যে পটভূমিতে নবীজির আগমন (পর্ব-০৩)

শেষ পর্ব

পরিশ্রমের সাথে তিনি গর্ত করছেন। তার পুত্র বালি ওঠাচ্ছে। তার খননের শব্দ পেয়ে কোরাইশ গোত্রের উত্তরের লোকজন সেখানে জড়ো হলো এবং খনন বন্ধ করতে বলল। তিনি সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে, স্বপ্ন নির্দেশিত হয় জমজম কূপ পুনর্খননের জন্য তিনি কাজটি করছেন। তিনি সবাইকে এ কাজে অংশ নিতে আহ্বান জানালেন। কিন্তু তারা এ কাজে অংশগ্রহণ করলো না বরং যার যার মতো হাসাহাসি করে চলে গেল। আবদুল মুত্তালিব শুধু ছেলেকে নিয়েই খনন করে চললেন। প্রথমদিন পার হলো। দ্বিতীয় দিনও পার হলো।একইভাবে তৃতীয় দিনও পার হতে চলল। কূপ বা ধনরত্ন কোনোকিছুরই কোনো চিহ্ন নেই। ক্লান্ত-শ্রান্ত আবদুল মুত্তালিবের মনেও সন্দেহ উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। তাহলে স্বপ্নের যে নির্দেশনা তা কি একটা মানসিক বিভ্রম? যখন তিনি চিন্তা করেছেন, না! আর না। আর খনন করা অর্থহীন! সবটাই পণ্ডশ্রম! হতাশা ও বিরক্তি নিয়ে যখন ভাবছেন এবার ফিরে যাবেন—তখনই তার বেলচা আঘাত করল কোনো ধাতব দ্রব্যের ওপর। নতুনভাবে আশান্বিত হয়ে উঠলেন আবদুল মুত্তালিব। ধাতব বস্তুর চারপাশ থেকে বালু সরানোর পর এক এক করে তিনি পেলেন দুটো প্রমাণ সাইজের স্বর্ণমৃগ, ধনরত্ন, তরবারি ও অস্ত্রশস্ত্র। এরপর দ্বিগুণ উৎসাহে খনন শুরু করলেন। কূপের মুখ খুলে গেল। আহ! পানি! আহ! জমজম! পিতৃপুরুষের কূপ! পানির আর অভাব হবে না। চিৎকার করে উঠলেন তিনি, ‘আল্লাহ মহান!’

পিতা ইব্রাহিম এক আল্লাহর উপাসনার জন্যে যে ঘর নির্মাণ করেছিলেন, সেই কাবা কালস্রোতে তিন শতাধিক কল্পিত দেবতার মূর্তির নিবাসে পরিণত হলো। কিন্তু তা সত্ত্বেও কাবার প্রতি আরবদের আকর্ষণ দিনকে দিন বাড়তেই থাকল। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে তীর্থযাত্রীদের আগমনও বাড়ল সমান তালে। ইয়েমেনের শাসক আবরাহা আল আশরম নির্মাণ করলেন বিশাল গির্জা। নাম দিলেন ইয়েমেনী আল-কাবা। গির্জার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি মনে করলেন, শুধু সাধারণ আরব নয়, মক্কার মানুষরাও এখানে আসবে পুণ্যলাভের জন্যে। কিন্তু কোনোটাই আরবদেরকে আকৃষ্ট করতে পারল না। এমনকি ইয়েমেন থেকেও তীর্থযাত্রীদের মক্কা আগমন অব্যাহত থাকল আগের মতোই। এই ঘটনায় আবরাহার ক্রোধ চরমে উঠল।আবরাহা কাবা ধ্বংস করার জন্যে বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কা ও তায়েফের মাঝামাঝি এসে শিবির স্থাপন করলেন।তিনি তার এক সেনাপতি হুনাসা আল হিসায়রীকে মক্কার চারপাশে লুটপাট চালানোর নির্দেশ দিয়ে বললেন-মক্কার নেতাদেরকে পরিষ্কারভাবে বলবে, মক্কার সাথে যুদ্ধ করার কোনো অভিপ্রায় আমার নেই। আমি শুধু কাবাঘর ধ্বংস করেই ফিরে যাব।

