যে সুবিশাল পুস্তক ভান্ডারের অধিকারী ছিল পশ্চিম এশিয়া

mert-kahveci-Hk7rVLXGvbw-unsplash
Library of celcus, turkey . Fotoğraf: Mert Kahveci-Unsplash

প্রায় নয় বছরেরও বেশি সময় জুড়ে গৃহযুদ্ধের টালমাটাল এবং বিক্ষুদ্ধ পরিস্থিতি আজ আমাদের সামনে যুদ্ধবিক্ষুদ্ধ ক্ষয়প্রাপ্ত সিরিয়ার ছবিটা সামনে এনেছে। তবে একটা সময়ে শিক্ষাসংস্কৃতির বিকাশে সিরিয়া একেবারেই পিছিয়ে ছিল এমনটা বলা যায় না। দামেস্ক, আলেপ্পো এবং ত্রিপোলির মতো সিরিয়া লেবাননের সমস্ত বড় শহরগুলিতে গ্রন্থাগার ছিল। ঐতিহাসিক বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় দামেস্ক বহু শতাব্দী ধরে ইসলামিক শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। উমাইয়াদের যুবরাজ খালিদ ইবনে ইয়াজিদ (৭০৪) এবং খলিফা আবদুল আল মালিক বিন মারওয়ান (৭০৫), হযরত উমর ইবনে আবদ-আজিজ (৭২০) এখানে গ্রন্থাগার স্থাপন করেছিলেন।

খালিদ বইয়ের সংগ্রাহক ছিলেন; তিনি রসায়ন সম্পর্কিত বিদ্যমান বহু গ্রন্থ এবং গ্রীক সাহিত্যের অনেক বইই আরবিতে অনুবাদ করে আরও সহজ করে দিয়েছিলেন বইপ্রেমীদের কাছে। গামি বান উমাইয়া আল-কবর – উমাইয়া মসজিদ সংলগ্ন এই গ্রন্থাগারটি ছিল প্রাচীন এবং দুর্লভ ও মূল্যবান পান্ডুলিপি সমৃদ্ধ। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অনেক নথি ছিল গ্রন্থাগারের মধ্যেই। এই মসজিদটি খলিফা প্রথম ওয়ালিদ (৭১৫) দ্বারা প্রচুর ব্যয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। হজরত ওসমান (রা.) – এর দ্বারা প্রস্তুত করা কুরআনের অনুলিপি মাশাফ-এ-ওসমানী দীর্ঘকাল ধরে এই গ্রন্থাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। ইবনে বতুতা এই কুরআনের অনুলিপিটি দেখেছিলেন যা হজরত ওসমান (রা.) সিরিয়ার লোকদের কাছে প্রেরণ করেছিলেন।

ষোড়শ শতাব্দীতে দামেস্কে ৩০টি মাদ্রাসা এবং ২০টি গ্রন্থাগার ছিল। ইবনে যুবায়ের আন্দুলাসী (১২১৭) তাঁর রিহলায় বলেছেন – সে সকল মাদ্রাসার মধ্যে নূর আল-দ্বীন জাঙ্গি মাদরাসা ছিল সবচেয়ে মার্জিত এবং বিস্ময়কর। ধর্মীয় অধ্যয়নের পাশাপাশি পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান এবং সাহিত্য পড়ানো হত এখানে। এখানে ৪ টি মেডিকেল স্কুল এবং একটি ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল ছিল। প্রতিটি বিদ্যালয়ের নিজস্ব গ্রন্থাগার ছিল। সুতরাং, একটি বিষয় স্পষ্ট যে শিক্ষাব্যবস্থার ক্রম প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ছিল শিক্ষার সর্বাঙ্গীন উন্নতির ভাবনা।

 এবার আমরা কথা বলব ইরানের ষষ্ঠ জনবহুল শহর শিরাজের কথা, সেখানকার একটি পাঠাগারের কথা। স্টুয়ার্ট মারে বলেছেন, “ইসলামিক গ্রন্থাগারগুলি ছিল, বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ, অন্যান্য দেশের বিদ্বানদেরও এই সুযোগগুলি ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিল”। এই গ্রন্থাগারগুলি তাদের আকর্ষণ এবং স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য পরিচিত ছিল, অনেকগুলি ক্লাসিক ইসলামিক গম্বুজ দ্বারা সজ্জিত ছিল, কিছুগুলি রাস্তাঘাট দ্বারা বেষ্টিত এবং পুকুর দ্বারা ল্যান্ডস্কেপযুক্ত ছিল। সবচেয়ে কিংবদন্তি গ্রন্থাগারের মধ্যে ছিল পারস্য নগরের শিরাজে, যেখানে প্রায় ৩০০ শতাধিক কক্ষগুলি বিলুপ্ত কার্পেটে সজ্জিত ছিল। গ্রন্থাগারের পাঠ্য সনাক্তকরণে সহায়তা করার জন্য পুরো ক্যাটালগ ছিল, যা স্টোরেজ চেম্বারে রাখা হয়েছিল এবং শিক্ষার প্রতিটি শাখা অনুসারে সংগঠিত হয়েছিল। শিরাজের প্রাচীন এই মুসলিম গ্রন্থাগারের মধ্যেই ছিল আধুনিক গ্রন্থাগারের বই সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

