যে নিষ্ঠুর নির্মম নির্যাতন চলেছিল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও তার সঙ্গীদের উপর (পর্ব-০৫)

পর্ব-০৫ 

আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ কোরাইশরা ইসলামের প্রভাব সম্পর্কে বুঝতে পারছিল। তাই তারা এই প্রভাব নষ্ট করার জন্য এবং আরবের মানুষ যাতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করে বা ইসলাম থেকে দূরে রাখার জন্য তারা শুরু করল নতুন ও নির্মম চক্রান্ত। ইতিমধ্যে তারা বুঝে ফেলল যে, শুধু অপপ্রচার ও নির্যাতন দিয়েই ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করা যাবে না। ইসলাম গ্রহণকারীদেরকে কঠোরভাবে একঘরে করতে হবে। তারা কঠোর অবরোধের ব্যবস্থা করলো। এই অবরোধ যেমন ছিল অর্থনৈতিক তেমনি ছিল সামাজিক। নবীজির নবুয়ত প্রাপ্তির সপ্তম বছরে এসে কুরাইশরা আরবের সব গোত্রের সাথে একটি লিখিত চুক্তি করলো। চুক্তিটি এই যে, কেউ মুসলমান এবং বনু হাশিম ও আবদুল মুত্তালিব গোত্রের সাথে কোন প্রকার যোগাযোগ রাখবে না। এমনকি তাদের কোন বিয়ে-শাদি অনুষ্ঠানে যাওয়া যাবে না। কোন কেনাবেচাও করা যাবে না। কোন খাদ্য বিক্রি করা যাবে না। সকল পক্ষ থেকে স্বাক্ষরিত দলিলটি খুব যত্ন সহকারে কাবাঘরে সংরক্ষণ করা হলো।

আবু তালিবের সাথে গোত্রের সবাই শিবে আবু তালিবের পাহাড়ি উপত্যকায় আশ্রয় নিল (শুধু আবু লাহাবের পরিবার ছাড়া)। মক্কার বিভিন্ন স্থানের মুসলমানরাও সেখানে জড়ো হলো। শিবে আবু তালিবের অবরুদ্ধ জীবন ছিল তিন বছর। সেই সময়টিতে তাদের অবর্ণনীয় দুর্দশার দুঃখ কষ্ট ছিল। কুরাইশরা যদি জানতে পারত কেউ তাদেরকে খাবার দিতে যাচ্ছে তাহলে সাথে সাথে তাদেরকে বাধা দিতো। সেখানে খাবার নিয়ে যেতে দিত না। খাবারের অভাবে ক্ষুধার জ্বালায় শিশুরা চিৎকার করে কাঁদতে। তাদের সেই চিৎকার মক্কা থেকেও শোনা যেত। জুলুম নির্যাতনের ফলে তাদের দুর্দশা কতটা চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল তা সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস-এর একটি ঘটনা থেকে বোঝা যায়। তিনি বলেন, আমি এক রাতে পেশাব করার জন্যে বাইরে এসেছি। পেশাব করছি। একটু ভিন্ন ধরনের শব্দ পেলাম। চাঁদের আলোয় ভালো করে তাকালাম। দেখি, উটের এক টুকরো শুকনো চামড়া। আমি তুলে নিলাম। পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে আগুনে ভালো করে ঝলসে পরে পানিতে ভিজিয়ে জীর্ণ করে খেলাম। পরবর্তী তিন দিনের জন্যে এটাই ছিল আমার খাবার। গাছের পাতা, ছালবাকল, ছাড়া তাদের অধিকাংশেরই খাওয়ার তেমন কিছুই ছিলো না অবরোধের শেষ কয়েক মাস। তাদের শারীরিক অবস্থা এতটাই শোচনীয় হয়ে পড়েছিল যে তাদের কারোরই চেহারা তখন চেনা যেত না।

