মোঘল সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন এই নারী, কে তিনি?

nur jahan

সম্রাট জাহাঙ্গীর একসময়ে বলেছিলেন, “আমার রাজ্য আমি এক পেয়ালা মদ আর এক বাটি সুরুয়ার বিনিময়ে আমার প্রিয় রানীর কাছে বেচে দিয়েছি।” সম্রাটের সেই প্রিয়তমা রানি ছিলেন ‘নূর জাহান’। প্রাক-আধুনিক বিশ্বের  বৃহত্তম সাম্রাজ্যের রাজকীয় রৌপ্য মুদ্রার স্মারক হিসেবে চিহ্নিত ছিল মোঘল সাম্রাজ্যের রৌপ্য মুদ্রাটি। আমরা একটা জিনিস প্রায় প্রত্যেকেই লক্ষ্য করেছি যে, এই মুদ্রায় সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামের সঙ্গেই উল্লেখিত রয়েছে তাঁর স্ত্রীর নাম… নূর জাহানের। স্বামী যখন শাসক হিসাবে নিজ দায়িত্ব পালনে অক্ষম ছিলেন, তখন নূরজাহানই সাম্রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। সম্ভবত তিনিই একমাত্র নারী যিনি কোনও মোঘল সম্রাটের উপর এতখানি প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন। নূরজাহান ছিলেন একইসঙ্গে মার্জিত, শিক্ষিত, বুদ্ধিমতী ও কর্তৃত্বপরায়ণ একজন সম্রাজ্ঞী। একইসঙ্গে যুক্ত ছিল তাঁর নিগূঢ় রাজনৈতিক বিচক্ষণতা। সম্রাজ্ঞী হিসাবে, নূর জাহান ১৬১১-১৬২৭ সাল পর্যন্ত মোঘল সাম্রাজ্যের শাসন পরিচালনা করেছিলেন। নূরজাহানই একমাত্র মোঘল সম্রাজ্ঞী যিনি নিজের নামে মুদ্রা প্রচলন করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামের পাশে নূরজাহানের নাম বড়ই সুন্দরভাবে তখনকার মুদ্রায় স্থান পেত।

নূর জাহানের ব্যক্তিগত জীবন

নূরজাহানের জন্ম ১৫৭৫ সালে। তাঁর পিতৃদত্ত নাম ছিল মেহের-উন-নিসা। পারস্যের অভিজাত বংশের উত্তরাধিকারি মির্জা গিয়াস বেগ ছিলেন তাঁর পিতা। নিজের দুর্দিনে ভাগ্যের অন্বেষণে ভারতবর্ষে পাড়ি জমিয়েছিলেন মির্জা গিয়াস বেগ। কান্দাহারে পৌঁছানোর পরেই তাঁর সন্তানসম্ভবা স্ত্রী কন্যা মেহের-উন-নিসার জন্ম দেন। তখন সম্রাট আকবরের শাসনকাল চলছিল। এক বন্ধুর সহযোগিতায় গিয়াস বেগ সম্রাট আকবরের দরবারে কাজ পান। নিজস্ব মেধা এবং বুদ্ধির জোরে খুব দ্রুত তিনি দরবারে গুরুত্ব লাভ করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি দেওয়ান বা অর্থমন্ত্রী পদ লাভ করেন তিনি।

