজরে আসে।

সুলতানি যুগ থেকেই বই এবং পাণ্ডুলিপিতে ছবি আঁকার চল দেখা যায়। সুন্দর হাতের লেখা এবং রঙিন সব ছবিতে ওই বইগুলো ছিল অত্যন্ত সুদৃশ্য। পারসিক মহাকাব্য শাহনামা-র ভারতীয় সংস্করণেও আমাদের এই বিষয়গুলো চোখে পড়বে। শিল্পীদের অধিকাংশই ছিলেন পশ্চিম ভারতীয় মূলত গুজরাত প্রদেশের বাসিন্দা। তাঁদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীকালে আকবরের কারখানায় যোগদান করেছিলেন।

বইতে ছবি আঁকার বা অলংকরণের ক্ষেত্রে সম্রাট বাবর বিশেষ করে চিত্রশিল্পীদের অনুপ্রাণিত করতেন। এই একইধারা লক্ষ করা গেছে সম্রাট হুমায়ুনের মধ্যেও। ইরান ও আফগানিস্তানে থাকার সময়ে তিনি আবদুস সামাদ ও মীর সইদ আলির কাজ দেখেন। তাঁদের কাজে মুগ্ধ হয়ে দিল্লিতে ফিরে গিয়ে তিনি তাঁদেরকে নিয়ে একটি কারখানা খুলেছিলেন… যে কারখানায় মূলত বইগুলোতে সুন্দর অলংকরণ ও চিত্রযোগে সুন্দর করে সাজানো হয়ে থাকত। হমজানামা বই-এর অলংকরণের কথা এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতেই হবে। সম্রাট হুমায়ুনের আমলেই আবদুস সামাদ পারসিক রীতি অনুসরণ করে ‘দস্তান-আমির-হামজা’ নামে বিখ্যাত ছবিগুলো আঁকেন। 

সম্রাট আকবরের সময়েও বইয়ের অলংকরণ শিল্পের আরও কয়েকটি নমুনা আমাদের সামনে আসে। যেমন-তুতিনামা, রজমনামা ইত্যাদি। বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠা সাজানো হত সূক্ষ্ম হস্তলিপি এবং ছবি দিয়ে। আকার এবং আয়তনে ছোট এই ছবিগুলোকে বলা হত মিনিয়েচর। যা আধুনিক শিল্পকলাতেও বিশেষভাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। একইসঙ্গে সুন্দর হাতের লেখার শিল্প সেকালে খুবই চর্চা হয়ে থাকত। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় ক্যালিগ্রাফি। ছাপাখানার আবিষ্কার তখনও হয়নি ফলে হাতে লেখা বই ছিল শিল্পকলা প্রদর্শনের একমাত্র স্থল। শোনা যায় চিত্রশিল্পে আগ্রহী আকবর আবদুস সামাদের নেতৃত্বে একটি পৃথক বিভাগ স্থাপন করেছিলেন। সেই বিভাগে ছিলেন আবদুস সামাদ (ছন্দনাম শিরিন কলম অর্থাত মিষ্টি কলম), সৈয়দ আলি ফারুক, দসবন্ত, বসওয়ান, তারাচাঁদ, জগন্নাথ প্রমুখ বিখ্যাত চিত্রশিল্পীরা। ফতেপুর সিক্রিতে আঁকা ছবিগুলো কার্যত সেই উৎকর্ষতার শ্রেষ্ঠত্বকেই চিনিয়ে দেয়। আবুল ফজল তাঁর আইন-ই-আকবরি বইতে মোঘল চিত্রকলার প্রসঙ্গে বলেছেন মোঘল শিল্পীদের ছবিতে প্রাণহীন জড় বস্তুও প্রাণ পেত, একইসঙ্গে সেইসময়ে একশোরও বেশি চিত্রশিল্পী বিশেষভাবে পরিচিতি লাভ করে। 

আকবরের সময় থেকেই চিত্রশিল্পীদের মধ্যে বই আঁকার পাশাপাশি প্রতিকৃতি আঁকারও প্রবণতা দেখা যায়। যা জাহাঙ্গিরের আমল থেকে পূর্ণমাত্রায় প্রকাশ পায়। সেইসময়ে চিত্রকলাতে ইউরোপীয় প্রভাব চোখে পড়েছে। সম্রাট জাহাঙ্গিরের দরবারে ছিলেন ফারুক বেগ, আখারিজা, ওস্তাদ মনসুর, বিষেণ দাস, কেশব, মনোহর প্রমুখ চিত্রশিল্পী। তাঁর আমল থেকেই শিল্পীরা প্রথম ছবিতে স্বাক্ষর দিতে শুরু করে, তাতে বোঝা যেত কোন ছবিটি কোন চিত্রশিল্পীর করা। সেই সময়ে নাদিরা বানু, সাহিফা বানুর মতো মোঘল নারীরা নিজেরা ছবি আঁকতেন। শাহজাহানের সময়ে স্থাপত্যশিল্পের পাশাপাশি চিত্রশিল্পেও উন্নতি ঘটে… কিন্তু পরবর্তী শাসক ঔরঙ্গজেবের সময়ে সংস্কৃতির ধারাবাহিক স্রোত ব্যাহত হয়. সেই সময়ে চিত্রশিল্পীদের অনেকেই আঞ্চলিক শাসকদের দরবারে চলে যান।