যুবক বয়সে হজ্জ্ব করবেন যে কারণে

হজ্জ ০৩ ফেব্রু. ২০২১ Contributor
মতামত
যুবক বয়সে হজ্জ্ব
© Ahmad Faizal Yahya | Dreamstime.com

আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান, মানসিকভাবে সুস্থ এমন প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর উপর জীবনে অন্তত একবার হজ্জ্ব করা ফরজ। যেকোনো মুসলিমের ওপর হজ্জ্ব ফরজ হওয়ার ব্যাপারে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হওয়া অত্যন্ত গুরুত্ববহ। শারীরিক যোগ্যতাও এক্ষেত্রে খুব বেশি প্রয়োজন। যুবক বয়সে হজ্জ্ব করা অনেক সহজ এবং পুণ্যেরও বটে।

হজ্জ্ব ফরজ হওয়ার শর্তসমূহ

কোনো মুসলমান আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হওয়া সত্ত্বেও যদি সে শারীরিকভাবে অক্ষম বা দুর্বল হয়ে থাকে তবে তার উপরও হজের হুকুম শিথিলযোগ্য। আবার মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির উপরও হজ্জ্ব ফরজ হয় না। কাজেই হজ্জ্ব ফরজ হওয়ার শর্তগুলোকে অতি যত্নের সাথে মূল্যায়ন করে তা বিবেচনায় নিয়ে আসা জরুরি। কেননা হজ্জ্বের সময় এমন কিছু আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে, যা একজন ব্যক্তির আর্থিক, মানসিক ও শারীরিক শক্তির সাথে সম্পৃক্ত।

হজ্জ্ব ফরজ হওয়ার ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত হয়েছে,

“মানুষের পক্ষ থেকে যারা এই ঘর (কাবাঘর) পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ্য রাখে (আর্থিক ও শারীরিক ভাবে), তারা যেন হজ্জ্ব সম্পন্ন করে, তাদের ওপর এটি আল্লাহর হক। আর যে ব্যক্তি এ নির্দেশ মেনে চলতে অস্বীকার করবে তার জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ কারোও মুখাপেক্ষী নন।” (৩:৯৭)

পবিত্র কুরআনের নির্দেশ মতে- আর্থিক ও শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান ব্যক্তি হজ্জ্ব করার ব্যাপারে শিথিলতা দেখাতে পারে না।

যুবক বয়সে শারীরিক ও আর্থিক সঙ্গতি ভাল থাকে

একজন মানুষ কঠোর পরিশ্রম করে যৌবনে অর্থ উপার্জনের মাধ্যমে হজ্জ্বের নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে যেতে পারেন; কিন্তু বার্ধ্যকে সে তার অর্জিত সম্পদ যে হারিয়ে ফেলবেন না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আর দিন যত অতিবাহিত হয় মানুষের উপর খরচের বোঝাও তত চাপতে থাকে। অর্থাৎ হজ্জ্বের নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার যোগ্যতা বা সামর্থ্য সব সময় একই রকম থাকে না। আবার শারীরিকভাবেও একজন মানুষ সব সময় সুস্থ থাকতে পারে না। যেকোনো সময় দুর্ঘটনায় পড়ে বা অসুখে আক্রান্ত হয়ে হজ্জ্ব করার মতো শারীরিক যোগ্যতা হারিয়ে ফেলতে পারে। কাজেই যোগ্যতা অর্জন করার সাথে সাথে হজ্জ্ব করা না হলে সে জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হবে।

পৃথিবীর অধিকাংশ মুসলিমই অপেক্ষাকৃত বৃদ্ধ বয়সে হজ্জ্ব সম্পাদন করে থাকেন। সব ধরনের যোগ্যতা অনেক আগেই অর্জন করার পরও যখন দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসে, শরীর নুয়ে পড়ে, হাঁটুতে যখন পর্যাপ্ত বল থাকে না, তখন দায়মুক্তির জন্য হজ্জ্ব করতে অনেকেই মনস্থির করেন।

যৌবনের ইবাদত আল্লাহর নিকট বেশি প্রিয়

অথচ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যৌবন বয়সের ইবাদত আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি প্রিয়।” কিন্তু দুঃখের বিষয়, বহু মানুষকে দেখা যায় জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নামাজ ধরেন, কুরআন তেলাওয়াত শেখার চেষ্টা করেন, মুখে দাড়ি রাখেন এবং এরপর হজ্জ্ব করেন। এ রকম করা যেন এক ধরনের নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে।

