‘মোহর’, ‘আশরফি’, ‘রূপায়া’, ‘তঙ্কা’- উল্টেপাল্টে দেখা মুদ্রার ইতিহাস

ID 10292506 © Picstudio | Dreamstime.com
ID 10292506 © Picstudio | Dreamstime.com

মধ্যযুগীয় ভারতবর্ষের প্রত্ন ইতিহাস রচনায় মুদ্রা এবং শিলালিপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই প্রসঙ্গে আমরা বলতে পারি ঐতিহাসিক উপকরণ হিসেবে এই দুইয়েরই ভূমিকা রয়েছে। কোনও সময়ের সমাজতাত্ত্বিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা পেতে সাহায্য করে এইসব ঐতিহাসিক উপকরণগুলিই। ভারতবর্ষে মধ্যযুগীয় ইসলামি শাসনব্যবস্থা ছিল অনেকগুলি দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। মুসলমান শাসকেরা এদেশে কেবলমাত্র সাম্রাজ্য বিস্তারই করেননি, এদেশের সংস্কৃতিকে ভালবেসে এই দেশের উন্নতিতে তারা জোরালো ভূমিকাও পালন করে গেছে। প্রাচীনকালে আমরা জানি বিনিময় প্রথার মাধ্যমে মানুষ জিনিসপত্র কেনাবেচা করত, কোনও কোনও ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক লেনদেনও বিনিময় প্রথাই ছিল একমাত্র উপায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিনিময় প্রথার বদলে মুদ্রা ব্যবস্থার প্রচলন শুরু হয়। গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়। এখন যেখানে তুরস্কের অবস্থান, ওই প্রদেশে খ্রিস্টজন্মের আনুমানিক পাঁচ হাজার বছর আগে থেকেই মুদ্রা ব্যবহারের ঐতিহাসিক তথ্যের হদিশ পাওয়া গেছে। 

ভারতে সুলতানি আমলে আমাদের চোখে পড়েছে সোনার মোহর, রুপোর তঙ্কা এবং তামার জিতল ব্যবহারের প্রবণতা। এগুলো সবই মুদ্রার এক একটি নাম। এই আমলের শেষে রুপো এবং তামা মেশানো একধরনের মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়। শেরশাহ মুদ্রাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন, তার সময় থেকেই সোনা, রুপো এবং তামা এই তিনধরনের মুদ্রার প্রচলন শুরু হয়, যা মোঘল সম্রাটেরা অনুসরণ করেছিলেন।

বাবর এবং হুমায়ুনের শাসনামলে প্রচলিত মুদ্রার নাম ছিল শাহরুখি মুদ্রা। এই মুদ্রা ছিল রুপোর মুদ্রা। এই মুদ্রাতে পবিত্র কোরানের কলেমা খোদাইয়ের রীতি ছিল। তার সঙ্গে একপিঠে ইসলামের প্রথম চার খলিফা এবং সম্রাটের নাম এবং অপর পিঠে যে টাঁকশালে মুদ্রাটি তৈরি হয়েছে তার নাম ও তারিখ লেখা থাকত। পরবর্তীসময়ে হুমায়ুন অপেক্ষাকৃত ভারী মুদ্রার প্রচলন করেন যা ‘মোহর’ নামে পরিচিতি পায়। 

প্রত্নবিদদের গবেষণা অনুসারে মোঘল আমলে প্রচলিত সোনার মুদ্রার নাম ছিল ‘মোহর’ বা ‘আশরফি’। এ যুগে প্রধান মুদ্রা অবশ্য ছিল রুপো দিয়ে তৈরি, নাম ‘রূপায়া’। এটা দিয়েই সে সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। প্রজারা কর দিয়ে থাকত। তামা দিয়ে তৈরি একপ্রকার মুদ্রার নাম ছিল ‘দাম’। দক্ষিণভারতে বিজয়নগরে সোনা দিয়ে তৈরি ‘হোন’ ছিল প্রধান মুদ্রা। এই মুদ্রা ভারতের অন্যান্য স্থানেও বিশেষভাবে প্রচলিত হয় পরবর্তী সময়ে। 

সম্রাট আকবরের শাসনামলে মুদ্রা ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসে। সিংহাসন জয়ের পরে প্রথম তিন বছর শাহরুখি মুদ্রাই চালু ছিল। ধীরে ধীরে অবশ্য আকবর অবশ্য মুদ্রার ডিজাইন তৈরি করতে বিশেষভাবে আগ্রহ প্রকাশ করেন। আকবরি মুদ্রাতে তাঁর ব্যক্তিগত চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। আমরা প্রত্যেকেই জানি সম্রাট আকবর ‘দীন-ই-ইলাহি’ ধর্মমত প্রবর্তন করেছিলেন। এই মতের অনুসরণেই আকবর  ‘ইলাহি মুদ্রা’ চালু করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে আরও কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করতে হবে। মোঘল আমলে যে তিনধরনের মুদ্রা প্রচলিত ছিল তার ব্যবহারেও ছিল সূক্ষ্ম বিভাজন। স্বর্ণমুদ্রাগুলো প্রধানত সঞ্চয়ের কাজে ব্যবহার করা হত। উচ্চপর্যায়ের লেনদেন অবশ্য হত তামার মুদ্রার মাধ্যমে। ঔরঙ্গজেবের সময়ে তামার সরবরাহ কমে যাওয়ার ফলে মুদ্রার ওজন প্রায় ১/৩ কমে যায়। তামার সরবরাহ কমে যাওয়ার ফলে দামও বেড়ে যায়। খুচরো বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে সেই সময়ে সাম্রাজ্যে কড়ি ব্যবহার করা হত। 

ঐতিহাসিক বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে জানা যায় ওই সময়ে সাম্রাজ্যে ‘সরাফ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। এরা আজকের ব্যাঙ্কের মতো সেকালে টাকা বিনিয়োগের কাজ করত। ধাতুর মুদ্রা ঠিক কতখানি খাঁটি তাও দেখে নেওয়া হত। তুর্কি শাসকদের আমলে কাগজের ব্যবহার শুরু হলে সরাফরা ‘হুন্ডি’ নামে একধরনের কাগজ চালু করেছিল। বণিকরা কোনও এক জায়গায় সরাফকে টাকা জমা দিয়ে সেই কাগজ কিনে অন্য জায়গায় তা প্রয়োজনে ভাঙিয়ে নিতে পারত। এতে বণিকদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় টাকা নিয়ে যেতে সুবিধা হয়েছিল। এছাড়া দেশের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থিত টাকশাল বা কোষাগার থেকে মুদ্রাগুলো মুদ্রিত হত।