যে নিষ্ঠুর নির্মম নির্যাতন চলেছিল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও তার সঙ্গীদের উপর (পর্ব-০৪)

পর্ব-০৪ 

রাজা নাজ্জাসী কোরাইশদের হাতে হিজরতকারীদের প্রত্যর্পণ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলেন। হিজরতকারীরা আবিসিনিয়ায় বসবাস শুরু করলেন। ধর্ম পালন এবং ধর্ম প্রচারের কাজে মনোযোগী হলেন। স্বাভাবিকভাবে সেখানেও তারা অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছিলেন। জাফর তার মিশনের কাজ সমাপ্ত করে সদলবলে আবিসিনিয়ান মুসলমানদের নিয়ে খায়বরের যুদ্ধের পর মদিনায় ফিরে আসেন।

শত লাঞ্ছনা শয়েও বিশ্বাসে অটল

একদিন নবীজিকে আবু জেহেল দেখতে পেয়ে তাকে ইচ্ছামত গালিগালাজ ও লাঞ্ছিত করেন। নবীজি আবু জেহেলের কোন উত্তর না দিয়ে চুপচাপ ওই স্থান ত্যাগ করেন। ওই দিনই নবীজির চাচা ও দুধ ভাই হামজা শিকার শেষ করে ঘরে ফিরছিলেন। তিনি ছিলেন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা ও শিকারি। তিনি সবসময় শিকার শেষ করে কাবায় আসতেন এবং এখানে উপাসনা করে বাড়ী ফিরতেন। সেদিন তিনি কাবার প্রবেশ পথে এসেই ঘটনাটি শুনেন এবং শুনে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। তিনি আবার অঙ্গনে প্রবেশ করতেই আবু জেহেলকে সামনে পেয়ে যান এবং তার ধনুক দিয়ে আঘাত করেন। তিনি ওই সময়েই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার ঘোষণা দেন। এবং আবু জেহেলকে বলেন, সাহস থাকলে এবার আমাকে আঘাত করো। আবু জেহেল তখন ভয়ে নিশ্চুপ। এটি নবুয়তের ষষ্ঠ বছরের ঘটনা।

হামজার ইসলাম গ্রহণের তিন দিন পর ওমর বিন খাত্তাব উন্মুক্ত তলোয়ার হাতে ছুটলেন নবীজীকে হত্যা করার জন্যে। তোমার যেমন শক্তিশালী ছিলেন তেমনি তিনি আবেগপ্রবণ মানুষও ছিলেন। রাজা নাজ্জাসী মুসলমানদের আশ্রয় দেয়ায় তার ক্ষোভ চরম আকার ধারণ করেছিল। তিনি পুরুষদের কোরাইশদের এই সকল সমস্যার মূল হিসেবে নবীজিকে চিহ্নিত করলেন। এবং তিনি ভাবতে শুরু করলেন নবীজীকে হত্যার মধ্য দিয়ে সব সমস্যার সমাধান তিনি করে ফেলবেন। তিনি খবর পেলেন নবীজি ও তার অনুসারীরা সাফা এলাকার একটি ঘরে বৈঠক করছেন। উন্মুক্ত তলোয়ার নিয়ে ওই এলাকার দিকে যাত্রা শুরু করলো ওমর। পথে নুয়াম ইবনে আবদুল্লাহর সাথে দেখা।

নুয়াম ওমরের ইচ্ছে জানতে পারার পরে বললেন, ‘ওমর আত্মপ্রতারণা কোরো না। আগে তো ঘর সামলাও।’ ওমর নুয়ামের কাছ থেকে জানতে পারলেন যে, ইতিমধ্যেই তার বোন ফাতেমা ও বোনের স্বামী সাঈদ ইবনে জায়িদ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে গেছে। এবার ওমর তার লক্ষ্য পরিবর্তন করে বোনের বাড়ীর দিকে ছুটলেন। তিনি তার বোনের বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে শুনলেন পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত হচ্ছে। ওমরের আওয়াজ পেয়েই তারা কোরআন ও তেলাওয়াতরত অতিথি দুজনকেই লুকিয়ে ফেললেন।

ওমরের মনপরিবর্তন

যা পড়া হচ্ছিল সেই কোরআন চাইলেন ওমর। ফাতেমা ও সাঈদ তেমন কোনোকিছুর কথা অস্বীকার করলেন। ওমর প্রচন্ড রেগে গিয়ে সাঈদকে মারতে শুরু করলেন। স্বামীকে বাঁচাতে দুজনের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালেন ফাতেমা। ফাতেমার মাথায় আঘাত লাগলো। রক্তাক্ত হয়ে গেল ফাতেমার মাথা। রক্ত দেখার পরে ফাতেমা ও তার স্বামীর দুজনের মন থেকে সকল ভয় দূর হয়ে গেল। তারা দুজনেই একসাথে বলল- ঠিক, আমরা মুসলমান হয়ে গেছি, তুমি যা পারো করো। দুজনের আত্মবিশ্বাস , সাহস, ও বোনের রক্তমাখা চেহারা দেখে ওমর ক্ষণিকের জন্য থমকে গেলেন। এরপর একটু শান্ত হয়ে ওমর বললেনঃ ঠিক আছে। যা পড়ছিলে আমাকে দাও। হাতে পাওয়ার পর ওমর পড়তে শুরু করলেন। ওমর মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তার চিন্তার জগত পুরোপুরি বদলে গেল। তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবেন। সেখান থেকেই তিনি রওনা করলেন আস সাফা এলাকায় আরকাম-এর ঘরে। নবীজীর সামনে এসে ইসলাম গ্রহণ করার ঘোষণা দিলেন। হামজার পর পরই ওমরের ইসলাম গ্রহণ মক্কার সামাজিক হিসাব নিকাশে একটা ঝাঁকুনি সৃষ্টি করল। এতদিন পর্যন্ত মুসলমানরা সকল ধরনের ইবাদত বন্দেগী গোপন করে আসছিল। তাও আবার মক্কা থেকে দূরে গিয়ে। কিন্তু এবার তারা সাহসী হয়ে উঠলো। কাবাঘরের সামনেই নামাজ পড়তে শুরু করল। বিশ্বাসের জন্যে আরো ত্যাগ স্বীকারে তাদের প্রস্তুতি ও প্রত্যয় দুটোই বেড়ে গেল।

(চলবে)