যে নিষ্ঠুর নির্মম নির্যাতন চলেছিল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও তার সঙ্গীদের উপর (পর্ব-০৩)

পর্ব-০৩

হিজরতের তার দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে দেখতে পাই এই তালিকায় ছিলেন উমাইয়া গোত্রের উসমান ইবনে আফফান, আবদ শামস গোত্রের আবু হুজাইফা ইবনে উতবা যার পিতা ছিলেন মক্কার একজন গোত্রপ্রধান, আসাদ গোত্রের আল জুবাইর ইবনে আওয়াম, জোহরা গোত্রের আবদুর রহমান ইবনে আউফ, মাখজুমি গোত্রের আবদুল্লাহ ইবনে আবদ আল আসাদ, ফিহির গোত্রের সুহাইল ইবনে ওয়াহাব, আবদ আল দর গোত্রের মুসআব ইবনে উমাইর, হাশিম গোত্রের জাফর ইবনে আবু তালিব। এই তালিকার সবাই ছিলেন কুরাইশ বংশের। এবং এদের পরিবার মক্কার বিভিন্ন স্থানের ক্ষমতার আসনে প্রতিষ্ঠিত ছিল। তখনকার আরবের গোত্রীয় রীতি অনুসারে দাস ও গরিবদের ওপর যে অমানুষিক দৈহিক নির্যাতন করা সহজ তা এদের ওপর করা তত সহজ ছিল না।

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর পরামর্শে যাতে নির্বিঘ্নে আল্লাহর এবাদত বন্দেগী করা যায় সেই প্রত্যাশায় উসমান ইবনে আফফান প্রথম হিজরতকারী হিসেবে মক্কা ত্যাগ করেন। তার সাথে ছিলেন স্ত্রী নবীকন্যা রুকাইয়া। এ দলে উসমান ইবনে মাজউন, আমির ইবনে রাবিয়া ও তার স্ত্রী লায়লা, উম্মে সালমা, মুসআব ইবনে উমাইর, আবু সাবরা, আবু হুজাইফা ও তার স্ত্রী শাহলা, আবু সালামা, জুবাইর ইবনে আওয়াম, আবদুর রহমান ইবনে আউফ-সহ ছিলেন ১৫ জন। দলনেতা ছিলেন উসমান ইবনে মাজউন। পরবর্তী সময়ে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে মোট ৮২ জন আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। তিনি হিজরতকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, তোমরা এমন এক দেশে যাচ্ছ যেখানকার রাজা কারো উপর অবিচার করেন না। তাঁর এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি চারপাশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবেই খোঁজখবর রাখতেন।

আবিসিনিয়ার উদ্দেশ্যে সবচেয়ে বড় দলটি হিজরত করে জাফর ইবনে আবু তালিবের নেতৃত্বে। কোরাইশরা এদের ফেরত আনার জন্যে আমর ইবনুল আসের নেতৃত্বে শক্তিশালী প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে আবিসিনিয়ার রাজা নাজ্জাসীর দরবারে। রাজ দরবারে রাজার প্রশ্নের জবাবে জাফর ইবনে আবু তালিব মুসলমানদের ওপর কোরাইশদের নির্যাতনের মর্মস্পর্শী বিবরণ দেন। তিনি বলেন : ‘মহামান্য রাজা! নিকট অতীতে আমরা মূর্খ ছিলাম। আমরা মূর্তিপূজা করতাম। যে-কোনো মৃত প্রাণীর মাংস খেতাম। সব ধরনের পাপাচারে নিমজ্জিত ছিলাম। আত্মীয়তার সম্পর্ক খুব সহজেই ছিন্ন করতাম। প্রতিবেশীদের সাথে মন্দ আচরণ করতাম। সবলরা দুর্বলের সম্পত্তি হজম করে ফেলতাম। আমাদের রীতি ছিল জোর যার মুল্লুক তার। জাফর ইবনে আবু তালিব বলেন : আমাদের এই অধঃপতিত অবস্থায় আল্লাহ আমাদের মধ্য থেকেই একজনকে নবী হিসেবে পাঠালেন। তাঁর সততা, সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা সম্পর্কে আমরা পূর্ব থেকেই জানতাম। তিনি আমাদেরকে এক আল্লাহর উপাসনা করতে বললেন। তাই আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের সকল উপাস্যকে বর্জন করলাম। শুধু এক আল্লাহকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করলাম। তিনি আরো নির্দেশ দিলেন, তোমরা সত্য কথা বলবে। আমানত রক্ষা করবে। আত্মীয়তার সম্পর্ক মজবুত রাখবে। প্রতিবেশীদের প্রতি সমমর্মী আচরণ করবে। অন্যায় রক্তপাত থেকে দূরে থাকবে। পরকীয়া-ব্যভিচার ও অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকবে। এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করবে না। সতী নারীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচারে লিপ্ত হবে না। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা শুধু এক আল্লাহরই উপাসনা করবে। আর কোনোকিছুকে উপাস্য বানাবে না।’ তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা নামাজ আদায় করবে। নিয়মিত দান করবে। রোজা রাখবে। …’। জাফর আরো বলেন, ‘আমরা তাঁর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করলাম এবং আমরা আল্লাহর প্রেরিত ধর্ম অনুসরণ শুরু করলাম। তিনি আমাদের জন্যে যা নিষিদ্ধ করেছেন, তা আমরা বর্জন করলাম। আর তিনি যা বৈধ করেছেন তা করণীয়রূপে গ্রহণ করলাম। এরপর আমাদের স্বগোত্রীয়রাই আমাদের সাথে শত্রুতা শুরু করল। আল্লাহর পরিবর্তে আগের মতোই মূর্তিপূজায় ফিরে যাওয়া, আগের মতোই সকল অনাচারে লিপ্ত হতে বাধ্য করার জন্যে তারা সকল ধরনের বর্বর নির্যাতন শুরু করল। তখন আমাদের নবী নির্দেশ দিলেন আপনার দেশে আশ্রয় নেয়ার জন্যে। মহানুভব রাজা! আমরা বিশ্বাস করি আপনার কাছে আমরা আশ্রয় ও সুবিচার পাব।’

(চলবে)