একটা জিনিস খেয়াল করলে দেখা যায়, সব মানুষই জীবনে যতটুকু অন্যায়, অবিচার, জুলম, ও গুনাহের কাজ করেছেন তার অধিকাংশ যুবক বয়সেই করেছেন। সাধারণত বৃদ্ধ বয়সে মানুষ এসকল স্বেচ্ছায় বা বয়সের ভারে বাধ্য হয়ে এসকল অন্যায়-অপকর্ম থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। মানুষ যাতে অপকর্মে নিজেকে নিমজ্জিত রাখতে না পারে সে জন্যই আল্লাহ তা’আলা যুবক বয়সে ইবাদত করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। অথচ মানুষ সব ধরনের অপকর্ম ও গুনাহ করা শেষ করে শেষ বয়সে এসে সেসব কৃত অপকর্ম থেকে মুক্তি লাভের প্রত্যাশায় ইবাদতে মনোনিবেশ করে থাকে। যেন সম্পূর্ণ উল্টোপথে চলছে আমাদের মুসলিম সমাজ।

নবী-রাসূল ও পূণ্যবানরা যুবক বয়সেই হজ্জ্ব করেছেন

হজ্জ্ব এমন একটি ইবাদত যা পূর্ণ করার জন্য আর্থিক সামর্থ্য ও শারীরিক সামর্থ্য দুটোই একসাথে দরকার হয়। আর এ দুটো সামর্থ্যই প্রায় প্রত্যেকটি মানুষ তার যুবক বয়সেই অর্জন করার যোগ্যতা রাখে। বেশির ভাগ মানুষই তরুণ বয়সে অর্থ উপার্জন করে থাকে। অতএব তরুণ

বয়সেই হজ্জ্ব করা উত্তম। প্রথম যে ব্যক্তি তরুণ বয়সে কাবাঘর তাওয়াফ করেছিলেন, তিনি হজরত আদম(আঃ)। হজরত ইব্রাহিম(আঃ)-ও তরুণ বয়সে কাবা প্রদক্ষিণ করেছিলেন। তরুণ বয়সের হাজি ছিলেন হজরত ইসমাইল(আঃ)। এক সন্তানের জননী ইসমাইল মাতা হজরত হাজেরা সাফা-মারওয়া দৌড়ে হজ্জ্ব সম্পাদন করেছিলেন। তাঁরা প্রত্যেকেই বয়সের ভারে নুয়ে পড়ার আগেই কাবা তাওয়াফ করেছিলেন।

যুবক বয়সে হজ্জ্ব-এর আনুষ্ঠানিকতা পালন করা সহজ

হজ্জ্ব একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত। হজের আনুষ্ঠানিকতাগুলো মানুষের শারীরিক শক্তির সাথে সম্পৃক্ত। সাফা থেকে মারওয়া আবার মারওয়া থেকে সাফা পাহাড় দৌড়ানো। কাবাঘর সাতবার তাওয়াফ করা। সাতবার করে ২১টি পাথর নিক্ষেপ করা। নিজের কোরবানি নিজে জবাই করা। মিনা মুজদালিফা হয়ে আরাফাতের মাঠে হেঁটে যাওয়া আবার আসা। হাজরে আসওয়াদ বা কালো পাথর চুম্বন করা। ওজু-গোসলসহ নিজের কাজ নিজে করা ইত্যাদি সকল কাজই লাখ লাখ মানুষের ভিড়ের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে প্রচণ্ড রোদে সম্পাদন করা খুবই কষ্টসাধ্য এবং শ্রমসাধ্য ব্যাপার। যা যুবক বয়সে অনেকটাই সহনীয়।

হজ্জ্ব গমনে বিত্তবান তরুণদের উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে দায়িত্বশীল মুসলিম আলেমদের জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। সকলে মিলে সমাজে এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরি, যাতে তরুণ বয়সে হজ্জ্ব করা একটা আন্দোলনে রূপ নেয়। দেশে যত তরুণ হাজী তৈরি হবে, সমাজ থেকে তত অপরাধপ্রবণতা হ্রাস পেতে থাকবে বলে আশা করা যায়।