যে নিষ্ঠুর নির্মম নির্যাতন চলেছিল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও তার সঙ্গীদের উপর (পর্ব-০৬)

শেষ পর্ব 

আবু তালিবের মৃত্যুর শোক কাটতে না কাটতেই কয়েকদিনের মধ্যে নবীজি (সাঃ)-র জীবনের সবচেয়ে শোকাবহ ঘটনাটি ঘটলো। তাঁর ২৫ বছরের দাম্পত্য জীবনের আনন্দ হাসি বেদনার, নবুয়তের মুহূর্ত থেকে সকল সময়ের সকল সংগ্রামের সহযোদ্ধা, সকল নিপীড়নের সমব্যথী, সকল কল্যাণকর্মে সমমর্মী খাদিজা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। এই বুদ্ধিমতি, ধনী নারী সকল সম্পদ ব্যয় করেছেন স্বামীর ধর্মপ্রচারে। অবরুদ্ধ জীবনে অর্ধাহার, অনাহারে তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। অবরোধমুক্ত হলেও তিন বছরের কষ্টের ধকল আর সামলে উঠতে পারেননি। নবীজী আমৃত্যু খাদিজাকেই ভালবাসতেন।

সর্বত্র শোক

নবীজির নবুয়ত লাভের দশম বছর কার্যত হয়ে উঠল শোকের বছর। প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর মৃত্যু অপর দিকে চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর ফলে অবিশ্বাসীদের তরফ থেকে নতুন হুমকির মুখে তিনি মক্কার বাইরে আল্লাহর বাণী প্রচারের সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভাবলেন মক্কার বাইরে যদি মুসলমানদের সংখ্যা বাড়ানো যায় তাহলে এক ধরনের ভারসাম্য সৃষ্টি হবে। মক্কায় অবস্থানরত মুসলমানদের উপর নির্যাতনের মাত্রা কমাতে সাহায্য করবে। তাই তিনি একদিন গোপনে শুধু জায়েদকে সাথে নিয়ে মক্কা থেকে ১১০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত তায়েফে পৌঁছলেন। বাগান বেষ্টিত তায়েফের বাজারে যখন নবীজি পৌছলেন তখন সেখানে মজলিস জমে গেছে। নবীজি যেখানে আল্লাহ ও তাঁর বাণীর কথা বলা শুরু করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে সাকিফ গোত্রের অভিজাত কয়েকজন শুরু করল গালিগালাজ।

তায়েফ থেকে তাঁকে বিতাড়িত করার জন্যে লেলিয়ে দিল দাস ও বখাটে ছেলেদের। বখাটেরা ঢিল ও পাথর মারতে মারতে তাড়া করল তাঁদের। তাদের নিক্ষিপ্ত ঢিল ও পাথরের আঘাতে নবীজী রক্তাক্ত হলেন। নবীজিকে ঢিলের আঘাতে থেকে রক্ষা করার জন্য জায়েদ আপ্রাণ চেষ্টা করল এবং সে নিজেও আহত হলেন। শেষ পর্যন্ত তারা কোনমতে দৌড়ে শহরের উপকণ্ঠে এক বাগানের দেয়ালের পাশে বসে পড়লেন । নবীজি তখন একটু স্থির হয়ে আল্লাহর কাছে আবেগভারাক্রান্ত হৃদয়ে দোয়া করলেন। জিবরাইল আল্লাহর বাণী নিয়ে এলেন। বললেন, আপনি বললে পুরো তায়েফকেই পাহাড়সহ উল্টে ধ্বংস করে দিতে পারি। কিন্তু এভাবে নির্যাতিত হয়েও নবীজী তৎক্ষণাৎ বললেন, না! না! এই অবাধ্যদের মধ্য থেকেই একদিন হয়তো এমন প্রজন্মের উদ্ভব ঘটবে, যারা এক আল্লাহর উপাসনা করবে।

পূর্ণ আস্থা একমাত্র পন্থা

আল্লাহ যদি চান তাহলে মানুষের যে কোন দুঃখের সময়েও আল্লাহ সাফল্য দিতে পারবে । নবীজি যখন বাগানে বিশ্রাম করছিলেন, তখন বাগানের মালিক মক্কার উতবা ও শায়বা দূর থেকে তার অবস্থা দেখে তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে তাদের খ্রিস্টান দাস আদ্দাসকে দিয়ে এক প্লেটে এক থোকা আঙুর খাওয়ার জন্যে পাঠাল। আঙ্গুর পাঠানোর সময় দাস কে সতর্ক করে দিলেন যেন নবীজির কথায় তিনি কান না দেন। কিন্তু নবীজী ‘বিসমিল্লাহ’ বলে একটা আঙুর মুখে তুলতেই আদ্দাস তাঁকে ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করল। উত্তরে মুগ্ধ হয়ে আদ্দাস ইসলাম দর্ম গ্রহণ করে।

আসলে যুগে যুগে কালে কালে যারা সত্য বাণী প্রচার করতে গিয়েছেন, যারা আল্লাহর বাণী প্রচার করতে গিয়েছেন তারা নানা বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছেন। কখনো কখনো নির্যাতনের মাত্রা এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল যে, এ বিষয়ে আল্লাহ নিজেই পবিত্র কোরানে বলেছেন , ‘তোমাদের পূর্ববর্তী বিশ্বাসীরা অভাব, কষ্ট, বিপদ, মুসিবত এবং অত্যাচার-নির্যাতনে এতটাই হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিল যে, নবীসহ তারা আর্তনাদ করে বলেছিল, আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে? জেনে রাখো, আল্লাহর সাহায্য সবসময় খুবই কাছে।’ (সূরা বাকারা, আয়াত ২১৪)।

সুতরাং আল্লাহর বাণী প্রচার করতে গিয়ে, মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে গিয়ে নানা ধরনের বাধা বিপত্তি, কষ্ট যন্ত্রণা সম্মুক্ষিনের ঘটনা আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই। তবে ভয় না পেয়ে মহান রাব্বুল আলামীন এর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস ও ভরসা রেখে কাজ চালিয়ে গেলে আল্লাহ নিজেই বলছেন যে, আল্লাহর সাহায্য করবেন। এবং এই ক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে নবীজি ও তার সঙ্গীরা। অমানুষিক নির্যাতনের পরেও আল্লাহর রাস্তা থেকে তাঁরা বিন্দু পরিমাণ সরে যাননি। মহান রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে সঠিক পথে চলার তৌফিক দান করুন। মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে কবুল করুক।