প্রাচীন শহর সিরিয়ার আলেপ্পো ঐতিহাসিক শহরের কেন্দ্র হিসেবেও বিশেষভাবে চিহ্নিত। আলেপ্পোর দীর্ঘ সময়ের ইতিহাসকে যদি ধরতে চাই তাহলে এর অন্যতম প্রধান আকর্ষণের কেন্দ্র হিসেবে ছিল এক গৌরবময় গ্রন্থাগারের কথা। কথিত আছে যে হযরত ইব্রাহিম (আ.) এখানে বাস করতেন, তার কাছে ছাগলের একটি পাল ছিল যার দুধ তিনি মানুষের কাছে বিনামূল্যে দিতেন। আরবিতে দুধ দোয়ানোকে হালাব বলে, এভাবেই শহরটির নাম হালাব (আলেপ্পো) হয়ে গেল। বিভিন্ন রাজ পরিবার এই শহরকে শাসন করেছে, ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এর মধ্যে একটি ছিল বনু হামদান যার শাসক সাইফ আল-দৌলা শহরে একটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সাইফ আল-দাওলা সাহিত্যে আগ্রহী ছিলেন; সুতরাং গ্রন্থাগারের বেশিরভাগ বই ছিল সাহিত্য নির্ভর। সাইফ আল-দাওলার অন্যতম রাজকর্মী ছিলেন দার্শনিক এবং গণিতবিদ আবু নসর মুহাম্মদ ইবনে ফারাবী (৮৭২-৯৫০)। এই গ্রন্থাগারের পরিচালক ছিলেন বিশিষ্ট কবি মুহাম্মদ ইবনে হাশেম এবং তার ভাই। 

সরকারি বা বেসরকারি গ্রন্থাগার ছাড়াও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মোট ৮০টি পাঠাগার যুক্ত ছিল। ইবনে যুবায়ের (১২১৭) তাঁর বিখ্যাত ভ্রমণবৃত্তান্তে (রিহলা) বলেছেন যে মাদ্রাসা খলিফার গ্রন্থাগারটি হালাবের বিশাল মসজিদের মতোই মার্জিত এবং গৌরবময় ছিল। এর পারিপার্শ্বিক পরিবেশও ছিল মনোরম। স্কুলের চারপাশে আঙ্গুরের বাগিচা ছিল সমৃদ্ধ; দ্রাক্ষালতাগুলি আঙ্গুর দিয়ে এত বেশি বোঝা ছিল যে শিক্ষার্থীরা সহজেই আঙ্গুর তুলতে পারে। গ্রন্থাগারের বিরল বইগুলির একটি হ’ল মুজাম্মাল আল-লুঘা লে ইবনে-আল-ফরিস। এই বিরল পাণ্ডুলিপিটি অনুলিপি করেছিলেন ইবনে মায়মুন আল-বাগদাদী, বাগদাদ থেকে পান্ডুলিপিটি আলেপ্পোতে এসেছিল।

এবার আলোচনা করা যেতে পারে অন্য শহর প্রসঙ্গে। বনু আম্মারের শিয়া পরিবারের শাসনামলে (ত্রিপোলির আমিররা, মূলত কায়রোর ফাতেমীয় খলিফাদের অধীনস্থ), ত্রিপোলি ছিল শিক্ষার একটি প্রধান কেন্দ্র। শহরটি শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা এবং সাহিত্যের বাতিঘর হয়ে ওঠে। হাসান বিন আম্মারের শাসনামলে এই শহরটি বিকশিত হয়েছিল, তিনি একটি বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন যার সাথে যুক্ত ছিল একটি গ্রন্থাগারও। ধীরে ধীরে এই গ্রন্থাগারটির জ্ঞান পুরো শহর জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, শহরটিকে দার আল-ইলম বলা হত। গ্রন্থাগারে ১৮০জন অনুলিপিবিদ নিযুক্ত করেছিলেন, যার মধ্যে ৩০জন দিন-রাত বইয়ের অনুলিপি করার কাজে নিযুক্ত ছিল। দূতগণকে অন্যান্য শহরগুলিতে বই কেনার জন্য প্রেরণ করা হত। অনুমান করা হয় যে এখানে পবিত্র কুরআন শরীফের ১৩০,০০০ খণ্ড, ৫০,০০০ কপি এবং কুরআনের ব্যাখ্যা দেওয়া ২০,০০০ ভাষ্য ছিল। ক্রুসেডাররা যখন ত্রিপোলি দখল করল, তখন এই গ্রন্থাগারটি লুণ্ঠিত হয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।