SalamWebToday নিউজলেটার
Sign up to get weekly SalamWebToday articles!
আমরা দুঃখিত কোনো কারণে ত্রুটি দেখা গিয়েছে:
সম্মতি জানানোর অর্থ, আপনি Salamweb-এর শর্তাবলী এবং গোপনীয়তার নীতি মেনে নিচ্ছেন
নিউজলেটার শিল্প

যখন ইউরোপীয়রা মধ্যপ্রাচ্যে আশ্রয় খুঁজেছিলেন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়

মধ্য প্রাচ্য ৩১ জানু. ২০২১
ফোকাস
মধ্যপ্রাচ্যে
Mostafa Meraji-Unsplash

শরণার্থীদের সম্পর্কে অধিকাংশ আলোচনার ক্ষেত্রেই, বিশেষত গণমাধ্যমে, খুব স্পষ্ট ভাবে “আমরা” এবং “ওরা” বিভাজন তৈরি হয়েছে। এই শরণার্থীদের সাথে অমানুষিক ব্যবহার ও অমার্জিত ভাষায় কথা বলাটাই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধরনের ভাষার ব্যবহার শুধুমাত্র দক্ষিণপন্থী গণমাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এমন ভাষাই ব্যবহার করেছিলেন ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থী কিছু জনকে বর্ণনা করার জন্য। কিন্তু যে বিষয়টি কেউ গুরুত্ব দিচ্ছেন না, সেটি হল, এই শরণার্থীরা নতুন আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন নিজের দেশের কোনও সঙ্কটের কারণে। পরিস্থিতি প্রতিকূল না হলে এই ব্যক্তিরা নিজেদের দেশ-ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় খুঁজতে আসতেন না।

এমন পরিস্থিতি কি এর আগে কখনও এমন পরিস্থিতি হয়নি? অবশ্যই হয়েছে। এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের দিকে তাকালে আমরা ইউরোপীয়দের মধ্য প্রাচ্যে পালিয়ে এসে আশ্রয় চাওয়ার অসংখ্য উদাহরণ খুঁজে পাই। ১৯৪১ সালে, হিটলারের আক্রমণাত্মক যুদ্ধনীতির ফলে লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ইউরোপ ত্যাগ করেছিলেন। সেই সময় বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া, গ্রীস, তুরস্ক এবং প্রাক্তন যুগোস্লাভিয়া থেকে কয়েক হাজার শরণার্থী পরিবার সহ মিশর, সিরিয়া ও প্যালেস্টাইনে বসতি স্থাপনের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন। এই কর্মসূচির নাম ছিল মিডল ইস্ট রিলিফ অ্যান্ড রিফিউজি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (MERRA)। সেই সময় ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ট্রেক করে ইউরোপীয় নাগরিকরা মধ্য প্রাচ্যে এসেছিলেন আশ্রয়ের খোঁজে, ঠিক তার বিপরীতটি বর্তমানে মধ্য প্রাচ্য এবং আফ্রিকান নাগরিকরা করছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে শরণার্থী শিবির

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে সমস্ত শহরে এই ধরনের শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার শিবিরগুলি নির্মীত হয়েছিল, তাদের মধ্যে ছিল সিরিয়ার আলেপ্পো এবং প্যালেস্তাইনের গাজা শহর; এই দুইটি শহরই গত দশকে অকল্পনীয় ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এবং এই শহরের বাসিন্দারা বর্তমানে শরণার্থীতে পরিণত হয়েছেন। সেই সময়, এই শিবিরগুলির পরিস্থিতি খুব একটা ভালো না হলেও, সেখানে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য কর্মসূচি এবং শিশুদের জন্য শিক্ষামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা করা হয়েছিল। এমনকী ইউরোপ থেকে শরণার্থীদের প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের বাসিন্দারা কোনও বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ করেননি, বরং সর্বদা তাঁদের ধর্মীয় এবং সাংস্কৃতিক প্রয়োজনীয়তার সাথে সমন্বয় বজায় রেখে চলার করার প্রচেষ্টা করেছিলেন।

মধ্যপ্রাচ্যে শরণার্থীদের পুনর্বাসন শুধুমাত্র এই দেশগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইরানেও পোল্যান্ডের কয়েক হাজার বাসিন্দাকে আশ্রয় প্রদান করেছিল। ইরানের শহর ইসফাহানে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী এক পোলিশ স্কুল শিক্ষক তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেছিলেন, “মিশুকে তুর্কীরা বাসের চারপাশে ভিড় করেছিলেন, এবং তাঁরা খুব উৎসাহের সাথে আমাদের স্বাগত জানিয়েছিলেন এবং খেজুর, বাদাম, কিসমিস ও রসালো ডালিম উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন খোলা জানালা দিয়ে। ”

ইতিহাস আমাদের যে শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে, তা বুঝতে না পারা অনেক ক্ষেত্রে খুবই সহজ। আমরা অধিকাংশ সময়েই “আমি” বা “আমাদের” জন্য কোন জিনিসটা সবচেয়ে ভাল, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করি, কিন্তু অন্যদিকে “অন্যদের” এর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অবহেলা করে থাকি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ ভাবে যে- কোনও ব্যক্তি দুর্ভাগ্যের শিকার হলে তা হল তাঁর কুকর্মের ফল, আর নিজেদের ভালো থাকার অর্থ হল “আমার” বা “আমাদের” প্রতি ভালো কাজের পুরস্কার।

বর্তমান বিশ্বে শরণার্থীর সংখ্যা

বর্তমান বিশ্বে আগের চেয়ে শরণার্থীর সংখ্যা অনেকটাই বেশি। ইউনাইটেড নেশন-এর হাই কমিশনার ফর রিফিউজিস (UNHCR) জানিয়েছে যে, এখনও পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ৬৫.৬ মিলিয়ন মানুষ তাঁদের বাড়িঘর থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে ২২.৫ মিলিয়ন অন্য দেশে শরণ নিয়েছেন। এই ২২.৫ মিলিয়নের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি উদ্বাস্তু ১৮ বছরের কম বয়সী।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (WEF) এর একটি রিপোর্ট অনুসারে, ২০১৬ সালে ১ মিলিয়ন শরণার্থী ইউরোপে এসেছিলেন, যাঁদের অধিকাংশই পালিয়ে এসেছিলে আফ্রিকা এবং এশিয়ার যুদ্ধবিদ্ধস্ত এলাকা থেকে। আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শুনে থাকি যে, ইউরোপে শরণার্থীরা আশ্রয় চাইছেন, যার ফলে সেই দেশগুলিতে উদ্বাস্তু সমস্যা বা রিফিউজি ক্রাইসিস তৈরি হয়েছে, কিন্তু যে দেশটি সবচেয়ে বেশি সংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, সেটি হল তুরস্ক। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জর্ডন, তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে রয়েছে যথাক্রমে লেবানন ও পাকিস্তান।

ইউরোপের এক একটি দেশে শরণার্থীদের সাথে ব্যবহার এক এক রকম, এবং তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই দেশের বর্তমান সরকারের উপরে নির্ভরশীল। উদাহরণ হিসেবে আলোচনা করা যেতে পারে কানাডা নিয়ে। প্রাথমিক ভাবে এই দেশ শরণার্থীদের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর মনোভাবাপন্ন ছিল, কিন্তু নির্বাচনে লিবারাল জাস্টিন ত্রুদোর জয়ের পরে, শরণার্থীদের প্রতি এই দেশের নীতি অনেকটাই নরম হয়। আবার প্রায় একই সময় আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের ফলে সেখানে শরণার্থীদের কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছিল।