যেভাবে এল ‘ঢাকা’ নামটি

dhaka ahsan manzil
View at the Mughal Palace - Ahsan Manzil in Dhaka,Bangladesh ID 166158595 © Milosk50 | Dreamstime.com

পুরান ঢাকার সংস্কৃতিতে তাদের নিজস্বতা রয়েছে। তাদের এই সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছে তাদের নিজেদের পরিধির মধ্যে এবং এটি নিয়ে তারা গর্ববোধ করে। পুরান ঢাকার খাবার, স্থাপনা, আচরণ, শব্দের উচ্চারণ সহ প্রায় সকল বিষয়ে তাদের  নিজস্ব ধারা রয়েছে।

পূর্ববঙ্গের ঢাকা নামক অঞ্চলটি বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে এই শহরটি গড়ে ওঠে ৭০০ থেকে ১২০০  খ্রিস্টাব্দের মধ্যে । ঢাকার নামকরণের ইতিহাস নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। কথিত আছে যে, সেন বংশের রাজা বল্লাল সেন বুড়িগঙ্গা নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভ্রমণকালে সন্নিহিত জঙ্গলে হিন্দু দেবী দুর্গার একটি বিগ্রহ খুঁজে পান। দেবী দুর্গার প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ রাজা বল্লাল সেন ঐ এলাকায় একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। যেহেতু দেবীর বিগ্রহ ঢাকা বা গুপ্ত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া গিয়েছিলো তাই রাজা বল্লাল সেন মন্দিরের নাম রাখেন ঢাকেশ্বরী মন্দির। মন্দিরের নাম থেকেই কালক্রমে স্থানটির নাম ঢাকা হিসেবে গড়ে ওঠে।এছাড়াও অনেক বিজ্ঞদের মতে , মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকাকে সুবাহ্ বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং উড়িষ্যার বেশকিছু অঞ্চল) রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন; তখন সুবাদার ইসলাম খান আনন্দের বহিঃপ্রকাশস্বরূপ শহরে ঢাক বাজানোর নির্দেশ দেন। এই ঢাক বাজানোর কাহিনী লোকমুখে কিংবদন্তির রূপ নেয় এবং তা থেকেই শহরের নাম ‘ঢাকা’ হয়ে যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, মুঘল সাম্রাজ্যের বেশ কিছু সময় ঢাকা সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রতি সম্মান জানিয়ে জাহাঙ্গীরনগর নামে পরিচিত ছিলো।

আটটি মেট্রোপলিটন থানা নিয়ে পুরান ঢাকার গঠিত। এগুলো হলঃ হাজারীবাগ, লালবাগ, চকবাজার, বংশাল, কোতোয়ালী, সূত্রাপুর, ওয়ারী ও গেন্ডারিয়া। বর্তমানে পুরান ঢাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত একটি অঞ্চল।

পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানের নামকরণ নিয়ে রয়েছে বৈচিত্রতা। যারা কাঠের কাজ করতেন তারা সূত্রধর নামে পরিচিত ছিলেন।  প্রাচীন ঢাকার ঘরবাড়ি,  যানবাহন,  নওগাঁ  ইত্যাদি দারুশিল্পের নির্মাণের সূত্রধর যে এলাকায় বসবাস শুরু করেছিলেন,  তাদের নামের অনুসারে এলাকাটির নাম হয় সূত্রাপুর।  এরকম আরো বিভিন্ন  এলাকা রয়েছে যাদের নামের পেছনে কোন না কোন কারণ রয়েছে।  যেমন,  রোকনপুর, ইসলামপুর,  আজিমপুর  , মাহুতটুলি,  বাদামতলী,  টিকাটুলি,  নিমতলী,  মালিটোলা,  ফরাসগঞ্জ,  রহমতগঞ্জ,  আলমগঞ্জ,  শরাফতগঞ্জ   ইত্যাদি। এই এলাকাগুলো ছাড়াও পুরান ঢাকায় আছে আরও অনেক এলাকা, আরও অনেক ইতিহাস। বলতে গেলে, পুরান ঢাকা স্বয়ং একটি জীবন্ত ইতিহাস।

পুরনো ঢাকার শত বছরের পুরোনো স্থাপনাগুলো এখনো মাথা উঁচু করে জানান দিচ্ছে ঢাকার সংস্কৃতির ঐতিহ্য। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, রূপলাল হাউস, আর্মেনীয় গির্জা, বড় কাটরা, ছোট কাটরা, বাহাদুর শাহ পার্ক, শাঁখারীবাজার, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল, হোসনি দালান, তারা মসজিদ, শায়েস্তা খাঁ জামে মসজিদ, বেগম বাজার মসজিদ, খান মুহাম্মদ মসজিদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, হিঙ্গা বিবির মসজিদ ও চকবাজার শাহী মসজিদ। পুরান ঢাকার ঐতিহ্যের সুরম্য আধার বলা হয় আহসান মঞ্জিলকে।পুরান ঢাকার ইসলামপুরের কুমারটুলীতে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ১৮৫৯ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন নওয়াব আবদুল গনি। মুঘল কিংবা সুলতানি স্থাপত্যের নিদর্শন না হলেও দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে আরমানিটোলার তারা মসজিদ। এটি ঢাকার নান্দনিক মসজিদগুলোর একটি। মির্জা গোলাম পীর ওরফে মির্জা আহমেদ জান নামে এক ব্যবসায়ী এর নির্মাতা বলে জানা গেছে। আরেকটি অপূর্ব নিদর্শন হলো লালবাগ কেল্লা। মোগল আমলে স্থাপিত এই দুর্গটির প্রথমে নাম ছিল কেল্লা আওরঙ্গবাদ। ১৮৪৪ সালে ঢাকা কমিটি নামে একটি আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্গের উন্নয়নে কাজ শুরু করে। সে সময় থেকে দুর্গটি লালবাগ দুর্গ নামে পরিচিতি লাভ করে। অনেকে মনে করেন এটি পুরান ঢাকার লালবাগে অবস্থিত। আর তাই এর নামকরণ করা হয়েছে লালবাগ কেল্লা।

এছাড়াও ব্যবসার  প্রাণকেন্দ্র হিসেবে  যথেষ্ট খ্যাতি রয়েছে।  ইসলামপুর দেশের বৃহত্তম পাইকারি কাপড়ের বাজার। কাঁচা ও নিত্যপণ্যের আরেক স্থান হলো শ্যামবাজার, ফরাশগঞ্জ, রহমতগঞ্জ। কসমেটিকস, খেলনা, প্লাস্টিকসামগ্রী ও নানা ডিজাইনের ঘর সাজানোর উপকরণের পাইকারি বাজার চকবাজার ও মৌলভীবাজার।

পুরান ঢাকার ছানা মাঠা,  সাকরাইন,  বাকরখানি,  টমটম,  পঞ্চায়েত প্রথা,  আর বিরিয়ানি এখনো প্রতাপ এর সাথে টিকে আছে।