যে হাস্যরস মনে প্রফুল্লতা আনে তা মুস্তাহাব

ramin-talebi-u_b0jWnkgM0-unsplash
Fotoğraf: Ramin Talebi-Unsplash

আমাদের প্রিয়নবী হযরত মহম্মদ (সাঃ) দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মানব ছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবীবকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম এবং সর্বগুণে গুণান্বিত করে সৃষ্টি করেছেন। তাঁর শারীরিক গঠন, কথা-বার্তা, কাজ-কর্ম ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সাথে কারো তুলনা নেই। বরং তাঁর তুলনা তিনি নিজেই।

মহানবী (সা.) এর কৌতুক একটি নেয়ামত এবং উম্মতের জন্য উত্তম পাথেয়। কৌতুক করা শরীয়ত সম্মত এবং বিশ্ব নবী (সা.) এর সুন্নত। ইসলামের দৃষ্টিতে হাসি-রসিকতা হতে হবে নির্দোষ, পরিচ্ছন্ন ও প্রজ্ঞাপূর্ণ। যে হাসি-মজা বা আমোদ-প্রমোদে মিথ্যা বা ধোঁকার সংমিশ্রণ থাকে এবং যে রসিকতা কারও মনোবেদনা বা মানহানির কারণ হয় তা নাজায়েজ ও নিষিদ্ধ।

রাসুল (সা.) এদিকে ইঙ্গিত করেই বলেন ‘তোমার ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া কোরো না এবং ঠাট্টা-বিদ্রুপ কোরো না। অর্থাৎ যে হাসি-রসিকতা অন্তরে কঠোরতা সৃষ্টি করে অথবা আল্লাহর ধ্যান থেকে মানুষকে গাফেল করে বা কারও কষ্টের কারণ হয় কিংবা কারও গাম্ভীর্য ও মর্যাদা নষ্ট করে এ ধরনের হাসি-তামাশা নিষেধ। পক্ষান্তরে যে হাস্যরস মনে প্রফুল্লতা আনে এবং যে রসিকতা ইবাদত-বন্দেগি ও দ্বীনি কাজে দেহ-মনকে সজীব করা এবং দৈহিক ও মানসিক অবসাদ ও ক্লান্তি দূর করার উদ্দেশে হয়ে থাকে এবং তা নির্দোষ হয় তা শুধু  জায়েযই নয় বরং মুস্তাহাব।

সাহাবি আনাস (রা.) বলেন, ‘নবী করিম (সা.) কখনো কখনো তাকে (কৌতুক করে) ‘দুই কানওয়ালা’ বলে ডাকতেন।’ (শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস : ২৩৬)
মহানবী (সা.) আনাস (রা.)-কে দুই কানওয়ালা বলে সম্বোধন করেছেন, এতে কোনো মিথ্যা বা ভুল ছিল না। বিশেষ কোনো কারণে আনাস (রা.)-কে দুই কানওয়ালা বলেছেন। যেমন তার দুই কান তুলনামূলক বড় ছিল বা তার শ্রবণশক্তি প্রবল ছিল। তিনি দূরের কথাও খুব সহজে শুনতে পেতেন।

আমরা অনেক সময় শিশুদের সঙ্গে রসিকতা করে কাছে ডাকতে গিয়ে বিভিন্ন কিছু দেব বলি। কিন্তু দেখা যায় কিছু দেওয়া হয় না। তাই এটা ধোঁকার অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ইসলামে নিষিদ্ধ। এতে প্রথমত ধোঁকার গুনাহ হয়। দ্বিতীয়ত এই শিশুটি একটা অনৈতিক শিক্ষা পায়। তাই হাসি-মজা বা রসিকতা হতে হবে সম্পূর্ণ মিথ্যাহীন ও ধোঁকামুক্ত।

রাসুল (সা:) এত প্রিয় মানুষ ছিল যে বৃদ্ধাদের সাথে কৌতুক করতেন। একদিন এক বৃদ্ধা এসে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা:) এর নিকট এসে আরজ করল, হে আল্লাহর নবী! আপনি আমার জন্য দোয়া করুন আল্লাহ যেন আমাকে জান্নাত নসীব করেন। রাসুল (সা:) বললেন,“কোন বৃদ্ধা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। রাসুল (সা:) এর কথা শুনে বৃদ্ধা মনে কষ্ট পেলেন। রাসুল (সা:) বুঝতে পেরে সাহাবীদের বললেন, তোমরা তাকে বলে দাও সে যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন সে বৃদ্ধা থাকবে না। বরং আল্লাহ সমস্ত জান্নাতি নারীকে ষোড়ষী কুমারীতে রূপান্তরিত করবেন। (সুনানে তিরমিজী)

মহানবী (সা.) একদা কন্যা হযরত ফাতেমা (রা.) এর বাড়িতে গিয়ে জামাতা হযরত আলী (রা.) কে বাড়িতে না দেখে কন্যা কে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন আমার সাথে বাগ্-বিতন্ডা করে বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েছেন। মহানবী (সা.) মসজিদে নববীতে গিয়ে সেখানে দেখেন হযরত আলী (রা.) একটি চাদর গায়ে জড়িয়ে এমনভাবে শুয়ে আছেন যে, তাঁর অর্ধেক দেহ মসজিদে আর অর্ধেক মাটিতে। তখন তিনি কৌতুক করে বলেন, উঠো! হে আবু তোরাব (মাটির পিতা)! এর পর থেকে হযরত আলী (রা.) এর উপনাম হয়ে যায় আবু তোরাব (বুখারী)।

হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- রাসূলুল্লাহ (সা.) মুচকি হাসি হাসতেন। (বুখারী, মিশকাত- ৫১৯)
হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি মহানবী (সা.) এর খেদমতে হাজির হয়ে একটি বাহনের আবেদন করলো। মহানবী (সা.) তাকে বললেন, আমি তোমাকে একটি উষ্ট্র ছানা দেব। লোকটি বললো, হে আল্লাহর রাসূল! উষ্ট্র ছানা দিয়ে আমি কি করবো? আমার তো এমন উটের প্রয়োজন, যার উপরে আমি আরোহণ করতে পারি। রাসূল (সা.) বললেন ওহে শোন! প্রত্যেক উটই তো কোন না কোন উষ্টীর ছানা (তিরমিযী)।

একবার আবু হুরায়রা একটি বিড়ালকে আদর করতেছে দেখে আল্লাহর নবী হজরত মুহাম্মদ (সা:) বলেন, “তাকে দেখে আবু হুরায়রা বলে ডাক দেয় সেই থেকে তার নাম আবু হুরায়রা হয়ে যায়। এ কারণেই কম লোকই তার আসল নাম জানে না। তবে কৌতুক করতে গিয়ে কোন সাথীদের হাসেতে গিয়ে মিথ্যা বলা যাবে না। একদা কিছু সাহাবী রাসুল (সা:) এর নিকট এসে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! (সা:) আপনি কি আমাদের সাথে হাস্য কৌতুক করেন। তিনি জবাবে বললেন আমি সত্য ব্যতিত মিথ্যা কিছু বলিনা”। (সুনানে তিরমিজী)

কৌতুক করা যাবে তবে সেটা যেন মিথ্যা না হয়। আর হাসি তামাশা যেন কারো মনে কষ্ট না দেয় সেদিকে অবশ্যই আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।