যে নিষ্ঠুর নির্মম নির্যাতন চলেছিল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ও তার সঙ্গীদের উপর

পর্ব-০১ 

অন্ধকার যুগে, জাহেলিয়াতের যুগে মানুষকে আলোর পথ দেখানোর জন্য মহান রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে সৃষ্টি জগতের জন্য রহমত স্বরূপ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে প্রেরণ করা হয়েছিল। নবীজি নবুওয়াত লাভের পরে যখন তিনি আল্লাহর বাণী সবার কাছে পৌঁছে দিতে গেলেন তখন প্রচন্ড নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। সেই অমানুষিক নির্মম নির্যাতনের পরেও নবীজি তার বিশ্বাসের স্থলে শতভাগ অটল ছিলেন। তবে শুধু নবীজি একা নয় তার সাথে যারা ছিলেন তাদের ওপরেও অমানুষিক, নির্মম-নিষ্ঠুর নির্যাতন নেমে এসেছিল।

নবুওয়াত লাভের পর নবীজি যখন প্রকাশ্যে আল্লাহর বাণী প্রচার করতে থাকেন, তখন কোরাইশ চক্র বুঝতে পেরেছিল যে মানুষ যদি আল্লাহকে এবং ও কোরআন শরীফে বিশ্বাস করে তাহলে তারা পরকালের জবাবদিহিতাও বিশ্বাস করবে। তারা ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করবে । এর ফলে তাদের ওপর জুলুম শোষণ এবং কর্তৃত্ব করা যাবে না। তাই যে কোন নবীজি যে বাণী প্রচার করেছিলেন সেই বাণী প্রচার থেকে তাকে দূরে সরিয়ে দিতে হবে। তবেই প্রচলিত ভ্রান্ত ধর্মবিশ্বাস দ্বারা তারা মানুষকে জুলুম নির্যাতন চালিয়ে যেতে পারবে। তাই প্রতিটি গোত্রের ভেতর থেকে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাদেরকে আবার ফিরিয়ে আনার জন্য ওই গোত্রেরই অন্যরা তাদের উপর জুলুম নির্যাতন শুরু করলো। সকল ধরনের অমানুষিক নিষ্ঠুর নির্যাতন প্রথম শুরু হলো সমাজের দাস ও বঞ্চিত মানুষেরা।

আমরা বেলালের ঘটনা থেকে দেখতে পাই যে তাদের বিশ্বাসের পরীক্ষা ছিল কত নির্মম নিষ্ঠুর। উমাইয়া ইবনে খালাফ জানতে পারলেন যে, তার হাবশি ক্রীতদাস বেলাল ইবনে রাবাহ দেখুন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে গেছে। তিনি তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য শুধু একটাই চিন্তা করতে থাকলেন – কতভাবে নির্যাতন করলে সে পথে আসবে। প্রথমে তিনি বেলালের গলায় খেজুর গাছের ছাল দিয়ে বানানো শক্ত দড়ি লাগিয়ে বখাটে কিশোরদের হাতে ছেড়ে দিত। তারা তাকে পশুর মতো টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেত। তাকে রাস্তার এদিক সেদিক নিয়ে যেতে লাগল। শরীরের ত্বক-মাংস ছিঁড়ে গেল। যখন এই নির্যাতনের পরেও কাজ হলো না তখন তাকে আহত রক্তাক্ত অবস্থায় কোন প্রকার খাবার পানি ছাড়াই বেঁধে রাখা হলো কয়েক দিন। তারপর একদিন দুপুরের রোদে ‘রামাদা’ নামক মরুতে আগুনের মতো তপ্ত বালুতে বেলালকে চিৎ করে শোয়ানো হলো। বুকের ওপর দেয়া হলো এক বিশাল পাথর। বলা হলো যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি মুহাম্মদের ধর্মত্যাগ করে লাত ও উজ্জার উপাসনা না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত এই তপ্ত মরুতে পাথরচাপা হয়ে সিদ্ধ হতে থাকবে। কিন্তু বেলাল তখনও কোনোরকমে ডান হাতের তর্জনী ইশারা করে জড়িত কণ্ঠে শুধু বলেছেন—আহাদ! আহাদ! আল্লাহ এক! আল্লাহ এক! তার প্রবল বিশ্বাস জয় করে ফেলেছিল সকল শারীরিক যন্ত্রণা। বিস্মিত ক্ষুব্ধ হতাশ উমাইয়া দাঁড়িয়ে ছিল কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায়। এমন সময় আবু বকর সেখানে এসে হাজির হলেন। তিনি উমাইয়ার কাছ থেকে বেলালকে কিনে নিলেন। তাকে মুক্ত করে দিলেন গোলামি থেকে। বেলাল এরপর থেকে আজীবন ছিলেন রসুলের সঙ্গী।

প্রতিটি বিশ্বাসির ওপর শারীরিক মানসিক নির্যাতন চলতে থাকে সমান তালে। যখন যেখানে পাওয়া যেত তার উপরই চলতে নির্যাতন। এ-ক্ষেত্রে বিশ্বাসীদের অনেকের মা-বাবাও পিছিয়ে ছিলেন না। সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের নির্যাতক ছিলেন তার মা। মা কড়া পৌত্তলিক ছিলেন। তিনি শারীরিক নির্যাতন করেননি। কিন্তু চূড়ান্ত মানসিক নির্যাতন চালিয়েছেন। সাদ ছিলেন অত্যন্ত মাতৃভক্ত। মা যখন জানতে পারলেন ছেলে ইসলাম গ্রহণ করেছে, তখন তিনি শপথ করে বললেন, ‘সাদ! তুমি আমার ধর্মে ফিরে না আসা পর্যন্ত আমি পানাহার করব না। আমি না খেয়ে মারা যাব। তখন তুমি অভিহিত হবে মাতৃহন্তাকারীরূপে।’। সাদ বললেন, ‘মা আমি তোমাকে ভালবাসি। কিন্তু কোনোকিছুই আমাকে আমার ধর্ম থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না।’

(চলবে)