আবরাহা বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কার উপকণ্ঠে আসার পর ‘মাহমুদ’ নামের অগ্রবর্তী হাতিটি বসে পড়ল। তার পেছনে পেছনে অন্যগুলোও।বিশাল হাতিটিকে উঠিয়ে দাঁড় করানোর জন্যে সৈনিকদের সকল কসরত ব্যর্থ হলো।এরপর ওদের মাথার ওপর দিয়ে পাথরের তেজস্ক্রিয় কণা ফেলতে ফেলতে উড়ে গেল আবাবিল পাখির ঝাঁক। সমুদ্রের দিক থেকে আসা মরুঝড়ে ভেসে এলো ‘গুটিবসন্তের’ জীবাণু।গুটিবসন্তে আক্রান্ত হলো সৈন্যরা। ছড়িয়ে পড়ল তা মহামারির মতো। সৈন্যদের অধিকাংশই মারা গেল বা পালিয়ে গেল।আহত আতঙ্কিত আবরাহা অবশিষ্ট সৈন্যদের নিয়ে ফেরত যাত্রা করলেন। তার শরীরের অঙ্গগুলো এক এক করে বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করল।রাজধানী সানায় পৌঁছে মারা গেলেন তিনি। পুরো ঘটনা এত আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত ছিল যে, আরবরা বছরটারই নামকরণ করল ‘হস্তী বছর’। আবরাহার হস্তী বাহিনীর বিপর্যয়ে বেদুইনরা নিশ্চিত হলো কাবা পবিত্র ঘর। আর এর তত্ত্বাবধায়করা বহিঃআক্রমণ থেকে সুরক্ষিত।

কোরাইশরা বিবেচিত হলো ঈশ্বরের বরপুত্ররূপে। ব্যবসা আর মদ ও উদ্দাম ফূর্তির ইন্দ্রিয়জ সুখে ডুবে যাওয়া। এটাই হলো অভিজাত জীবন। আর এই ইন্দ্রিয়জ সুখের আগুনে ঘি হিসেবে ব্যবহার করা হতো ক্রীতদাসীদের। মক্কাবাসীদের আয়ের একটা বড় উৎস ছিল এই নিষ্ঠুর দাসব্যবসা। কাবার চারপাশে প্রথম সারির ঘর ও বৈঠকখানাগুলো ছিল অভিজাতদের। সামাজিক মর্যাদা অনুসারে পরবর্তী সারির ঘর ও আবাসনের বণ্টন। অর্থই ছিল তাদের দেবতা। পিতৃপুরুষের সংস্কারই ছিল ধর্ম। আর অভিজাতদের স্বার্থ রক্ষা করাই ছিল কাবার পুরোহিতদের কাজ। মক্কার ভোগবাদী নগরসমাজ ছিল কার্যত দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত। বেনিয়া অভিজাত পরিবারগুলো কুক্ষিগত করে রেখেছিল সকল ধনসম্পদ, ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব। এরা সমাজের একশতাংশ। আর নিরানব্বই শতাংশই ছিল দারিদ্র্যপীড়িত বঞ্চিত মানুষ। জীবন, জীবিকা, সম্মান, নিরাপত্তা কোনোকিছুই ছিল না তাদের। কিন্তু একটা সভ্যতার একটা সমাজের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের যখন বিপর্যয় ঘটে, অর্থ যখন দেবতায় রূপান্তরিত হয়, ভোগবিলাসিতা যখন মর্যাদার মানদন্ডে পরিণত হয়, সমাজ যখন সাধারণ মানুষের সাথে সুবিচার করতে ব্যর্থ হয়, সমমর্মিতা যখন শোষকের হাতে চূড়ান্তভাবে বিনাশিত হয়, তখনই ঘটে ইতিহাসের বাঁকবদল।

আর এমনই অন্ধকার সময়ে মহান রাব্বুল আলামিন গোটা মানবজাতির জন্য করুণা স্বরূপ, রহমত স্বরূপ, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) প্রেরণ করলেন। তিনি তার জীবনকে উৎসর্গ করলেন এ আন্ধকার থেকে আরব সহ পুরো মানব জাতীকে আলোর পথে নিয়ে আসতে।