যে পটভূমিতে নবীজির আগমন (পর্ব-০২)

পর্ব-০২

কাবার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে যুরহুম গোত্রের স্থলে খুজাহ গোত্র মক্কার অধিকার গ্রহণ করল। তবে মক্কা ছাড়ার আগে দলপতি মোবারক কাবায় রক্ষিত সকল ধনরত্ন, অস্ত্রশস্ত্র, দুটি প্রমাণ সহ জমজম কূপের পাশে গর্ত করে পুঁতে রাখলে। পুরো কুূপ পাথর আর বালি দিয়ে ধরে ফেললেন। নিশ্চিহ্ন করে দিলেন জমজমের অবস্থান চিহ্নিত করার সকল নিদর্শন। লক্ষ্য ছিল খুজাহরা যাতে কোনোভাবেই জমজমের পানি ব্যবহার করতে না পারে।

খুজাহ গোত্রই ছিল মক্কার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী কোরাইশরা কাবার তত্ত্বাবধায়ক হওয়ার আগ পর্যন্ত। কুসাই ইবনে কিলাবের নেতৃত্বে কোরাইশরা মক্কার কর্তৃত্ব পেল। কুসাইয়ের জীবনও বেশ ঘটনাবহুল। শিশুকালেই কুসাইর বাবা মারা গেলে তার মা কুদাহ গোত্রের রাবিয়া ইবনে হারামকে বিয়ে করলেন। রাবিয়া স্ত্রীসহ কুসাইকে নিয়ে গেলেন নিজ গোত্রে উত্তর আরবে, ফিলিস্তিন সীমান্তে। নিজেকে রাবিয়ার সন্তান মনে করেই কুসাই সেখানে বেড়ে উঠলেন। তারুণ্যে তিনি জানতে পারলেন যে, তিনি কোরাইশ গোত্রের কিলাবের সন্তান এবং তার ভাই কোরাইশদের দলপতি। কুসাই মক্কায় ফিরে এসে ভাইয়ের সাথে বসবাস শুরু করলেন। ব্যক্তিত্ব, জ্ঞান, বুদ্ধি, সাহস, দূরদৃষ্টি ও উদারতার কারণে খুব অল্প সময়েই তিনি মক্কাবাসীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হলেন। তিনি কাবার তত্ত্বাবধায়ক ও খুজাহ গোত্রপ্রধান হুলাইল ইবনে হুবশিয়ার মেয়ে হুব্বাকে বিয়ে করলেন। ব্যক্তিত্ব ও গুণাবলির কারণে কুসাইকে হুলাইল নিজ পুত্রের মতো স্নেহ করতে শুরু করলেন। মৃত্যুশয্যায় তিনি কুসাইকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে কাবার তত্ত্বাবধায়ক এবং মক্কার শাসক ঘোষণা করলেন। খুজাহ গোত্রের অনেকেই তার প্রবল বিরোধিতা করল। কিন্তু কুসাই সকল বিরোধিতাকে নস্যাৎ করে মক্কায় নিজ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলেন।

কুসাই মক্কার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী সংস্কার সাধন করলেন নেতৃত্ব গ্রহণ করেই। তিনি আরবের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কোরাইশদের মক্কায় নিয়ে এলেন। যে-কোনো কাজ পরামর্শক্রমে সমবেত সিদ্ধান্তে করার জন্যে কাবার অদূরে পরামর্শ ঘর ‘দারুল নাদওয়া’ নির্মাণ করলেন। কার্যত তিনি গ্রিসের নগর রাষ্ট্রের আদলে মক্কায় অভিজাত নিয়ন্ত্রিত নগর রাষ্ট্রের পত্তন করলেন।আগে মক্কায় সবাই তাঁবুতে বসবাস করত। তীর্থযাত্রীদের কাবা প্রদক্ষিণের জন্যে পর্যাপ্ত জায়গা রেখে কুসাইর নেতৃত্বে আস্তে আস্তে স্থায়ী বাসস্থান নির্মাণ শুরু হলো।অভাবী তীর্থযাত্রীদের নিখরচায় খাবার পানি ও যত্নের

স্থায়ী ব্যবস্থা করার লক্ষ্যে প্রতিটি কোরাইশ পরিবারে নির্দিষ্ট চাঁদা ধার্য করলেন তিনি। তীর্থযাত্রীদের জন্যে এই সেবার ব্যবস্থা করায় আরবে কোরাইশদের বিশেষ মর্যাদা সুসংহত রূপ লাভ করল।

তার আতিথেয়তায় তীর্থযাত্রীদের মুগ্ধ। কোরাইশদের আর্থিক সমৃদ্ধি আরো বাড়ল কুসাই-এর পৌত্র হাশিমের সময়। ব্যবসায়ে ব্যাপক সাফল্য শুধু তার নিজেরই নয়, কোরাইশদের ভাগ্যও বদলে দিল। তিনি শীত-গ্রীষ্মের বাণিজ্যযাত্রায় কোরাইশদের প্রত্যেক পরিবারকেই সাধ্যমতো বিনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করলেন এবং বিনিয়োগ অনুসারে আনুপাতিক মুনাফা বণ্টন নিশ্চিত করলেন।কোরাইশদের মধ্যে ভোগবাদী বিলাসী এক নতুন শ্রেণির উদ্ভব ঘটল ব্যবসায়িক সাফল্যের ফলে।

হাশিমের পর তার পুত্র আবদুল মুত্তালিব কোরাইশদের সার্বিক নেতা হলেন।আবদুল মুত্তালিব ছিলেন বুদ্ধিমান ও পরিশ্রমী। তীর্থযাত্রীদের পানি ও খাবার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আন্তরিকতার সাথে পালন করতে গিয়ে তিনি হিমশিম খেতে লাগলেন।একটিমাত্র পুত্র তখন তার। এক পুত্রকে সাথে নিয়ে দূর থেকে পানি এনে সুষ্ঠুভাবে তীর্থ যাত্রীদের পানি এর ব্যবস্থা করা অসম্ভব হয়ে পড়ল। কীভাবে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা করা যায় এই চিন্তা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।পানি নিয়ে চিন্তা করতে করতে তিনি এক রাতে ঘুমিয়ে পড়েছেন। স্বপ্নে দেখলেন, কেউ তাকে বলছে, ‘খনন করো’। তিনি বুঝতে পারলেন না, কী খনন করবেন। এর পর তিন রাত একই স্বপ্ন দেখলেন ‘খনন করো’। কিছুই বুঝলেন না তিনি।চতুর্থ রাতে স্বপ্ন দেখলেন, কেউ তাকে বলছে, ‘জমজম খনন করো!’ জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় খনন করব? স্বপ্নেই তিনি এর খনন অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা পেলেন। আবদুল মুত্তালিব পরদিন সকালে প্রবল উৎসাহে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝামাঝি স্বপ্নে নির্দেশিত স্থানে পুত্র হারিসকে নিয়ে খনন শুরু করলেন।

(চলবে)