নূরজাহান ও সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রণয়ঘটিত নানা কাহিনী ছড়িয়ে আছে উপমহাদেশ জুড়ে। জানা যায়, তরুণী নূরজাহান বা মেহের-উন-নিসাকে দেখেই তাঁর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন শাহজাদা সেলিম বা জাহাঙ্গীর। কিন্তু সম্রাট আকবর প্রথমে এ সম্পর্ক মেনে নেননি। তিনি তড়িঘড়ি করে নিজের বাহিনীতে কর্মরত ইরানী সমরনায়ক শের আফগান আলী কুলি খান ইসতাজলুর সাথে ১৭ বছর বয়সী মেহের-উন-নিসার বিয়ে দিয়ে দেন। এরপর তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় সুদূর বর্ধমানে। জাহাঙ্গীর সম্রাট হওয়ার অনতিকাল পরে শের আফগান রাষ্ট্রবিরোধী ও বিদ্রোহমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়লে সম্রাট বাহিনীর হাতে নিহত হন তিনি। আবার অনেকে বলে থাকে, এককালের প্রণয়িনীকে পাবার জন্যই শের আফগানকে হত্যা করেছিলেন তিনি। ঐতিহাসিকগণের মতে এর কোনও সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। তবে ঘটনা যা-ই হোক, নূরজাহানের প্রথম স্বামীর বিয়োগ ঘটে। শের আফগানের ঔরসে এক কন্যারও জননী হন তিনি।

মোঘল সম্রাটের সর্বাধিক প্রিয় স্ত্রী

মোঘল সম্রাজ্ঞী মেহরুন্নিসা কেবলমাত্র একজন বিচক্ষণ, চিন্তাশীল ব্যক্তিত্বের অধিকারীই ছিলেন না বরং খুব অল্প সময়ের মধ্যে, তিনি নিজের বহুমুখী প্রতিভার প্রকাশে সফল হয়েছিলেন। একইসঙ্গে সুশিক্ষিত মহিলা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন নিজেকে। চারুকলার প্রতি অসামান্য প্রতিভা, তাঁর পার্সিয়ান সংস্কৃতির প্রতি মুগ্ধতার প্রতিচ্ছবিতেই ফুটে ওঠে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় সাম্রাজ্যের এক মহৎ উত্সব চলাকালীন, তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীরের নজর কেড়েছিলেন… তাঁর রূপ- সৌন্দর্যের পাশাপাশি তাঁর চারিত্রিক বুদ্ধিমত্তা সম্রাটকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি তাঁদের বিবাহের ঘোষণা করেছিলেন সেই বছর। সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁকে সাম্রাজ্যের একটি শক্তিশালী অংশের অংশীদার হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন, তাকে নূর জাহান (অর্থাৎ বিশ্বের আলো) উপাধি দিয়েছিলেন।

কেউ কেউ বিশ্বাস করেন যে এই উত্সবের অনেক আগে থেকেই সম্রাট নূরজাহানের প্রেমে পড়েছিলেন। কেউ কেউ এমন দাবি করার সাহসও করেন নূরজাহানের প্রথম স্বামীর মৃত্যুর পুরো ঘটনাটি সম্রাট নিজেই তাঁকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য পরিকল্পনা করেছিলেন।

ক্ষমতাসীন সম্রাজ্ঞী রূপে আত্মপ্রকাশ

মোগল সাম্রাজ্যের প্রথম প্রভাবশালী মহিলা শাসক হিসেবে ইতিহাসে নূর জাহানের অবদান নতুন করে উল্লেখের কোনও কারণ নেই। সম্রাটের অনুপ্রেরণায় এবং এক অসাধারণ দক্ষতার গুণে নূর জাহান প্রশাসন, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে তার রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেছিলেন। ১৬২০ সালে সম্রাট যখন আফিম এবং মাদকাসক্ত আনন্দের মধ্যে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন, তখন নূরজাহানই শাসন পরিচালনার দায়িত্বভার নিজের হাতে সর্বোতভাবে তুলে নিয়েছিলেন। তার শাসনামলে, সম্রাজ্ঞী নূর জাহান মহিলাদের বিষয়গুলিতে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন এবং মেয়েদের ব্যক্তিগত উন্নতি এবং মর্যাদা রক্ষার প্রতি বিশেষ যত্নশীল ছিলেন। তিনি ইউরোপীয়দের সঙ্গে ব্যবসা করতেন এবং নিজের জাহাজের মালিক ছিলেন। যা হজযাত্রীদের পাশাপাশি মালবাহী অনেক সামগ্রী মক্কায় নিয়ে যেত। তাঁর পরিচালনাতেই মোঘলের রাজধানী আগ্রা একটি শক্তিশালী বাণিজ্য-বাণিজ্য নগরীতে পরিণত হয়।

