যে পটভূমিতে নবীজি (সাঃ)-এর আগমন

Muslims holding hands together in prayer
Muslim of islam praying hands concept

পর্ব-০১

একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের গভীরভাবে করা উচিত। আলামিন আমাদেরকে শুধু দিকনির্দেশনা দিয়ে ছেড়ে দেননি, তার সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন স্বরূপ নবীজি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে প্রেরণ করেছিলেন। মহান রাব্বুল আলামিনের প্রতিটি নির্দেশ কিভাবে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা যায় তার জলজ্যান্ত উদাহরণ হচ্ছে নবীজি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) । তাই আমরা নবীজির জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী কে গভীরভাবে জানার চেষ্টা করব। আজ আমরা জানার চেষ্টা করব যে পটভূমিতে নবীজির আগমন ঘটেছিল। অর্থাৎ ওই সময় কি অবস্থায় নবীজির আগমন ঘটেছিল।

আমরা জানি নবীজির আগমনের সময়টি ছিল ঘোর অন্ধকার। আইয়ামে জাহেলিয়াত। সর্বত্র অসহিষ্ণুতা ঘৃণা বিদ্বেষ হিংসা প্রতিহিংসা ও পাশবিকতার জয়জয়কার। ছিল না সম্মানের নিরাপত্তা, ছিল না সম্পদের নিরাপত্ত্‌ ছিলনা জীবনের কোনো নিরাপত্তা। একটি শহর গড়ে ওঠার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে উপাদান গুলোর প্রয়োজন ছিল তার কিছুই ওই সময় মক্কায় ছিল না। একটি শহর গড়ে ওঠার জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান—পানির পর্যাপ্ত সরবরাহ, বিস্তৃত কৃষিজ অঞ্চল, সহজ যোগাযোগ বা অনুকূল আবহাওয়া কোনোটাই এখানে ছিল না। দিগন্ত বিস্তৃত মরুপাহাড়, অনুর্বর ভূমি, রুক্ষ আবহাওয়া আর দুর্গম পথের কারণে রোমান, বাইজেন্টাইন বা পারস্য সম্রাটদের কেউই এ অঞ্চল জয়ের জন্যে কোনো বাহিনী কখনো পাঠায়নি। স্বাধীনতাপ্রিয় বিবদমান যাযাবর গোত্রগুলোর ইচ্ছা-অনিচ্ছাই ছিল সেখানে শেষ কথা। এইরকম এক প্রতিকূল পরিবেশে এক মশক পানি আর কিছু শুকনো খাবার দিয়ে এক নারী ও এক শিশুকে নির্বাসনে রেখে গেলেন এক প্রবীণ পুরুষ। পানি আর খাবার ফুরিয়ে গেছে। পানির তৃষ্ণায় শিশুটি চিৎকার করতে থাকলেন। মা বেরুলেন কোথাও কোন প্রাণী পাওয়া যায় কিনা। এই পাহাড় ওই পাহাড় থেকে চারদিকে দেখলেন কিন্তু কোথাও কোন পানি পেলেন না। কোথাও পানির সন্ধান না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসলেন শিশুটির কাছে। এরপর মা যা দেখলেন তা দেখে তিনি অবাক। তিনি দেখতে পেলেন শিশুটির পায়ের কাছে আলো ভেদ করে বেরিয়ে আসছে পানি। তিনি সেই পানি নিয়ে শিশুটিকে খাওয়ালেন এবং নিজেও খেলেন। এতো সুস্বাদু পানি তিনি তার জীবনে কখনো খাননি। যেখান দিয়ে পানি উঠছিল সেই স্থানের কিছু বালু সরানোর পর এটি একটি কূপের রূপ নিল। পানি যতই নোংরা হোক না কেন কূপ সব সময় ভরা থাকে। পানির স্বাদের কারণে আরবের মরু অঞ্চলে এর পরিচিতি দ্রুত বাড়তে লাগলো। আর কুপের নাম হল জমজম।

শিশু কিরে ধীরে বড় হয় যুবককে পরিণত হল। পিতা ইব্রাহিম এসে মিলিত হলেন তাদের সাথে। পাথরের উপর পাথর সাজিয়ে পিতা পুত্র একসাথে, এক স্রষ্টার উপাসনার জন্য নির্মাণ করলেন এক সাদামাটা ঘর। আর এ ঘর পরিচিতি লাভ করল আল্লাহর ঘর নামে। নাম হল কাবাঘর। এই কাবাঘরকে কেন্দ্র করেই আস্তে আস্তে গড়ে উঠল জনবসতি। স্থায়ী ঘরবাড়ি নয়। তাঁবু। তাঁবুতেই বসবাস শুরু করল তারা। যখন ইচ্ছা আবার যাযাবর জীবন। দূরদূরান্তের বাণিজ্য কাফেলাগুলোও যাত্রাবিরতি শুরু করল পানি নেয়ার জন্যে। বেদুইনরা আস্তে আস্তে আসা শুরু করল এই ঘরে উপাসনা করার জন্যে। লোক সমাগম বাড়ার সাথে সাথে পণ্যের চাহিদা মেটাতে গড়ে উঠল বাজার। জীবিকার অন্বেষণে অনেকেই জড়িয়ে পড়ল ব্যবসায়।

কালস্রোতে এক স্রষ্টার সহজসরল উপাসনার স্থলে কাবায় স্থান করে নিতে শুরু করল মূর্তি। পরস্পরবিরোধী যুদ্ধমান বেদুইন গোত্রগুলো নেমে পড়ল নিজস্ব কল্পিত দেবতার সুদৃশ্য ও ব্যয়বহুল মূর্তি নির্মাণের প্রতিযোগিতায়। আর কল্পিত দেবতার মূর্তি মিছিল করে কাবায় সংরক্ষণের জন্যে নিয়ে আসা হয়ে গেল পালনীয় রীতি। সারা আরব জুড়ে বিবদমান স্বাধীন তিন শতাধিক গোত্রের মিলনস্থল হয়ে উঠল মক্কা। কাবার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত গোত্র পুরো আরবে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হয়ে উঠল স্বাভাবিকভাবেই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কাবার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে যুরহুম গোত্র। সে সময়ে মক্কা হয়ে গেল ইয়েমেন, সিরিয়া, হিরা, নজদ-এর বাণিজ্য পথের মিলনবিন্দু। আর মক্কা থেকে লোহিত সাগরের দূরত্ব মাত্র ৮০ কিলোমিটার। যুরহুমরা ভক্তদের নেয়াজ-নজরানা হাদিয়া পেতে পেতে হয়ে উঠল দারুণ আয়েশি ও বিলাসী। যুরহুম গোত্রের সর্বশেষ অধিপতি মুবাদ স্থূল দেহধারী স্বগোত্রীয়দের কর্মে উদ্বুদ্ধ করার অনেক চেষ্টা করলেন। কিন্তু তাদের শ্রমে উদ্বুদ্ধ করতে ব্যর্থ হলেন। আসলে একবার শরীরে মেদ জমে গেলে সাধারণত কেউই পরিশ্রম করতে চায় না। এদের ক্ষেত্রেও তা-ই হলো। আলস্য ও শ্রমবিমুখতা ধ্বংস করল যুরহুমদের সকল কর্তৃত্ব।

(চলবে)