এমনই এক কষ্টদায়ক ঘোর দুঃসময় নবীজি একদিন ধ্যানরত অবস্থায় দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পেলেন যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো উইপোকা দলিলের সবটুকু অংশ খেয়ে ফেলেছে শুধুমাত্র ‘আল্লাহুম্মা বিসমিকা’ শব্দটি ছাড়া। আবু তালিব এ কথা শোনার পর কুরাইশদের কাছে গেলেন। আবু তালিবকে দেখে কোরাইশরা উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল এই ভেবে যে, নিশ্চয়ই এবার আত্মসমর্পণ করতে এসেছে। কিন্তু তিনি তাদেরকে বললেন, দেখ আমার ভাতিজা দিব্যদৃষ্টিতে দেখেছে, তোমাদের দলিল পোকায় খেয়ে ফেলেছে, শুধু আল্লাহর নামটুকু ছাড়া। তার কথা যদি সত্য হয় তবে তোমরা বয়কট তুলে নেবে। আর যদি মিথ্যা হয় তবে আমি আমার ভাতিজাকে তোমাদের হাতে তুলে দেবো। দলিলটি তিন স্তরে মোহরকৃৎ ছিলো । এবং লেখা ছিল পার্চমেন্ট কাগজে। সংরক্ষণের পর এটি কেউ দেখেনি এমন কি কেউ স্পর্শও করেনি। ফলে তারা আত্মবিশ্বাসি ছিল যে দলিলটি কোনভাবেই নষ্ট হতে পারে না। তাই তারা প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলো।

আবু তালিবকে সাথে নিয়ে আবুজেহেলের নেতৃত্বে সবাই কাবায় প্রবেশ করল। এর যখন দলিলের সিলগালা খোলা হলো তখন সবাই বিস্ময়ে হতবাক। পুরো দলিল পোকায় খেয়ে ফেলেছে শুধু ‘আল্লাহুমা বিসমিকা’ শব্দ দুটি ছাড়া। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আবু জেহেল প্রথমে সরে পড়তে চাইলেন। কিন্তু যখন অনিচ্ছাসত্ত্বেও দলিলে স্বাক্ষরকারী অন্যান্য গোত্রপতিরা চাপ দিল—এখন যেখানে দলিলই নেই বয়কট থাকারও কোনো যুক্তি নেই। তাই বয়কটের অবসান হোক। অগত্যা বয়কট উঠে গেল। মুসলমানরা মনে করল, এবার শুরু হবে তাদের সুসময়। তিন বছরের দুঃসহ অবরোধ অবসানে কোরাইশ গোত্রভুক্ত হিশাম ইবনে আমর, জুহায়ের ইবনে আবু উমাইয়া, আল মুতিম ইবনে আদী, জামাহ ইবনে আল আসওয়াদ ও আবুল বখতারী ইবনে হিশাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব গোত্রের সদস্যরা নিজ নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করল। মুসলমানরাও ফিরে গেল যার যার এলাকায়। সামাজিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ কিছুটা স্বাভাবিক হলো।

প্রতিপক্ষের নির্মম নির্যাতনের মুখেও অহিংস প্রতিরোধ অর্থাৎ সকল নির্যাতন সহ্য করেও নিজের বিশ্বাসে অটল থাকা এবং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কোন হিংসাত্মক পদক্ষেপ না নেয়ার যে নীতি তার সার্থকতা এবং কার্যকারিতা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রমাণিত হলো। কোরাইশদের নির্মম নির্যাতনের কারণে মুসলমানদের প্রতি আরবের সাধারণ মানুষের সহানুভূতি এবং আগ্রহ বেড়ে গেল। শুধু মক্কায় নয় দুর্গম মরুর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে যেতে থাকলো আল্লাহর পক্ষ থেকে এই পবিত্র বাণী। সব স্থান থেকেই ইসলাম গ্রহণের সংখ্যা বেড়ে গেল। কোরাইশরা অবরোধের লক্ষ্য অর্জনে শুধু পুরোপুরি ব্যর্থই হয়নি। বরং অবরোধ উল্টো ইসলাম সম্পর্কে মানুষের কৌতূহলকেই বাড়িয়ে দিল। তবে ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে নির্যাতন এবং আঘাত থেকে অনুসারীদের কোনো নিরাপত্তা ছিল না। তবুও নবীজি প্রতিটি সুযোগ গ্রহণ করেছেন। অবরোধ মুক্তির স্বস্তির আবহ কাটতে না কাটতেই ঘটলো এক বিয়োগান্তক ঘটনা। সকল বিপদ-আপদ ও প্রতিকূলতার মুখে মুহাম্মদকে (স) ‘সুরক্ষা’ প্রদানকারী চাচা আবু তালিব মারা গেলেন। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

(চলবে)