যে নিষ্ঠুর নির্মম নির্যাতন চলেছিল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও তার সঙ্গীদের উপর (পর্ব-০২)

পর্ব-০২

সাদ এর মা প্রথম দিন কোন কিছু নাখেয়ে পারকরে দিলেন। পরের দিন তার মা দুর্বল হয়ে পড়লেন। দ্বিতীয় দিনেও পার হল কিন্তু তার মা কিছুই খেলো না। একইভাবে তৃতীয় দিন পার হলো। চতুর্থ দিন সকালে তিনি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে গেছেন। সাদ মায়ের বিছানায় বসে বললেন, মা! আল্লাহর শপথ! তোমার যদি একশটা জীবন থাকে এবং প্রতিবারই তুমি না খেয়ে মারা যাও তবুও আমি আমার ধর্মত্যাগ করব না। এখন তুমি এই খাবার ইচ্ছা হলে খেতে পারো। ইচ্ছা না হলে খাবে না। তখন তিনি খাবার গ্রহণ করলেন। সাদের পরীক্ষা যে খুব কঠিন ছিল তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। কিন্তু তিনি বিশ্বাসের সাথে তা মোকাবেলা করেন। এই প্রেক্ষাপটে আয়াত নাজিল হয় –

‘আমি মানুষকে বাবা-মার সাথে সম্মানজনক আচরণ ও খেদমত করার নির্দেশ দিয়েছি। কিন্তু তারা যদি আমার সাথে উপাস্য হিসেবে কোনো কিছুকে শরিক করার জন্যে চাপ দেয়, তবে তা কখনো মানবে না।’ (সূরা আনকাবুত : ৮)

ইসলামের জন্য শহীদ

ইসলামের প্রথম শহিদ একজন নারী। বনু মাখজুম গোত্র ক্রীতদাস আম্মার, তার বাবা ইয়াসির ও তার মা সুমাইয়াকে আগে ধর্মে ফিরিয়ে আনার জন্য ‘রামাদার’ তপ্ত মরুতে নিয়ে গেল। আম্মারকে খালি গায়ে লোহার পাতের বর্ম পরিয়ে তপ্ত মরুতে শোয়ানো হলো। তার ত্বক ও মাংসপেশীতে সাথে সাথে ফোসকা পড়ে গেল। একই নির্যাতনের শিকার হলো পুরো পরিবার। কিন্তু তারা বিশ্বাসের ছিল প্রবল। তাদের বিশ্বাসের কোন ফাটল ধরেনি। নিষ্ঠুর নির্যাতনের পরও সুমাইয়াকে বিশ্বাসচ্যুত করতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষোভে ক্রুদ্ধ হয়ে আবু জেহেল বর্শা দিয়ে বুকে আঘাত করে তাকে হত্যা করল।

মক্কার কর্মকার খাব্বাব ইবনে আল আরাতকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্যে চু্ল্লি থেকে তোলা জ্বলন্ত কয়লার ওপর হাত পা বেঁধে শোয়ানো হলো। একজন তার বুকের উপর পা দিয়ে সজোরে চেপে রাখলো। কয়লার তাপে তার শরীরের রক্ত মাংস চামড়া গলে গিয়ে এমন অবস্থার সৃষ্টি হল যে তাতে আগুন পর্যন্ত নিভে গেল। এই ঘটনা ঘটার ২৭ বছর পর খলিফা ওমর একদিন তাকে জিজ্ঞেস করছিলেন তার উপর যে নির্যাতন হয়েছে সেই সম্পর্কে। খাব্বাব শুধু জামা তুলে পিঠ দেখিয়েছিলেন। পিঠের পোড়া গর্তগুলো দেখে ওমর গভীর বেদনাহত হয়ে বলেছিলেন, ‘আমি জীবনে এমন নিষ্ঠুরতা দেখি নি!’ । মক্কায় ইসলাম গ্রহণকারী দাস ও সহায়হীনদের ওপর নিষ্ঠুর-নির্মম নির্যাতন তখন হয়ে ওঠে নিত্যদিনের ঘটনা।

বর্বরতার প্রতিবাদে শুরু হল ইসলাম গ্রহণ

এরকম বর্বর অমানুষিক নির্যাতনের পরেও সাধারণ মানুষের পবিত্র ধর্ম ইসলামের প্রতি আকর্ষণ আরো বাড়তে লাগলো। প্রতিদিনই কেউ-না-কেউ ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করল। শুধু দাস-দাসী বঞ্চিতদের মধ্যে থেকেই নয়, এমনকি অভিজাত পরিবার গুলোর ভালো মানুষরাও ঝুকে পড়ল এই ইসলাম ধর্মের দিকে। যেহেতু অভিজাত পরিবারের লোকজন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করছিল এবং দিন দিন তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল তাই শোষকশ্রেণী চিন্তা করল যে ভবিষ্যতে মুসলমানরা একত্রিত হলে তাদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই এদের সমূলে বিনাশ করার জন্যে চরমপন্থা গ্রহণে অন্যদের প্ররোচিত করতে শুরু করল। নবীজী তখন অনুসারীদের একটা বড় অংশকে আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইরিত্রিয়া) প্রেরণের এক দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিলেন। এ সিদ্ধান্তের ফলে চরমপন্থী বিরোধীদের উদ্বেগ কমানো একটি উদ্দেশ্য ছিল।

হিজরতের ফলে মক্কায় মুসলমানদের সংখ্যা কমে যাবে। এর ফলে বিরোধীরা অবশিষ্টদের কোন হুমকি মনে করবে না। আবার অন্যদিকে মক্কার বাইরে ও ইসলাম ধর্মের অনুশীলন এবং প্রচার এর কাজটি পরিচালনা করার জন্য একটি নিরাপদ কেন্দ্র স্থাপন করা যাবে। সাধারণভাবে মনে করা হয়, দৈহিক নির্যাতনের হাত থেকে সামাজিকভাবে দুর্বল অনুসারীদের জীবন রক্ষাই ছিল এই হিজরতের উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রাথমিকভাবে হিজরতকারীদের তালিকার দিকে তাকালেই বোঝা যায়, শুধু জীবন রক্ষা নয়, মূল উদ্দেশ্য ছিল নতুন ভূখন্ডে আল্লাহর বাণীকে বিশ্বাসের সাথে ছড়িয়ে দেওয়া।

(চলবে)