তবে সেই সময়, পুরুষদের জন্যই যেহেতু শাসনব্যবস্থা অনেকাংশে সংরক্ষিত ছিল। এই কারণে, নূর জাহান কখনওই তাঁর মন্ত্রী এবং পারিষদবর্গের সঙ্গে সরাসরি আলাপচারিতা করেননি। মূলত পর্দার আড়াল থেকেই তিনি তাঁর মতামত পেশ করে থাকতেন। তিনি তাঁর যুক্তি এবং ধারণাগুলি কেবল তাঁর নিজের বিশ্বস্ত পুরুষদের সাথে আলোচনা করেছিলেন, যারা তাঁর বার্তা অন্যান্যদের কাছে পৌঁছে দেবে।

পারস্য সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের পরম্পরা নিজের অন্তরে সূক্ষ্ণভাবে অনুভব করতে পেরেছিলেন নূর জাহান। তিনি আরবি ও ফারসি ভাষায় নিজের আয়াত লিখেছিলেন এবং রাজপ্রাসাদের অন্যান্য মহিলা সদস্যদেরও সৃজনশীল লেখার জন্য তিনি বিশেষভাবে উত্সাহিত করেছিলেন। তিনি কবিতা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলেন, কাব্যিক উত্সবকালে তাঁর প্রিয় মহিলা কবিদের প্রচার ও প্রসার ঘটেছিল। তাকে প্রায়শই ‘মাখফি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে।

১৬২৬ সালে, বিদ্রোহীরা কাশ্মীরের ভ্রমণকালে সম্রাট জাহাঙ্গীরকে ধরে নিয়ে যায়। বিদ্রোহী নেতা মহাবত খান এক অভ্যুত্থানের সূচনা করেছিলেন। সম্রাজ্ঞীর প্রধান স্ত্রী নূর জাহান তার মন্ত্রীদের তাঁর স্বামীকে উদ্ধারের জন্য আক্রমণ পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই আক্রমণ চলাকালীন, তিনি নিজে রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

শেষ জীবন

উদ্ধারের পরবর্তী সময়ে সম্রাট জাহাঙ্গীর মারা গেলেন এবং তার কয়েক বছর পর্যন্ত নূর জাহান তার মেয়ের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করেছিলেন। এই সময়ে, তিনি তার বাবার জন্য আগ্রায় একটি সমাধিসৌধ নির্মাণ করেছিলেন, বর্তমানে এটি ‘ইতমাদ-উদ-দৌলার’ সমাধি হিসাবে পরিচিত।

নূর জাহান ১৬৪৫ সালে মারা যান। ১৬২৭ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পরে নূরজাহান তড়িঘড়ি করে জামাতা শাহরিয়ারকে সম্রাট ঘোষণা করতে চান। কিন্তু তার ভাই আসফ খান নিজ জামাতা খুররমকে সিংহাসনে বসাতে কৌশলে নূরজাহানকে কারাবন্দি করেন। খুররম পথের কাঁটা, নিজ ভাই শাহরিয়ারকে হত্যা করে ‘শাহজাহান’ নাম নিয়ে সিংহাসনে আরোহণ করেন। জীবনের শেষ ১৮টি বছর নূরজাহানের বন্দিদশাতেই কাটে। এই পুরো সময় তিনি রাজনীতি থেকে বিচ্যুত হয়, তার পিতার সমাধিতে দরগাহ তৈরির তদারকি করে ও কাব্যচর্চা করে দিনাতিপাত করেন। এই সমাধিটি বর্তমানে ইতমাদ-উদ-দৌলার সমাধি নামে পরিচিত। যে পারসিক কাব্যটি এ সময় তিনি লিখেন, তার নাম হলো ‘মাখফি’।